Home সংবাদভুবনডাঙা ইউরোপ কেন এক সুরে কথা বলতে পারেনা

ইউরোপ কেন এক সুরে কথা বলতে পারেনা

0 comments 4 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইরান প্রশ্নে ইউরোপ কেন এক সুরে কথা বলতে পারে না—এই প্রশ্নটি সাম্প্রতিক পশ্চিম এশিয়া সংকটের প্রেক্ষাপটে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায়শই নিজেকে একটি ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায় কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় বড় আন্তর্জাতিক সংকটের সময় সদস্য রাষ্ট্রগুলির অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ইরান ইস্যু তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এর পিছনে রয়েছে ইতিহাস, ভূরাজনীতি, জ্বালানি অর্থনীতি, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইউরোপের নিজস্ব রাজনৈতিক বিভাজন।

প্রথম কারণটি হল ইউরোপের নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। ইউরোপের সব দেশ একইভাবে পশ্চিম এশিয়ার ঝুঁকির মূল‍্যায়ন করেনা। ফ্রান্স ও জার্মানির মতো বড় দেশগুলো সাধারণত কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেয়। তাদের ধারণা, ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়লে পশ্চিম এশিয়া অস্থিতিশীল হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ইউরোপে—বিশেষ করে শরণার্থী সংকট, জ্বালানি বাজার এবং সন্ত্রাসবাদী হুমকির ক্ষেত্রে। এই কারণেই তারা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির উদ‍্যোগকে সমর্থন করে এসেছে।

কিন্তু ইউরোপের অন্য একটি অংশ,বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি, পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিকে আমেরিকার কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র বা বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর কাছে প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ হল রাশিয়া। ফলে তারা আমেরিকার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। এই কারণে আমেরিকার ইরান নীতির বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে তারা অনেক বেশি সতর্ক থাকে।

দ্বিতীয় বড় কারণটি হল আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কের প্রকৃতি। ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু এখনি ন‍্যাটো।ন্যাটোর মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলো আমেরিকার সামরিক ছাতার নিচে রয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ইউরোপের একটি অংশ, বিশেষ করে ফ্রান্স চায় ইউরোপ যেন সামরিক পরিকল্পনায় আরও স্বাধীন হয়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রো অসংখ‍্যবার “European strategic autonomy”-র কথা বলেছেন। অর্থাৎ ইউরোপ যেন আমেরিকার প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত না করে।

অন্যদিকে কিছু দেশ মনে করে আমেরিকার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য বজায় রাখাই নিরাপদ। ফলে যখন আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, তখন ইউরোপের ভেতরে দ্বিধা তৈরি হয়,কেউ কূটনীতি চায়, কেউ আবার আমেরিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে চায়।

তৃতীয় কারণটি অর্থনৈতিক। ইরানের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স ঐতিহাসিকভাবে ইরানের বড় বাণিজ্যিক অংশিদার ছিল। ওবামা জমানায়পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ইরানের জ্বালানি, বিমান ও পরিকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন একতরফাভাবে সেই চুক্তি খারিজ এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, তখন ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো বিপাকে পড়ে। তারা ইরানে ব্যবসা করলে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। ফলে ইউরোপীয় সরকারগুলো রাজনৈতিকভাবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাদের সীমাবদ্ধ করে দেয়।

চতুর্থ কারণটি হল ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাঠামোগত দুর্বলতা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বড় সমস্যা হল পররাষ্ট্রনীতি এখনও পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত নয়। অর্থাৎ বড় কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সদস্য রাষ্ট্রগুলির ঐকমত্য প্রয়োজন হয়। যদি কয়েকটি দেশ ভিন্ন মত পোষণ করে, তাহলে একক অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায়শই এমন ভাষায় বিবৃতি দেয় যা আপসকামী এবং অস্পষ্ট।

পঞ্চম কারণটি রাজনৈতিক ও সামাজিক। ইউরোপের অনেক দেশে ইরান নিয়ে জনমত বিভক্ত। একদিকে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আছে, অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আতঙ্কও আছে। ফলে সরকারগুলোকে এই দুই ধরনের জনমতের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।

সব মিলিয়ে ইরান প্রশ্নে ইউরোপের বিভক্ত অবস্থান আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন—ইউরোপ এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ ভূরাজনৈতিক শক্তি নয়। এটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও নিরাপত্তা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলির জাতীয় স্বার্থই শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়ে ওঠে।

এই কারণেই ইরান সংকটের মতো বড় আন্তর্জাতিক প্রশ্নে ইউরোপের ভিতর থেকে একক, দৃঢ় ও সুস্পষ্ট কণ্ঠস্বর খুব কমই শোনা যায়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles