Home বড় খবর হরমুজ প্রণালী, আকারে ছোট প্রভাবে ভয়ঙ্কর

হরমুজ প্রণালী, আকারে ছোট প্রভাবে ভয়ঙ্কর

0 comments 12 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ইতিহাসে এমন কিছু ভৌগোলিক স্থান আছে, যেগুলো আকারে ছোট হলেও তাদের গুরুত্ব বিপুল। হরমুজ প্রণালী তেমনই একটি জায়গা। মানচিত্রে এটি একটি সরু জলপথ—একদিকে পারস্য উপসাগর, অন্যদিকে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর। কিন্তু বাস্তবে এটি পৃথিবীর জ্বালানি অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ “চোকপয়েন্ট”।

যে কোনও যুদ্ধ বা সঙ্কটের সময় এই প্রণালীর নাম বারবার উঠে আসে, কারণ এখানে যদি জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তার প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যেই পৃথিবীর প্রায় সব বড় অর্থনীতিতে পৌঁছে যায়।

১. বিশ্বের তেলের এক তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে যায়

প্রথম এবং সবচেয়ে বড় কারণ হল এর ট্রাফিক। প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের কাছাকাছি তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পৃথিবীর বাজারে যায়। এর মানে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই সরু জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় তেল উৎপাদক দেশগুলো—সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরান—সবাই তাদের তেলের বড় অংশ এই পথ দিয়েই রফতানি করে।

অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ তেলভাণ্ডারগুলির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগস্থল এই একটিমাত্র জলপথ।

এটি এমন এক অবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে পৃথিবীর জ্বালানি নিরাপত্তা কার্যত একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক করিডরের ওপর নির্ভর করে।

২. গ্যাস বাজারেরও কেন্দ্রীয় ধমনী

শুধু তেল নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ক্ষেত্রেও হরমুজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রফতানিকারক দেশ কাতার। কাতারের প্রায় সমস্ত গ্যাস রফতানিই এই প্রণালী দিয়ে যায়।

বিশ্বের মোট এলএনজি রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হলে শুধু তেলের দাম নয়, গ্যাসের দামও দ্রুত বেড়ে যায়।

বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো—চিন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও পাকিস্তান—এই গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

৩. ভৌগোলিক বাস্তবতা: বিকল্প পথ খুব সীমিত

হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় একটি মৌলিক কারণে—এটির বাস্তব বিকল্প প্রায় নেই।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কিছু পাইপলাইন তৈরি করেছে, যেগুলো হরমুজ এড়িয়ে লোহিত সাগর বা আরব সাগরের দিকে তেল পাঠাতে পারে। কিন্তু এই পাইপলাইনগুলোর ক্ষমতা খুব সীমিত।

মোট উপসাগরীয় তেল রফতানির মাত্র এক-চতুর্থাংশ বা তারও কম এই বিকল্প পথে পাঠানো সম্ভব।

বাকি তেল কার্যত আটকে যায়।

অর্থাৎ হরমুজ বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের বড় অংশ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়।

৪. “চোকপয়েন্ট” অর্থনীতি

জ্বালানি অর্থনীতিতে একটি বিশেষ ধারণা আছে—maritime chokepoint।

এর অর্থ হল এমন সংকীর্ণ সমুদ্রপথ, যার মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবাহিত হয় এবং যার বিকল্প পথ নেই।

হরমুজ প্রণালী পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট।

আরও কিছু আছে—যেমন সুয়েজ খাল বা মালাক্কা প্রণালী—কিন্তু জ্বালানি বাজারে হরমুজের মতো গুরুত্ব আর কোনওটির নেই।

যদি এটি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল কমে যেতে পারে।

এত বড় ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব নয়।

৫. বাজারের মনস্তত্ত্ব

জ্বালানি বাজারে একটি বড় বিষয় হল প্রত্যাশা বা expectation।

অনেক সময় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও শুধু সম্ভাবনার কারণেই দাম বেড়ে যায়।

যখন ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেন যে হরমুজ প্রণালী ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তখন তারা ভবিষ্যতের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

ফলস্বরূপ তেলের ফিউচার মার্কেটে দাম বাড়তে শুরু করে।

এই মানসিক প্রতিক্রিয়া কখনও কখনও বাস্তব ঘাটতির থেকেও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

৬. এশিয়ার ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব

হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত অঞ্চল হল এশিয়া।

চিন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া—এই চারটি বড় অর্থনীতির তেলের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা তাই সরাসরি এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

যদি প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে প্রথম ধাক্কা লাগবে এশিয়ার শিল্প উৎপাদনে, পরিবহন ব্যবস্থায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

৭. যুদ্ধের সময় কেন এটি কৌশলগত অস্ত্র

ইরানের মতো দেশের জন্য হরমুজ প্রণালী একটি শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার।

তারা জানে, সরাসরি আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ করা কঠিন। কিন্তু যদি তারা হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করা সম্ভব।

এই কারণে বহু সামরিক বিশ্লেষক বলেন—হরমুজ প্রণালী হল ইরানের “asymmetric weapon”।

অর্থাৎ একটি ছোট পদক্ষেপ দিয়েও তারা বড় অর্থনৈতিক ঝাঁকুনি দিতে পারে।

৮. কেন বিশ্বশক্তিগুলো এখানে উপস্থিত

এই কারণেই উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার বিশাল নৌবাহিনী উপস্থিত থাকে।

ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং কখনও কখনও ন্যাটোর অন্যান্য দেশও এই অঞ্চলে টহল দেয়।

তাদের প্রধান লক্ষ্য হল এই জলপথ খোলা রাখা।

কারণ হরমুজ বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়—বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা।

উপসংহার

মানচিত্রে হরমুজ প্রণালী খুব ছোট মনে হতে পারে। সবচেয়ে সরু জায়গায় এর প্রস্থ মাত্র কয়েক ডজন কিলোমিটার।

কিন্তু এই সরু জলপথই বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার একটি প্রধান ধমনী।

এখান দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল ও গ্যাস পৃথিবীর বাজারে প্রবাহিত হয়, তা বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতি কেঁপে উঠতে পারে।

এই কারণেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যখনই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন এক প্রশ্ন বারবার সামনে আসে— হরমুজ প্রণালী কি খোলা থাকবে?

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles