বাংলাস্ফিয়ার: জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বহু বছর ধরে ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য এক যুদ্ধের একটি ভয়াবহ দৃশ্যপট নিয়ে আশঙ্কা করে আসছিলেন। সেই আশঙ্কার দুটি প্রধান দিক ছিল। প্রথমত, ইরান যদি তার তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলির ওপর আক্রমণ চালায়। দ্বিতীয়ত, যদি হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে যায়—যে সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যাতায়াত করে।
২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই দুই সম্ভাবনাই বেশ দূরবর্তী বলে মনে হচ্ছিল। কারণ ইরানের হারানোর ঝুঁকি ছিল অনেক বেশি। যদি তারা এমন পদক্ষেপ নিত, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলো আরও দৃঢ়ভাবে আমেরিকার দিকে ঝুঁকত,যাকে ইরান তার প্রধান শত্রু বলে মনে করে। একই সঙ্গে চিনের মতো বড় ক্রেতাকেও ক্ষুব্ধ করার ঝুঁকি ছিল, কারণ চিনই ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা। উপরন্তু, এমন পরিস্থিতিতে ইরানের নিজস্ব তেল পরিকাঠামোর ওপরও পাল্টা হামলার সম্ভাবনা তৈরি হত।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েল যখন যৌথভাবে ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলে আঘাত হানে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হন, তখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। এখন যে শাসনব্যবস্থা টিকে আছে, তা কার্যত মরিয়া অবস্থায়। ফলে বিশ্লেষকেরা যে দুঃস্বপ্নের কথা এতদিন ধরে বলছিলেন—তার দুটি দিকই এখন একসঙ্গে বাস্তব হয়ে উঠছে।
ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল শোধনাগারকে আঘাত করেছে। কাতারের একটি গ্যাস তরলীকরণ কমপ্লেক্স, কুয়েতের আরেকটি তেল শোধনাগার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ তেল শিল্পাঞ্চলও আক্রমণের শিকার হয়েছে। ফুজাইরাহ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই আক্রমণের ফলে প্রথম দুটি শোধনাগার ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ইজরায়েল ও কুর্দিস্তানের কয়েকটি গ্যাস তৈরির কেন্দ্রও বন্ধ হয়ে পড়েছে।
৩ মার্চ সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাস সতর্কবার্তা জারি করে জানায়, সৌদি আরবের বিশাল ধাহরান তেল কমপ্লেক্সে শিগগিরই ইরানের আক্রমণ হতে পারে।
এই আক্রমণের পাশাপাশি আরেকটি বড় ঘটনা ঘটেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ থেমে গেছে। কয়েকটি জাহাজের ওপর ড্রোন হামলার পর বীমা সংস্থাগুলি বহু জাহাজের জন্য বীমা কভারেজ স্থগিত রেখেছে। ২ মার্চ ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে প্রণালীটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং যে কোনও জাহাজ যদি তা অতিক্রম করার চেষ্টা করে, তবে তাকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে।
ফলাফল হিসেবে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২৭ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ১৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৫৪ ইউরো হয়েছে—যা মাত্র এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি। এশিয়াতেও একইভাবে গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়েছে।
৩ মার্চ ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি ঠান্ডা করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আমেরিকা জাহাজ চলাচলের জন্য বীমা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে। প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী উপসাগরে তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাবে। তবে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়। এদিকে জ্বালানি বাজারে ব্যবসায়ীরা এখন ক্রমশ বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন, কারণ তারা মনে করছেন সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সপ্তাহান্তে, যখন আন্তর্জাতিক বাজার বন্ধ ছিল। ২ মার্চ এশিয়ার বাজার খোলার পর প্রথম প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সংযত ছিল। ব্রেন্ট তেলের দাম দাঁড়ায় ৭৮ ডলারযা যুদ্ধের আগের তুলনায় মাত্র ৫ ডলার বেশি। ইউরোপে গ্যাসের দামও বাড়লেও তা ২০২২ সালের রেকর্ড স্তরের অনেক নিচে ছিল। তখন অধিকাংশ ব্যবসায়ী মনে করেছিলেন সরবরাহে বিঘ্ন কয়েকদিনের মধ্যেই কেটে যাবে।
কিন্তু এখন তারা দ্রুত মত বদলাচ্ছেন।
প্রথম সমস্যা তেলের ক্ষেত্রে। মূল বাধা তৈরি হয়েছে উপসাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলে। জাহাজ ভাড়ার দাম ইতিমধ্যে রেকর্ড ছুঁয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫২টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করত, সেখানে ২ মার্চ মাত্র চারটি জাহাজ পার হয়েছে। সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ৪০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত তেলজাত পণ্য এই পথ দিয়ে যায়।
এর মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ তেল সৌদি আরব ও আমিরাতের পাইপলাইনের মাধ্যমে অন্য পথে পাঠানো সম্ভব। কিন্তু বাকিটা আটকে পড়েছে। জেপি মরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, ৩ মার্চ পর্যন্ত ইরাকের হাতে মাত্র তিন দিনের এবং কুয়েতের হাতে প্রায় চৌদ্দ দিনের সংরক্ষণক্ষমতা বাকি আছে। এরপর তারা বাধ্য হবে উৎপাদন কমাতে। ইতিমধ্যে ইরাক প্রতিদিন ১৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়েছে।
এখনও উপসাগরীয় দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে রফতানি বাতিল ঘোষণা করেনি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা মনে করছেন খুব শিগগিরই তা ঘটতে পারে। এরই মধ্যে এশিয়ার ক্রেতারা বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছে—যেমন পশ্চিম আফ্রিকা, ব্রাজিল, গায়ানা, নরওয়ে ও আমেরিকা।
এই সঙ্কটের প্রথম ধাক্কা লাগবে এশিয়ায়। চিন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে কয়েক মাসের তেল মজুত থাকলেও তাদের আমদানির বড় অংশই পশ্চিম এশিয়াথেকে আসে। চিনের মোট তেল চাহিদার এক-তৃতীয়াংশই উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।
যদি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। আর কয়েক মাস চললে দাম ১২০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে—যেমনটি ২০২২ সালে হয়েছিল।
গ্যাসের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও দ্রুত সঙ্কটজনক হয়ে উঠতে পারে ।২০২৫ সালে কাতার থেকে বছরে প্রায় ৮ কোটি টন LNG হরমুজ প্রণালী দিয়ে রফতানি হয়েছে। এর বেশিরভাগই আসে রাস লাফান কমপ্লেক্স থেকে যা এখন বন্ধ। এই স্থাপনাটি একাই বিশ্বের মোট LNG রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ সরবরাহ করে।
ফলে এশিয়ার বাজারে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত বছর কাতার চিনের LNG আমদানির ৩০ শতাংশ, ভারতের ৪৫ শতাংশ এবং পাকিস্তানের প্রায় পুরো চাহিদা মেটাত। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও বিপুল পরিমাণ গ্যাস সেখান থেকে কেনে।
ইউরোপও খুব বেশি নিরাপদ নয়। যদিও তারা খুব কম তেল হরমুজ দিয়ে আনে, তাদের ডিজেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে আসে। ফলে ডিজেলের দামও দ্রুত বাড়ছে।
এই জ্বালানি ধাক্কার অর্থনৈতিক প্রভাবও বড় হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধি প্রায় ০.১৫ শতাংশ কমে যায় এবং পরের বছর মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ০.৪ শতাংশ বেড়ে যায়। যদি তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছে যায়, তাহলে প্রায় ০.৪ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১.২ শতাংশ বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলো—বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র যারা। ভারতের মতো দেশ বছরে তার জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ বিদেশি তেল আমদানিতে খরচ করে এবং তার মজুত মাত্র ২০–২৫ দিনের । থাইল্যান্ডের ক্ষেত্রে এই খরচ জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে আমেরিকার ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম পড়বে। কারণ দেশটি নিজেই প্রচুর তেল ও গ্যাস উৎপাদন করে। তবু পেট্রোলের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জ্বালানি বাজারে এই ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তাই ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়।নৌবাহিনীর নিরাপত্তা ও বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা সেই চেষ্টারই অংশ।
কিন্তু সমস্যা হল, ইরান এমন এক প্রতিপক্ষ যে আমেরিকাকে সহজে ছেড়ে দেওয়ার বান্দাই নয়।