বাংলাস্ফিয়ার: ২৮ ফেব্রুয়ারি, শনিবার সকাল। তেহরানে তখন ইরানের কর্মসপ্তাহের প্রথম দিন শুরু হয়েছে। শহরের জীবন তখনও দৈনন্দিন ছন্দেই এগোচ্ছিল। অফিসপাড়া খুলছে, স্কুলে ক্লাস শুরু হয়েছে, রাস্তায় ট্রাফিক ধীরে ধীরে বাড়ছে। কিন্তু সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে সেই স্বাভাবিকতার ভিত হঠাৎই ভেঙে পড়ে। এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে তেহরান। অনেকেই প্রথমে ভেবেছিল ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বোঝা গেল—এটি কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, যুদ্ধ শুরু হয়েছে। শহরের কেন্দ্র থেকে খুব দূরে নয়, ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের ভবনে আঘাত হেনেছে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বিমান হামলার প্রথম ঢেউ।

সামিরা নামে এক অফিসকর্মী, যার আসল নাম নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ করা হয়নি, সেই সময় নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছিলেন। হঠাৎ অফিস বাড়িটি দুলে ওঠে, জানালার কাচ ভেঙে পড়ে, আর তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে আকাশে দেখতে পান ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ার রেখা। মুহূর্তের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন পরিস্থিতির গুরুত্ব। তিনি বিদেশে থাকা নিজের বোনকে ফোন করে বলেন, “শোনো, যুদ্ধ শুরু হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেবে।” ফোন রেখে তিনি দ্রুত অফিস ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর ষোল বছরের ছেলে তখন স্কুলে। স্কুলটি ছিল এমন এক এলাকায় যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের দফতর এবং সেই এলাকাও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। তিনি একটি মোটরসাইকেল ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে যান স্কুলে। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখেন জানালাগুলো বিস্ফোরণে উড়ে গেছে, ছাত্রছাত্রীরা আতঙ্কে আঙিনায় জড়ো হয়ে আছে। কিছু ছাত্র আবার সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল কারণ মাত্র কয়েক মাস আগেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত হয়েছিল। ছেলেকে নিয়ে সামিরা দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন, কিন্তু তখনও তিনি জানতেন না যে সেই দিনটি শুধু তাঁর নয়, পুরো দেশের ইতিহাস বদলে দেবে।

সেই রাতেই ইরানের সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করে যে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হয়েছেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই তেহরানের অনেক এলাকায় অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখা যায়। কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে উদ্যাপন করতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ অনেকের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক মুক্তির সম্ভাবনা হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি করেছিল। কিন্তু একই সময়ে অন্য অনেক পরিবার গভীর আতঙ্কে ছিল। সামিরার স্বামী সারা রাত ঘুমোতে পারেননি। তিনি বারবার একই প্রশ্ন করছিলেন, এখন কী হবে? এই প্রশ্ন তখন শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা দেশের মানুষের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছিল ।
পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরানের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। প্রথমে হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক ঘাঁটি, গোয়েন্দা সংস্থা এবং শাসকগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো । কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা হোল বিস্ফোরণের অভিঘাত কখনোই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে না। খুব দ্রুত পুলিশ স্টেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি অফিসও হামলার লক্ষ্য হয়ে ওঠে। বিস্ফোরণের অভিঘাতে আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় তেহরানের আব্বাস আবাদ এলাকার একটি পুলিশ স্টেশন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় আশপাশের গাছ উপড়ে পড়েছে, বহু ভবনের অন্দরমহল পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে, গাড়িগুলো পুড়ে ধাতব কঙ্কালে পরিণত হয়েছে।

বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির হিসাব অনুযায়ী কয়েক দিনের মধ্যেই অন্তত সাতশোর বেশি সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছে বহু শিশু। ইরানের রেড ক্রিসেন্টও শত শত মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা জানা কঠিন, কারণ সরকার প্রায় সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। তথ্যপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাইরের পৃথিবী অনেক সময় বুঝতেই পারে না শহরের ভেতরে ঠিক কী ঘটছে।

যুদ্ধের সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্যগুলোর একটি দেখা যায় তেহরানের উত্তরাঞ্চলের গান্ধী হাসপাতালে। কাছাকাছি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন যোগাযোগ টাওয়ারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে তার অভিঘাতে হাসপাতালের একটি অংশ ধসে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায় চিকিৎসক ও নার্সরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে আহত রোগীদের সরিয়ে নিচ্ছেন। একই সময়ে ইরানের দক্ষিণের মিনাব শহরের একটি মেয়েদের স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। বহু শিশু নিহত হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনাকে যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডিগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেছে।
এই অবস্থায় তেহরানের সাধারণ মানুষের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। অনেকেই শহর ছেড়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায় চলে যেতে শুরু করে। ফলে ধীরে ধীরে রাজধানী ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। যারা থেকে গেছে, তারা নিজেদের মতো করে বাঁচার উপায় খুঁজছে। জানালায় টেপ লাগানো হচ্ছে যাতে বিস্ফোরণের অভিঘাতে কাচ ভেঙে গিয়ে ভেতরে না উড়ে আসে। অনেক পরিবার বাড়ির এমন একটি জায়গা বেছে নিয়েছে যেখানে দেয়াল বেশি মোটা বা জানালা নেই। সেখানে কুশন ও বালিশ দিয়ে একটি অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করা হয়েছে। অনেকেই একটি ব্যাগ সব সময় প্রস্তুত রেখে দেয় যাতে প্রয়োজনে মুহূর্তের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে পালানো যায়।

এদিকে শহরের ভেতরে আরেক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইসলামিক মিলিশিয়া বাসিজি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী শহরের বিভিন্ন জায়গায় চেকপয়েন্ট বসিয়েছে। সশস্ত্র সদস্যরা মোটরসাইকেলে টহল দিচ্ছে। অনেক বাসিন্দা বলছেন, এই একই বাহিনী জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে গুলি চালিয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষ এখন দ্বিগুণ ভয়ের মধ্যে রয়েছে—একদিকে আকাশ থেকে বোমা পড়ছে, অন্যদিকে নিজের রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী রাস্তায় টহল দিচ্ছে।
কারাগারগুলোর পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত একটি বড় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে বন্দিদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। তারা নিজেদের ওয়ার্ড ছেড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। পরে জানা যায় সরকার নাকি আর্থিক অপরাধে দণ্ডিত কিছু বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছে, কিন্তু রাজনৈতিক বন্দিদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ দেওয়া হবে না।

এই যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্য অন্ধকার। ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত। ফলে শহরের মানুষ অনেক সময় জানতেই পারে না কোথায় হামলা হতে পারে। একবার ইজরায়েলি সেনাবাহিনী সামাজিক মাধ্যমে তেহরানের একটি এলাকায় হামলার আগে বাসিন্দাদের সরে যেতে বলেছিল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ সেই সতর্কবার্তা দেখতে পায়নি, কারণ তাদের কাছে ইন্টারনেটই ছিল না। এক ইরানি নারী ইনস্টাগ্রামে অল্প সময়ের জন্য ভিপিএন ব্যবহার করতে পেরে লিখেছিলেন, “আমরা বোমার নিচে আছি, ইন্টারনেট নেই, অথচ এলাকা ছাড়ার নির্দেশ এসেছে। আমরা কীভাবে বাঁচব?”
এই মুহূর্তে ইরানের মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভবিষ্যৎ নিয়ে। কেউ কেউ মনে করছে বিদেশি হামলা শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারে। অন্যরা আশঙ্কা করছে দেশটি দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নয় যেখানে বাইরের সামরিক আঘাতে একটি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে বহু বছর লেগেছে। ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের মনে সেই আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই সব বড় রাজনৈতিক প্রশ্নের মাঝখানে তেহরানের সাধারণ মানুষের জীবন এখন খুব ছোট ছোট বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। জানালার কাচ ভেঙে পড়বে কি না, রাতের মধ্যে আবার সাইরেন বাজবে কি না, বাচ্চাদের কোথায় নিরাপদে রাখা যাবে—এই সব প্রশ্নই এখন তাদের দৈনন্দিন চিন্তার কেন্দ্র। শহরের আকাশে যখনই যুদ্ধবিমান নিচু দিয়ে উড়ে যায়, অনেকেই নিঃশব্দে অপেক্ষা করে—পরের বিস্ফোরণটা কোথায় হবে। আর প্রতিটি পরিবারের মনে ঘুরে ফিরে আসে সেই একই প্রশ্ন, যেটা সামিরার স্বামী প্রথম রাতেই করেছিলেন—এখন কী হবে।