সোমক রায়চৌধুরী: আবার বিশ্বকাপ। আবার সেমিফাইনাল। আবার ইডেন গার্ডেন। বিষয়টা এডেন মার্করামের দক্ষিণ আফ্রিকাকে কিঞ্চিত মানসিক চাপে ফেলে দিতে পারে বুধবার নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে। আড়াই বছর আগে একদিনের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই ইডেনেই অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে শেষ হয়ে গিয়েছিল টেম্বা বাভুমার দক্ষিণ আফ্রিকার স্বপ্ন। হোয়াইট বল ক্রিকেটের বিশ্বকাপে চোকার্স তকমাটা কিন্তু এখনও লেগে রয়েছে প্রোটিয়াদের গায়ে।

তবে অতীত নিয়ে না ভাবতে বসে যদি স্রেফ বর্তমানের ফর্মের ভিত্তিতে বিচার করা হয়, তাহলে এডেন মার্করামরা নিঃসন্দেহে ফেভারিট হিসেবে শুরু করবেন প্রথম সেমিফাইনালে। এ যাবত প্রতিযোগিতায় একমাত্র তাদের পকেটেই রয়েছে সব ম্যাচ জেতার রেকর্ড। তারপর ব্যাট হাতে ক্যাপ্টেনের দুরন্ত ছন্দ। সাত ম্যাচে মার্করামের ব্যাট থেকে এসেছে ২৬৮ রান। ফর্মে থাকা রায়ান রিকেলটন বা বিস্ফোরক ব্যাটার কুইন্টন ডি কর্ককে নিয়ে যদি সান্ধ্য ইডেনে ঝড় তুলতে পারেন মার্করাম, তাহলে মিচেল স্যান্টনারদের পক্ষে ম্যাচে ফেরা কঠিন হতে পারে। এরপর রয়েছেন পাওয়ার-হিটার ডেভিড মিলার। গ্রুপ পর্বের খেলায় কিউইদের সহজেই সাত উইকেটে হারিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে এই প্রতিযোগিতায় প্রোটিয়াদের সবথেকে বড় চমক — আহমেদাবাদে সুপার এইটের ম্যাচে আয়োজক ও গতবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে ৭৬ রানে দুরমুশ করে প্রবল চাপের মুখে ফেলে দেওয়া। এই পর্বের পরের ম্যাচে ছন্দে থাকা ওয়েস্টইন্ডিজকেও হেলায় ন’উইকেটে হারায় তারা। তবে গ্রুপ পর্বে আফগানিস্তানকে হারাতে দ্বিতীয় সুপার ওভার পর্যন্ত লড়তে হয়েছিল কুইন্টন ডি কর্কদের। অলরাউন্ডার মার্কো জানসেন ও জোরে বোলার কাগিসো রাবাডাকে শেষ জিম্বাবোয়ে ম্যাচে বিশ্রাম দিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক। সেমিফাইনালে দু’জনই টিমে ফিরছেন। জানসেন এই ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন।
অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডই শেষ চারে একমাত্র টিম, যারা ইতিমধ্যেই দুটি ম্যাচ হেরেছে। এছাড়া সুপার-এইটে পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের খেলা বৃষ্টিতে ভেস্তে যায়। শ্রীলঙ্কাকে বড় ব্যবধানে হারানোর সুবাদে নেট রানরেটে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে সেমিফাইনালের ছাড়পত্র পেয়েছেন স্যান্টনাররা। এই কিউই দলটা সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের ক্রিকেটের জন্য উপযোগী অলরাউন্ডারে ঠাসা—যেমন রাচিন রাবিন্দ্র বা গ্লেন ফিলিপস। তবে এই নিউজিল্যান্ড নিঃসন্দেহে প্রতিযোগিতার সেরা ফিল্ডিং টিম। দুরন্ত ফিটনেসের ও অসামান্য ক্যাচ নেওয়ার দক্ষতার জন্য তাদের হাইলাইটস রীল দারুণ আকর্ষক। দুর্দান্ত কয়েকটা ক্যাচ নিয়ে গ্লেন ফিলিপস ইতিমধ্যেই আসরের সেরা ফিল্ডার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গিয়েছেন। ইডেনের দর্শকদের মনে হতেই পারে যে ফিলিপস- ফিল অ্যালনদের সত্তর শতাংশ ফিল্ডিং দক্ষতা যদি দেখাতে পারতেন তিলক বর্মা-অভিষেক শর্মারা, তাহলে রবিবার জেতার জন্য শেষ ওভার অবধি অপেক্ষা করতে হত না তাদের। দলটির বোলিং লাইন-আপও বেশ শক্তিশালী। পেসার হিসেবে লকি ফার্গুসন ও ম্যাট হেনরি; আর স্পিন আক্রমণে অধিনায়ক স্যান্টনারের সঙ্গে রয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভুত লেগ স্পিনার ইশ সোধি। স্যান্টনার-সোধি জুটি দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যাটিংকে ঝামেলায় ফেলে দিতে পারেন। সেমিফাইনালে দলে ফিরবেন পেসার জ্যাকব ডাফিও। বোলিং বিভাগে দুটো দলের মধ্যে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর হবে। লুঙ্গি এনগিডি এই বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে সর্বোচ্চ ১২ টি উইকেট নিয়েছেন। তবে ইডেনের উইকেটে মার্করামের তুরুপের তাস হয়ে উঠতে পারেন কেশব মহারাজ। একদিনের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আঁটোসাঁটো বোলিং করে অস্ট্রেলিয়ার জয়রথ প্রায় আটকে দিয়েছিলেন বাঁ হাতি স্পিনার মহারাজ। ইডেনের উইকেট তার চেনা। নিউজিল্যান্ডে কয়েকজন তরুণ অনভিজ্ঞ ব্যাটার রয়েছেন, যাদের পক্ষে পোড়খাওয়া মহারাজকে আক্রমণ করা বা সামলানো সহজ হবে না। এছাড়া রয়েছেন জানসেন, গত ভারত সফরে যিনি ছিলেন ফর্মের তুঙ্গে। বোলিং শক্তিতে দূটো দলের সাম্য থাকলেও, ব্যাটিং-এ সামান্য এগিয়ে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, সাম্প্রতিক ফর্মের জন্য। অধিনায়ক ছাড়াও রায়ান রিকেলটনও এই বিশ্বকাপে করেছেন ২২৮ রান। আর এই ফরম্যাটে, ম্যাচ জেতানোর ব্যাপারে, বোলিং এর থেকে ব্যাটিং-এর গুরুত্ব বেশি।
কিন্তু এসবের উর্ধ্বে আর একটা ফ্যাক্টর রয়েছে–তা হল নার্ভ। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে, দর্শক ঠাসা ইডেনে যারা বেশি নার্ভ দেখাতে পারবে, তারাই রবিবার ফাইনালের ছাড়পত্র আদায় করে নেবে। এমনিতেই টি-২০ ক্রিকেটে পূর্বাভাস কাজ করে না। দু-তিন ওভারের একটা ঝড়ই বদলে দিতে পারে ম্যাচের যাবতীয় সমীকরণ। দক্ষিণ গোলার্ধের এই দুই দেশের কাছেই সীমিত ওভারের যে কোনও ফরম্যাটের বিশ্বকাপ এখনও অধরা মাধুরী। টেম্বা বাভুমার দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও, ২০২৪’এ টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে বারবাডোজে তাদের হারতে হয়েছিল ভারতের কাছে। স্যান্টনার-ডারিল মিচেলদেরও এখনও পর্যন্ত টি-২০ বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য, ২০২১’এ রানার্স হওয়া।
তাই যতই ভাল ফর্মে থাকুন না কেন, হোলির সান্ধ্য ইডেনে বাড়তি সতর্ক থাকতেই হবে মার্করামদের। যে কোনও সময় মরণকামড় দেওয়ার জন্য তৈরি থাকবে তারুণ্যে ভরপুর কিউই দল।