Home সুমন নামা আমাদের দোল

আমাদের দোল

by Suman Chattopadhyay
0 comments 4 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বছরে একবার বাঙালি তার সভ্যতার লেপ-কম্বল খুলে রেখে একটু আদিম হতে চায়। আর সেই শুভক্ষণের নাম—দোল। কেউ বলেন বসন্তোৎসব। কেউ বলেন হোলি। কিন্তু বাঙালির কাছে এটি মূলত এক সাংস্কৃতিক ‘লাইসেন্স’: আজ একটু বুনো হওয়া যায়, একটু বেশি গা-ঘেঁষাঘেঁষি চলে, একটু বেশি চিৎকার করা যায়, যথেচ্ছ পান-ধ‍্যান করা যায় আর রবীন্দ্রসংগীতের মধ্যে দিয়ে সামান্য বিশৃঙ্খলা ঢুকিয়ে দেওয়া যায়।

বাঙালি আদতে নিজেকে ভদ্রলোক বলে ভাবতে ভালোবাসে। ইতিহাস বইয়ের পাতায় সে নিজেকে রেনেসাঁর সন্তান ভাবে, কফিহাউসের টেবিলে সে দার্শনিক, বইমেলায় সে সংস্কৃতিবান। কিন্তু দোলের দিন সেই ভদ্রলোক হঠাৎই রঙের বালতি হাতে এমন এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীতে রূপান্তরিত হন, যাকে দেখে নৃতত্ত্ববিদেরা নতুন অধ্যায় লিখতে পারেন—“হোমো বেঙ্গালেনসিস ইন স্প্রিং ফ্রেনজি।”

দোলের সকালে কলকাতার অলিগলিতে হাঁটলে বোঝা যায়, সভ্যতার স্তরটি আসলে খুব পাতলা। সারা বছর যে প্রতিবেশী “দাদা, একটু আসবেন?” বলে মৃদুস্বরে কথা বলেন, তিনি সেদিন হঠাৎই চেঁচিয়ে ওঠেন—“এই দাঁড়াও! রঙ না মেখে যাবি কোথায়?” এই ‘রঙ’ শব্দটির মধ্যেই এক রহস্যময় আদিমতা লুকিয়ে থাকে। যেন শিকার ধরার আগে গুহাবাসীরা যেমন চিৎকার করত, তেমন এক উল্লাস।

যদি কেউ ভাবে, এই আদিমতার সঙ্গে শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবের কোনও সম্পর্ক নেই, তবে সে ভুল করবে। কারণ আদিমতা কখনও কখনও খুবই নান্দনিক বেশে আসে। বিশ্বভারতীর র প্রাঙ্গনে বসন্তোৎসব মানে হলুদ পাঞ্জাবি, গাঁদা ফুলের মালা, রবীন্দ্রনৃত্য, ‘ওরে গৃহবাসী’, অথবা ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’-সব মিলিয়ে এক শৃঙ্খলাবদ্ধ উচ্ছ্বাস। এখানে আবীর খেলা হয় কিন্তু পরিমিতভাবে; গান গাওয়া হয় তাল-লয়ের মধ্যে, হাসাহাসি হয় সৌন্দর্যের আবরণে।

অন্যদিকে পাড়ার দোল একেবারেই গণতান্ত্রিক। এখানে রঙের কোনও নন্দনতত্ত্ব নেই—আছে কেবলমাত্র রঙের আধিপত্য। কে কাকে আগে রাঙাবে, কে কাকে জোর করে টেনে আনবে—এই ক্ষমতার রাজনীতিই মূল নাটক। শান্তিনিকেতনে যেখানে বসন্ত আসে কবিতার পায়ে, পাড়ায় সেখানে বসন্ত আসে ডি.জে.র বেস গিটারের তালে।

বাঙালি এই দুই সত্তাকেই সমানভাবে ধারণ করে। সকালে সে রবীন্দ্রসংগীত গায়, বিকেলে সে “বালম পিচকারি”তে নাচে। এবং এই দ্বৈততা নিয়েই তার আত্মগর্ব। যেন সে বলতে চায়—দেখো, আমি একই সঙ্গে পরিশীলিত এবং প্রাগৈতিহাসিক।
দোলের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক হল ‘অনুমতি’র সাময়িক অবলুপ্তি। সারা বছর যে সমাজ ব্যক্তিগত পরিসর নিয়ে এত সচেতন, সেই সমাজ দোলের দিনে হঠাৎই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে প্রত্যেকেই রঙ মাখার জন্য তৈরি। “না” শব্দটি সেদিন প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কেউ যদি বলেন, “আমি খেলব না”,তাকে বোঝানো হয়, “এটা তো একদিনই!”
এই একদিনই যেন বাঙালির দমিয়ে রাখা স্পর্শকামিতা, দমিয়ে রাখা উচ্ছ্বাস, দমিয়ে রাখা বিদ্রোহ, সব কিছুরই মুক্তির দিন। সমাজতত্ত্বের ভাষায় একে বলা যায় ‘রিচুয়ালাইজড ট্রান্সগ্রেশন’—একটি নিয়ন্ত্রিত উচ্ছৃঙ্খলতা, যেখানে নিয়ম ভাঙা নিজেই এক নিয়ম।
তবে এই উচ্ছ্বাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক সূক্ষ্ম হিংস্রতাও। রঙের নামে কাদা, ডিম, এমনকি কখনও কখনও অস্বস্তিকর আচরণ, সবই যেন বৈধতা পায়। বাঙালি, যে সারা বছর নৈতিক বক্তৃতা দিতে পছন্দ করে, সে সেদিন নৈতিকতার ছুটি ঘোষণা করে।
ঐতিহাসিকভাবে দোলের শিকড় বৈষ্ণব পরম্পরায়। রাধা-কৃষ্ণর রঙের খেলায় প্রেম, ভক্তি ও লীলার এক মাধুর্য ছিল। কিন্তু আধুনিক বাঙালি এই আধ্যাত্মিক আবহকে ধীরে ধীরে ‘কালচারাল ইভেন্ট’-এ রূপান্তরিত করেছে। এখন দোল মানে ইনস্টাগ্রাম-যোগ্য ছবি, হলুদ শাড়ি, গালে টিপে লাগানো আবির, আর ক্যাপশনে—“বসন্ত এসে গেছে।”
এই রূপান্তর নিজেই এক ব্যঙ্গ। কারণ বাঙালি ধর্ম থেকে দূরে সরে এসে নিজেকে সেকুলার প্রমাণ করতে চেয়েছে, অথচ উৎসবের মূলে যে ধর্মীয় আবেগ ছিল, তার রঙিন অবশেষ এখনও রয়ে গেছে। যেন আমরা বলছি, আমরা ভক্ত নই, আমরা নান্দনিক।
দোল শুধু আবেগ নয়, অর্থনীতিও। রঙ, পিচকারি, মিষ্টি, ঠান্ডাই, সব মিলিয়ে এক ক্ষুদ্র বাজারচক্র। পাড়ার ক্লাবের তহবিল, ডি.জে.র ভাড়া, সেলফি-ফ্রেন্ডলি সাজসজ্জা, সবই সামাজিক পুঁজির অংশ। কে কত বড় আয়োজন করল, কার বাড়ির ছাদে কতজন এলো এসবই সামাজিক প্রতিপত্তির সূচক।
বাঙালি এখানে আবার তার শ্রেণিচেতনা প্রকাশ করে। একদিকে আছে অভিজাত আবাসনের ‘অর্গানিক কালার’ ও ‘রেইন ডান্স’; অন্যদিকে আছে গলির মোড়ে প্লাস্টিকের বালতিতে মেশানো উজ্জ্বল রং। দুটি ক্ষেত্রেই আনন্দ আছে, কিন্তু সামাজিক ভাষ্য
দোলের পরদিনই শুরু হয় নস্টালজিয়া। “ছোটবেলায় কী দোল খেলতাম! এই বাক্যটি ফেরে প্রায় প্রত্যেক বাঙালির মুখে মুখে। যেন অতীতের দোল ছিল আরও নির্মল, আরও উন্মুক্ত, আরও আদিম। বর্তমানকে আমরা দোষ দিই, “এখন তো সব কেমিক্যাল রং।”
এই নস্টালজিয়া আসলে এক আত্মরক্ষামূলক কৌশল। আমরা আমাদের বর্তমান উচ্ছৃঙ্খলতাকে অতীতের স্মৃতির আড়ালে বৈধতা দিই। বলি—আমরা তো আগেও এমনই

আদিমতা কি সত‍্যিই অতিশয় খারাপ বস্তু? হয়তো এই আদিমতাই বাঙালির সত্যিকারের প্রাণশক্তি। সারা বছর যে জাতি রাজনৈতিক তর্কে ক্লান্ত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় দমবন্ধ, সাংস্কৃতিক আত্মগরিমায় ভারাক্রান্ত, সে যদি একদিন রঙ মেখে হেসে উঠতে পারে, তবে সেই আদিমতা হয়তো মুক্তিরই আরেক নাম।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই মুক্তি কি সত্যিই সমান? সকলেই কি সমানভাবে আনন্দ পায়? নাকি কারও জন্য এটি নিছক আক্রমণ, কারও জন্য নিছক প্রদর্শনী?
দোল ও বসন্তোৎসব তাই বাঙালির এক আয়না। এখানে সে একই সঙ্গে কবি, বর্বর, দার্শনিক, কিশোর, বিপ্লবী ও ভদ্রলোক। সে যেমন রবীন্দ্রসংগীতের সূক্ষ্ম সুরে নিজেকে খুঁজে পায়, তেমনই রঙের বালতিতে ডুবে গিয়ে নিজের ভেতরের প্রাগৈতিহাসিক চিৎকারটিকেও মুক্ত করে।

শেষ পর্যন্ত হয়তো এই দ্বৈততাই বাঙালির আদিম‍তার আসল ব্যাখ্যা। আমরা সভ্যতার আবরণে ঢেকে রাখি আমাদের বুনো সত্তাকে। আর দোলের দিনে তাকে বলি“আজ বেরিয়ে আয়, কাল আবার গুহায় ফিরে যাস।”

বসন্তের রঙ তাই শুধু আবির নয়, তা বাঙালির অন্তর্লীন দ্বন্দ্বেরও রঙ। এখানে আদিমতা লজ্জার নয়, আবার সম্পূর্ণ গৌরবেরও নয়। এটি এক সামাজিক নাটক যেখানে আমরা সবাই অভিনেতা, এবং প্রত্যেকে জানি, মঞ্চের আলো নিভলেই আমরা আবার ভদ্রলোক হয়ে যাব।
আর ততক্ষণ পর্যন্ত, রঙ মেখে বলি—“বসন্ত এসে গেছে।”

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles