বাংলাস্ফিয়ার: পুঁজিবাদ সমস্যা নয়। আসলে রাজনীতিই সমস্যা। বেশিরভাগ আমেরিকানদের কাছে “পুঁজিবাদ” শব্দটা শুনলেই একটা পরিচিত ছবি ভেসে ওঠে: অল্প কিছু মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ জমে আছে, আর লক্ষ লক্ষ মানুষ বাড়িভাড়া, চিকিৎসা বা সাধারণ নিরাপত্তার খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছে। অসমতা, অস্থিরতা, আর “জিতলে সব, হারলে কিছুই না”—এই ধরনের নির্মম অর্থনৈতিক বাস্তবতার জন্য পুঁজিবাদকেই দায়ী করা হয়। এমনকি যারা এর ফলে কষ্ট পাচ্ছে, তারাও অনেক সময় এটাকে অবশ্যম্ভাবী বলে মেনে নেয়—একটা ব্যবস্থা যা সম্পদ তৈরি করে, যদিও অনেক মানুষকে পিছনে ফেলে রাখে। কিন্তু এই বিশ্বাসটা আসলে একটা মৌলিক ভুল বোঝাবুঝির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমেরিকায় যে সমস্যাগুলো দেখা যায়, সেগুলো পুঁজিবাদের অনিবার্য ফল নয়। এগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। পুঁজিবাদ সর্বত্র আছে; রাজনৈতিক বক্তৃতায় প্রায়ই পুঁজিবাদকে একেবারে “আমেরিকান” জিনিস হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু বাস্তবে এটা প্রায় সব আধুনিক শিল্পোন্নত অর্থনীতির ভিত্তি। ইউরোপের দেশগুলো পুঁজিবাদী। চীনও পুঁজিবাদী। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়ন, যারা নিজেদের সমাজতান্ত্রিক বলত, তারাও শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর জন্য মূলধন বিনিয়োগের ওপর অনেকটাই নির্ভর করত। পার্থক্যটা পুঁজিবাদ আছে কি নেই, সেখানে নয়। পার্থক্যটা হলো, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কীভাবে এর লাভ আর ক্ষতি ভাগ করে দেয়। পুঁজিবাদ, তার সবচেয়ে সহজ রূপে, কোনো নৈতিক দর্শন বা রাজনৈতিক মতবাদ নয়। এটা একটা অর্থনৈতিক পদ্ধতি, যেখানে যন্ত্র, সরঞ্জাম, অবকাঠামো আর প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হয়। যখন একজন কৃষক হাত দিয়ে কাজ করার বদলে ট্র্যাক্টর ব্যবহার করে, তার উৎপাদন হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। যখন কারখানায় আধুনিক মেশিন ব্যবহার করা হয়, তখন কম খরচে বেশি উৎপাদন সম্ভব হয়। এর ফলে জিনিসপত্র সস্তা হয়, আর উৎপাদকরাও বেশি আয় করতে পারে। ইতিহাসে এই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিই মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার প্রধান কারণ। তাত্ত্বিকভাবে, পুঁজিবাদ উৎপাদক আর ভোক্তা—দুজনেরই উপকার করতে পারে। তাহলে আমেরিকায় এটা ইউরোপের তুলনায় এত আলাদা মনে হয় কেন? আমেরিকার ব্যতিক্রম এর অর্থনীতিতে নয়, শাসনব্যবস্থায়। আমেরিকায় চাকরি হারানো মানে ভয়ঙ্কর বিপর্যয় হতে পারে। সেখানে চিকিৎসা সুবিধা প্রায়ই চাকরির সঙ্গে জড়িত থাকে, তাই চাকরি গেলে চিকিৎসার সুযোগও হারাতে হয়। বাসস্থানের অনিশ্চয়তা খুব সাধারণ ব্যাপার, আর প্রায় সব বড় শহরেই গৃহহীন মানুষ দেখা যায়। অন্যদিকে, ইউরোপের অনেক দেশে আইন আর সামাজিক ব্যবস্থা মানুষকে বেশি নিরাপত্তা দেয়। সেখানে শ্রমিকদের শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা থাকে, চিকিৎসা ব্যবস্থা সবার জন্য নিশ্চিত থাকে, আর হঠাৎ অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন সুরক্ষা থাকে। জার্মানির মতো দেশে, আইন অনুযায়ী কোম্পানিগুলো কর্মীদের ব্যক্তিগত সময়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা অসুস্থতার কারণে আর্থিক ধ্বংসের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। তবুও এই দেশগুলো সম্পূর্ণ পুঁজিবাদী। পার্থক্যটা পুঁজিবাদে নয়, পার্থক্যটা হলো রাজনীতি কীভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
রাজনৈতিক প্রণোদনার প্রভাব: আমেরিকার রাজনীতি খুব ছোট ছোট নির্বাচনী চক্রের ওপর চলে। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের প্রতি দুই বছর অন্তর নির্বাচন দিতে হয়। ফলে তারা প্রায় সব সময়ই নির্বাচনী প্রচারের মধ্যে থাকে। আর এই প্রচারের জন্য প্রচুর টাকা লাগে। ফলে রাজনীতিবিদদের সব সময় টাকা জোগাড় করতে হয় আর এই টাকা প্রায়ই আসে ধনী ব্যক্তি আর কর্পোরেট সংস্থার কাছ থেকে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা সেইসব মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, যারা তাদের অর্থ সাহায্য করতে পারে। লবিং অর্থাৎ আইনি উপায়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো—এই ব্যবস্থার একটা বড় অংশ হয়ে গেছে। ধনী ব্যক্তি আর কর্পোরেশনগুলো তাদের পছন্দের আইন পাশ করানোর জন্য প্রচারাভিযান, রাজনৈতিক সংগঠন আর বিভিন্ন গোষ্ঠীকে অর্থ সাহায্য করে। ধীরে ধীরে এর ফলে এমন নীতি তৈরি হয়েছে, যা ধনী মানুষদের বেশি সুবিধা দেয়। কর ব্যবস্থা, নিয়মকানুন আর আইন প্রায়ই সেইসব মানুষের স্বার্থ অনুযায়ী তৈরি হয়, যাদের রাজনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এটা পুঁজিবাদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নয়। এটা রাজনৈতিক কাঠামোর ফল। ইউরোপেও রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্নীতি নেই, এমন নয়। কিন্তু তারা এর প্রভাব কমানোর জন্য নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। নির্বাচনী খরচ অনেক সময় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের সময়সীমা সীমিত থাকে বা সরকার থেকে বরাদ্দ করা হয়, ফলে ধনী প্রার্থীরা অতিরিক্ত সুবিধা পায় না। স্বচ্ছ আইন থাকায় বেআইনি অর্থের প্রভাব ধরা সহজ হয়। নরওয়ে বা ডেনমার্কের মতো দেশে আর্থিক তথ্য অনেকটাই প্রকাশ্য থাকে, আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন আছে। রাজনৈতিক অনুদান নিয়ন্ত্রিত, আর আইন ভাঙলে কঠিন শাস্তি হয়। এই ব্যবস্থাগুলো পুঁজিবাদকে সরায় না। বরং এটাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে সেখানে পুঁজিবাদ থাকলেও, আমেরিকার মতো এত বেশি অসমতা বা অনিশ্চয়তা দেখা যায় না।
অর্থনৈতিক উন্নতির মিথ: আমেরিকানদের প্রায়ই বলা হয়, কঠোর পরিশ্রম করলে সবাই উপরে উঠতে পারে। এটা তাদের জাতীয় পরিচয়ের একটা বড় অংশ। কিন্তু বাস্তব তথ্য অন্য কথা বলে। সামাজিক গতিশীলতা অর্থাৎ বাবা-মায়ের তুলনায় নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি—সাম্প্রতিক দশকে অনেক কমে গেছে। ইউরোপের অনেক দেশে এখন আমেরিকার তুলনায় উপরে ওঠার সুযোগ বেশি। একই সময়ে, সম্পদ ক্রমশ অল্প কিছু মানুষের হাতে জমা হচ্ছে। সবচেয়ে ধনী মানুষরা বিনিয়োগ, কর নীতি আর রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে বেশি লাভবান হচ্ছে। এগুলো পুঁজিবাদের অনিবার্য ফল নয়। এগুলো নীতিগত সিদ্ধান্তের ফল।
পুঁজিবাদ বনাম দুর্নীতি: পুঁজিবাদ আসলে একটা হাতিয়ার। এটা সম্পদকে দক্ষভাবে ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ায়। এটা জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে, নতুন প্রযুক্তি আনতে পারে, আর মানুষের কাছে বেশি পণ্য পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু সম্পদ কীভাবে ভাগ হবে, সেটা পুঁজিবাদ ঠিক করে না। সেটা ঠিক করে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, আইন, আর সমাজের অগ্রাধিকার। যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধনী মানুষদের অতিরিক্ত প্রভাবের সুযোগ দেয়, তখন পুঁজিবাদ ভয়ঙ্কর অসমতা তৈরি করতে পারে। আর যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ আর জবাবদিহি নিশ্চিত করে, তখন পুঁজিবাদ স্থিতিশীলতা আর সমৃদ্ধির সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। পার্থক্যটা অর্থনীতিতে নয়। পার্থক্যটা শাসনব্যবস্থায়।
অনেক মানুষ মনে করেন, পুঁজিবাদই সবকিছু নির্ধারণ করে। কিন্তু আসল সত্যটা হলো, সমাজের হাতে পছন্দ করার ক্ষমতা থাকে। তারা চাইলে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, অথবা এটাকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে দিতে পারে। তারা চাইলে অর্থনৈতিক লাভ সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে পারে, অথবা অল্প কিছু মানুষের হাতে জমতে দিতে পারে। তারা চাইলে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, অথবা তাদের পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে পারে। আমেরিকা নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা তাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে তৈরি করেছে। অন্য দেশগুলো, একই পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে থেকেও, ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর ভিন্ন ফলও পেয়েছে। এই পার্থক্যটা বোঝা খুব জরুরি। শুধু পুঁজিবাদকে দোষ দিলে আসল সমস্যাটা চোখ এড়িয়ে যায়। আর সেই সমস্যাটা না বুঝলে, কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনা কঠিন। পুঁজিবাদ নিয়তি নয়। রাজনীতিই নিয়তি।