বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ার আদিগন্ত বালুরাশিতে এসে পা হড়কে গিয়েছে, তাঁরা বিপাকে পড়েছেন, এমন মার্কিন প্রেসিডেন্টের তালিকা দীর্ঘ। তবু সেই ইতিহাসকে উপেক্ষা করেই ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উপর একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা চালালেন। পেন্টাগন থেকে তাঁর নিজের প্রশাসনের অভ্যন্তর-সবাই জানত, এই যুদ্ধের ফল অনিশ্চিত। ইজরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত এই আক্রমণ হয়তো এমন এক ইরানের জন্ম দিতে পারে যা নতুন সরকার গঠন করে আপস ও শান্তির পথে হাঁটবে। আবার এও সম্ভব, তা গোটা অঞ্চলকে আরও অস্থিরতা ও রক্তপাতের দিকে ঠেলে দেবে। তবু ট্রাম্প ঝুঁকিটা নিয়েছেন সচেতনভাবেই।
হামলার কিছু পরেই নিজের বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি যেন একসঙ্গে বহু লক্ষ্য স্থির করলেন। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তিনি সরাসরি হুমকি বলে চিহ্নিত করলেন। ঘোষণা করলেন, তাদের পারমাণবিক প্রকল্পের অবসান ঘটাবেন। একইসঙ্গে ইরানের জনগণকে বিদ্রোহে উসকে দিলেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি নিশ্চিত করলেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই নিহত। ইজরায়েল জানাল, ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বহুজন আর জীবিত নন।
প্রথম ধাক্কায় শাসনব্যবস্থার মস্তকচ্ছেদ-দৃষ্টিনন্দন ও নাটকীয়। কিন্তু এ সাফল্য স্থায়ী ফল বয়ে আনবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। স্বল্পমেয়াদে ইরান প্রতিশোধপরায়ণ হতে পারে। বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-যাদের অর্থনীতি স্থিতিশীলতার উপর দাঁড়িয়ে-তাদের শহর লক্ষ্য করে অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা অসম্ভব নয়। যে কোনও মার্কিন ঘাঁটি বা যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানলে বহু সেনা প্রাণ হারাতে পারেন -রবিবার তিন মার্কিন সেনার মৃত্যুসংবাদ সেই আশঙ্কাকে সত্য প্রমান করেছে। তেলক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত করা বা হরমুজ প্রণালীতে ট্যাঙ্কার চলাচল ব্যাহত করলে তেলের দাম সহজেই ব্যারেলপিছু ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে বিপদের রূপ আরও সূক্ষম। খামেনেই প্রবীণ ও অসুস্থ ছিলেন, তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে প্রস্তুতি বহুদিন ধরেই চলছিল। আপাতত ক্ষমতা একটি ত্রয়ীর হাতে। পরবর্তী শাসক এমন কেউ হতে পারেন যিনি সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে হাজারো মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত। নতুন রক্তমাখা কর্তৃত্ব হয়তো পূর্বসূরির মতোই কঠোর ও আপসহীন হবে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত অব্যাহত রাখা তার পক্ষে কঠিন নয়, শুধু সেই কারণে আর একটি যুদ্ধের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করা দুষ্কর। বরং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার বদলে উত্তর কোরিয়ার পথেই হাঁটতে পারে ইরান-নিজস্ব পরমাণু অস্ত্রকেই নিরাপত্তার চূড়ান্ত গ্যারান্টি বলে মেনে নিয়ে।
আরও এক সম্ভাবনা-রাষ্ট্র ভেঙে পড়া। বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধ সীমান্ত ছাড়িয়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার কার হাতে পৌঁছবে, কেউ জানে না।
এই ঝুঁকিগুলি ট্রাম্পের অজানা নয়। তাঁর রাজনৈতিক ঘাঁটির বড় অংশ পশ্চিম এশিয়ায় নতুন যুদ্ধ চায় না। তেলের দাম সামান্য বাড়লেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তা ভোটারদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। তিনি চাইলে জেনেভার আলোচনায় অগ্রগতির কথা বলে সময় নিতে পারতেন। তবু কেন এই তাড়াহুড়া?
সম্ভবত একটি কারণ ইতিহাসে নিজের স্থান নিশ্চিত করার বাসনা, ইরানের সঙ্গে চার দশকের অমীমাংসিত বিরোধ চুকিয়ে দেওয়া সেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্মরণীয় হওয়া। উপসাগরীয় মিত্রদের সতর্কবাণীর পাশাপাশি ইসরায়েলের মতো শক্ত অবস্থানপন্থীদের তাগিদও তিনি শুনেছেন। শনিবারের সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি ১৯৭৯ সালের অপমানের কথা স্মরণ করালেন, তেহরানে মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের ৪৪৪ দিন বন্দী থাকার ঘটনা। সেই স্মৃতি আমেরিকার রাজনৈতিক চেতনায় এখনও জ্বলন্ত।
আরেকটি কারণ-সময় নির্বাচন। ইরানের আকাশরক্ষা ব্যবস্থা আগেই দুর্বল হয়েছে; সাম্প্রতিক সংঘাতে তাদের সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ক্ষয়প্রাপ্ত। অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভে শাসনের প্রতি আস্থা নড়বড়ে। লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং সিরিয়ায় ইরানঘনিষ্ঠ শক্তির বিরুদ্ধে ইজরায়েলের সাফল্য হয়তো ট্রাম্পকে মনে করিয়েছে-এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত।
এই পদক্ষেপ বৃহত্তর এক ধাঁচের অংশ যেখানে আমেরিকা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থায় নিজের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা বহুবার তার হাতিয়ার হয়েছে; এখন সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতিও স্পষ্ট। ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানে হামলা, কিউবার উপর বাড়তি চাপ প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ্য দেশগুলি চীন ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ।
শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতাবস্থা রক্ষা করার পরিবর্তে ট্রাম্প অন্য পথ নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির সীমারেখা অগ্রাহ্য করে তিনি বলপ্রয়োগকে প্রধান উপায় করে তুলছেন। পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলি অন্তত বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামোর একটি পরিকল্পনা সামনে রাখত, যতই তা ত্রুটিপূর্ণ হোক। এখানে সেই রূপরেখা স্পষ্ট নয়।
এই কৌশলের প্রতিরোধমূলক প্রভাবকে খাটো করে দেখা যাবে না। চীনসহ অন্যান্য শক্তি নিশ্চয়ই লক্ষ করছে। কখনও কখনও শক্তি প্রদর্শন সাময়িক স্থিতি আনতে পারে -“শক্তির মাধ্যমে শান্তি” স্লোগানটি তখন বিশ্বাসযোগ্য শোনায়। কিন্তু যদি একমাত্র নীতি হয় নিছক ক্ষমতার প্রদর্শন, তবে ফল হতে পারে আস্থরতার ঘূর্ণি। সংঘাত বাড়তে পারে, ছড়িয়ে পড়তে পারে-আর সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার সামর্থ্য কিংবা আগ্রহ ওয়াশিংটনের হাতে নাও থাকতে পারে।
শেষ পর্যন্ত আশা এই যে, ইরানের মানুষ হয়তো আরও স্বাধীন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ পাবে। কিন্তু যদি তাদের দুর্দশা অব্যাহত থাকে, দীর্ঘ পুনর্গঠনের দায়ভার ট্রাম্প নেবেন এমন প্রত্যাশা করার কারণ কম। তাঁর দৃষ্টিতে প্রধান কাজটি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন।