Home সংবাদ এক ঘোর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ইরান

এক ঘোর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ইরান

0 comments 14 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: গত বছর জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি আপাতত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইর জীবনকে। যদিও একই সময়ে আমেরিকান বোমারু বিমান ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলিকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল আর ইজরায়েল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বস্ত করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের একের পর এক হত্যা করছিল। সেই যুদ্ধের দ্বিতীয় অঙ্কে যা ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হোল, সেখানে আমেরিকা ও ইজরায়েল শেষ পর্যন্ত খামেনেহাক হত্যা করেছে। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখলেন, “ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট মানুষটি মৃত।” কয়েক ঘণ্টা পর ইরানও তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।

এই প্রাণঘাতী আঘাত প্রায় অর্ধশতাব্দীব্যাপী আমেরিকা ও ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনের পারস্পরিক বৈরিতার এক রক্তাক্ত পরিণতি। বহু দশক ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সমর্থকেরা ” আমেরিকা আর ইজরায়েলের মৃত র জন্য’জনা” স্লোগান দিয়েছে। এখন সেই ব্যবস্থাই তার সর্বোচ্চ নেতাকে হারাল এবং সঙ্গে হারাল বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকেও। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে, এটি ট্রাম্পের এক দৃষ্টিনন্দন সাফল্য বলেই মনে হতে পারে। তিনি বহুদিন ধরেই ইরানি শাসনের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড এবং আঞ্চলিক

অস্থিতিশীলতায় তাদের ভূমিকার একটি তালিকা প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। সম্ভবত তিনি ইরানের ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার হৃদয়ে এক মারাত্মক আঘাত হেনেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হোল, এরপর কী? সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি এবং এক জোষ্ঠ আলেমকে নিয়ে গঠিত একটি নেতৃত্ব পরিষদ অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবে। তবে তারা সকলে বেঁচে আছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। অনেকে ধারণা করেছিলেন, খামেনেইর পুত্র মোজতবা ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারেন যদিও তাঁর মৃত্যুর খবরও শোনা যাচ্ছে। বেঁচে থাকা শাসকগোষ্ঠী হয়তো নতুন কোনো আলেমকে মনোনীত করতে পারে, কিংবা একাধিক আলেমের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রায় সকলেই জানে ইরানে প্রকৃত ক্ষমতা ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী-আইআরজিসির হাতেই রয়েছে, যারা শাসনের প্রেটোরিয়ান রক্ষী। সমস্যাটি হোল, তাদেরও বহু শীর্ষ ব্যক্তিত্ব নিহত হয়েছেন। ইজরায়েলের দাবি অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন আলি শামখানি-আইআরজিসির অভিজ্ঞ সদস্য ও খামেনেইর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং বাহিনীর কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর।

তবু ব্যবস্থাটি টিকে থাকতে পারে। ওয়াশিংটনের থিংক-ট্যাঙ্ক ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট’-এর ত্রিতা পারসি মন্তব্য করেছেন, “এটি কোনো রাজতন্ত্র নয়, যেখানে শাহ

চলে গেলে এবং তাঁর সমস্ত পুরুষ উত্তরাধিকারীদের সরিয়ে দিলে ব্যবস্থাও ভেঙে পড়বে। এটি একটি ব্যবস্থা যেটি খুব জনপ্রিয় নয় তবু এর নিরাপত্তা কাঠামো কোনও একজন ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল নয়।” শাসকগোষ্ঠী হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে খামেনেইর মৃত্যু ঘোষণা বিলম্বিত করেছে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া সুসংহত করতে। অন্তত আমেরিকার নীরব সম্মতি ছাড়া নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করলে তারা সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

বহু মানুষই আশঙ্কা করছেন অস্থিরতার। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও কুশাসনে জর্জরিত ৯ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ ইরান এক বহু-জাতিগত, দাহ্য রাষ্ট্রকাঠামো। আরব, কুর্দি, আজেরি ও বালুচ সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের নানা আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, যা ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে মাথাচাড়া দিতে পারে। হামলার কয়েক দিন আগে ট্রাম্পের দূত টম ব্যারাক নাকি ইরাকি কুর্দিস্তান সফর করে ইরানি কুর্দিদের বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত থাকতে উৎসাহিত করেছিলেন। ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতন এবং ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির উৎখাতের পর যে রক্তক্ষয়ী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, তার স্মৃতি এখনও অঞ্চলের মানসে দগদগে।

ট্রাম্প হয়তো ভেনেজুয়েলার আদলে কোনও ফলাফল আশা করছেন-যেখানে আমেরিকা শাসনের শীর্ষ ব্যক্তিকে সরিয়ে দিয়ে অবশিষ্ট কাঠামোর সঙ্গে এমন এক রূপান্তর নিয়ে দরকষাকষি করবে, যা আমেরিকার স্বার্থের অনুকূলে হবে। তিনি বলেছেন, ক্ষমতা গ্রহণের জন্য কয়েকজন “ভালো প্রার্থী” আছেন, তবে নাম বলেননি। শাসনের কিছু অভিজ্ঞ বাক্তিত্ব বেঁচে আছেন বলেই মনে করা হয়, যেমন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ এবং তাঁর পূর্বসূরি আলি লারিজানি। কিন্তু দু’জনেই শাসনব্যবস্থার ইতিহাসে গভীরভাবে জড়িত, এবং ক্রমহ্রাসমান সমর্থনভিত্তির কারণে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা তাঁদের পক্ষে কঠিন হবে। তুলনায় সম্ভাবাতর প্রার্থী হতে পারেন হাসান রুহানি, দুই দফায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, যিনি ২০১৫ সালে পশ্চিমের সঙ্গে সমঝোতার লক্ষ্যে পারমাণবিক চুক্তি করেছিলেন।

অনাদিকে, যদি আমেরিকা ও ইজরায়েল স্থির করে গোটা বাবস্থাটিকে নির্মূল করাই হবে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আরও গভীর নির্মূলকরণে যায়, তবে তারা কোনও তুলনামূলকভাবে অখ্যাত কমান্ডারাক সমর্থন করতে পারে অথবা শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভিকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে পারে। ইজরায়েলের প্রকাশ্য সমর্থন রয়েছে রাজপুত্রের প্রতি। তবে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি।

ট্রাম্পের ঝুঁকিটা এখানেই। তিনি যেন এক অস্পষ্ট লক্ষ্যসম্পন্ন সামরিক অভিযানে জড়িয়ে না পড়েন, যার উদ্দেশ্য হবে দুর্বল হলেও কার্যকর এবং বৈরী এক শাসনব্যবস্থাকে আটকে রাখা।

পশ্চিম এশিয়ায় এমন অন্তহীন সংঘাতে জড়ানোর সমালোচনাই তিনি দীর্ঘদিন ধরে করে এসেছেন। তেহরানে কিছু মানুষ খামেনেইর মৃত্যুকে স্বাগত জানিয়ে উল্লাস করেছে এমন ভিডিও ছড়ালেও, ট্রাম্পের রাস্তায় নামার আহ্বানে ব্যাপক সাড়া পড়েছে, এমন প্রমাণ নেই। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইতিমধ্যে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইসরায়েল ও আমেরিকান ঘাঁটি থাকা আরব রাষ্ট্রগুলোর দিকে। তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ঘোষণা করেছে যে পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপথে রফতানিকৃত তেল চলাচল করে। ট্যাঙ্কারগুলো ইতিমধ্যেই বিকল্প পথে ঘুরতে শুরু করেছে।

গত জুনে ট্রাম্প ইজরায়েলের বোমাবর্ষণ অভিযানে শেষ মুহূর্তে যোগ দিয়েছিলেন-বি-২ বোমারু পাঠিয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলি নিষ্ক্রিয় করেন, যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দেন এবং কূটনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু ইজরায়েল আঘাত হানা চালিয়ে গেলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, দুই পক্ষ এতদিন ধরে এত তীব্রভাবে লড়ছে যে তারা “কী করছে তা নিজেরাই জানে না।” এবার আমেরিকা শুরু থেকেই ইজরায়েলের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে নেমেছে, ধর্মতান্ত্রিক শাসনকে উৎখাত করার প্রত্যয় নিয়ে।

প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন, “পশ্চিম এশিয়া জুড়ে এবং প্রকৃতপক্ষে সমগ্র বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত” বোমাবর্ষণ চলবে। এই জুয়া যদি বার্থ হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির বালিতে প্রাথমিক গৌরবময় জয়লাভ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে। তার সাক্ষী হওয়া প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার প্রথম সাক্ষী হতে চাইবেননা কিছুতেই।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles