বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের সবচেয়ে গোপন অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বৃত্তের কেন্দ্রে বসে আয়াতোল্লা আলি খামেনেই সুতো টানতেন, কখনও মুঠি আলগা করতেন, আবার প্রজাতন্ত্রের ভিত নড়বড়ে হচ্ছে বুঝলেই শৃঙ্খলার ডাক দিতেন বা দিক পরিবর্তনের রূঢ় নির্দেশ জারি করতেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ অভিযানে তিনি নিহত হন, বয়স হয়েছিল ৮৬। তিনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা, রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব এবং তার ধর্মতান্ত্রিক মতাদর্শের রক্ষক। সন্দেহপ্রবণ ও অনমনীয় এই নেতা শেষ পর্যন্ত সেই শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, যার তিনিই ছিলেন প্রধান অভিভাবক।

দেশের রাজনৈতিক গতিপথ তিনিই নির্ধারণ করতেন, প্রয়োজনমতো ক্ষমতার ভারসাম্যে রদবদল করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্রমশ নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক এক শাসনপদ্ধতির দিকে ঝুঁকলেন, যার ভরকেন্দ্র ছিল সশস্ত্র বাহিনী-বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। প্রতিবাদের ঢেউ যত ঘন ও রাজনৈতিক হয়ে উঠল এবং শেষ পর্যন্ত সরাসরি তাঁকেই নিশানা করতে শুরু করল, ততই তাঁর এই পছন্দের বন্দোবস্ত দৃঢ় হল। ফ্রান্সে নির্বাসিত প্রাক্তন ইরানি সাংসদ আহমদ সালামাতিয়ান একবার বলেছিলেন, “খামেনেই তাঁর শাসনকালে পাগড়ির জায়গায় সামরিক হেলমেট পরে নিয়েছিলেন।”
১৯৮৯ সালেই তিনি আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিরোধিতায় ইরানকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্থির করেন। তাঁর কৌশল দাঁড়িয়েছিল দুই স্তম্ভের ওপর: এক, পারমাণবিক সক্ষমতার সীমারেখায় পৌঁছনো, দুই, এক্সিজ অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত সশস্ত্র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার, যার মধ্যে ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া, ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধা এবং হামাস। ২০২৩-এর ৭ অক্টোবর হামাসের বর্বরোচিত হামলার পরে ইজরায়েল এই অক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার সঙ্কল্প নিয়েছিল, খামেইনি তীর গুরুত্ব উপলব্ধি করতেই পারেননি। লেবাননে হিজবুল্লাহ দুর্বল হয়ে পড়ে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হন, ইরাক ও লেবাননে ইরানের প্রভাব ক্ষীণ হতে থাকে। ২০২৫-এর ১৩ জুন, মাসকাটে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক আলোচনা শুরুর ঠিক প্রাক্কালে, ইজরায়েল ইরানের মাটিতে সরাসরি হামলা চালায়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের (১৯৮০-১৯৮৮) পর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় আঘাত।
তবে শুরু থেকেই খামেনেই এমন আপসহীন ছিলেন না। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯, এই সময়ে, যখন তিনি আয়াতোল্লা রুহোল্লাহ খোমেনির ছায়ায় রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তাঁকে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী বলেই মনে করা হত। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও সেই ভাবমূর্তি কিছুটা বজায় ছিল। সে সময় দেশের নতুন শক্তিমান নেতা আকবর হাসেমি রাফসানজানির সঙ্গে তাঁর জোট ছিল। রাফসানজানি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং ২০১৭ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ইরানি রাজনীতিতে প্রভাবশালী ছিলেন।

১৯৩৯ সালের ১৭ জুলাই পবিত্র শহর মাশহাদে তাঁর জন্ম। আয়াতোল্লা জাওয়াদ হুসেইন খামেনির কনিষ্ঠ পুত্র হিসেবে তিনি বড় হন অতি সাধারণ ও গভীরভাবে ধর্মীয় পরিবেশে। মাশহাদ ও পরে কোম শহরে তিনি ধর্মশিক্ষা নেন; সরকারি জীবনী অনুযায়ী, গ্র্যান্ড আয়াতোল্লা বোরুজেরদি, ইমাম খোমেনি, হায়রি ইয়াজদি ও তাবাতাবাইয়ের মতো শিক্ষকদের কাছে পড়াশোনা করেন। পিতার অসুস্থতার কারণে মাশহাদে ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়-স্তরের ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষা চালিয়ে যেতে যেতে তিনি রাজনীতির স্বাদ পান। তাঁর কথায়, এ ক্ষেত্রে প্রথম প্রেরণা ছিলেন সৈয়দ মুজতবা নাভভাব সাফাভি-ফেদাইন-এ-ইসলাম সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা-যিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে তীব্র ভাষণে আক্রমণ করতেন।
১৯৬২ সালে ইমাম খোমেনির বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর খামেনেই সাতবার কারাবরণ করেন। সে সময় তিনি জনসাধারণের কাছে প্রায় অজানা ছিলেন। যেমন ছিলেন আরও অনেক ধর্মগুরু, যারা ইসলামি বিপ্লবের সাফল্যের পর সামনে আসেন।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহের পতন ও খোমেনির ক্ষমতা গ্রহণের পর খামেনেই মেহদি বাজারগানের অস্থায়ী সরকারে যোগ দেন। ইসলামিক রিপাবলিক পার্টির নেতৃত্ত্বও দেন। ১৯৮১ সালের আগস্টে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আলি রাজাই বোমা হামলায় নিহত হলে তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। একই বছরে পিপলস মুজাহেদিন অব ইরান (মুজাহেদিন-এ-খালক) সংগঠনের বোমা হামলা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচেন, কিন্তু ডান হাতে স্থায়ী আঘাত পান। ১৯৮৫ সালে পুনর্নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁকেই উত্তরসূরি মনোনীত করে।

এই রূপান্তর দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন রাফসানজানি, তখনকার মজলিসের স্পিকার। তিনি খোমেনির প্রথম পছন্দের উত্তরসূরি আয়াতোল্লা হোসেইন-আলি মনতাজারিকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন। তখন খামেনেই কেবল হুজ্জতোল-ইসলাম উপাধিধারী ছিলেন, অর্থাৎ ‘ভেলায়াত-এ-ফকিহ’ নীতির অধীনে সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব গ্রহণের যোগ্যতা তাঁর ছিল না। এই নীতি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে গ্র্যান্ড আয়াতোল্লা-একজন ‘মারজা-এ-তাকলিদ’ হতে হয়, যিনি শিয়াদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃত্ব। ১৯৮৯ সালের সাংবিধানিক সংশোধনে সর্বোচ্চ নেতার ভূমিকা প্রধানত রাজনৈতিক হিসেবে পুনর্নির্ধারিত হয়, ফলে তিনি দায়িত্ব নিতে পারেন। তাঁকে আয়াতোল্লা উপাধি দেওয়া হলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহু শিয়া ধর্মগুরু-ইরান ও বিদেশে-তাঁর ‘মারজা’ দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
রাফসানজানির সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বেঁধে খামেনেই ইসলামি বামপন্থীদের কোনঠাসা করতে শুরু করেন। লক্ষা ছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত দেশের পুনর্গঠন। অর্থনৈতিক উদারীকরণের সীমিত প্রয়াসের সঙ্গে সীমিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শিথিলতাও আসে। কিন্তু ১৯৯২ সালে রক্ষণশীলদের আইনসভা নির্বাচনে জয়কে কাজে লাগিয়ে তিনি ‘পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আগ্রাসন’ মোকাবিলার নামে নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রী (পরে রাষ্ট্রপতি) সংস্কারপন্থী মোহাম্মদ খাতামি পদত্যাগ করেন। ১৯৯৮ পর্যন্ত বহু বিরোধী, লেখক ও বুদ্ধিজীবী খুন বা নিখোঁজ হন, তদন্ত ফলহীন থাকে, সর্বোচ্চ নেতা প্রকাশ্যে আপত্তি জানান না। ১৯৯৭ সালে বার্লিনের এক আদালত পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া চার কুর্দি নেতার হত্যাকাণ্ডে “ইরানি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর” কে দোষী সাব্যস্ত করে, যা পরোক্ষে তাঁকেও ইঙ্গিত করেছিল।
রাজনৈতিক হাওয়া বদলাচ্ছে বুঝে ১৯৯৭ সালে খামেনেই কিছুটা ছাড় দেন, যখন খাতামি অপ্রত্যাশিতভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনায় কিছুটা ধাক্কা খেয়ে তিনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সীমা চিহ্নিত করে দেন। দীর্ঘ শাসনকালে যখনই তিনি সামান্যতম বিপদের আঁচ পেয়েছেন, এভাবেই প্রত্যাঘাত করেছেন। এরপর অসংখ্য পত্রিকা বন্ধ হতে শুরু করে, বাড়তে থাকে বিরোধীদের গ্রেফতার করে হাজত বন্দী করা। ১৯৯৯ সালে সংস্কারপন্থী দৈনিক ‘সালাম’ বন্ধের প্রতিবাদে ছাত্র আন্দোলন তাঁর বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করে। ২০০৯ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর তাঁর সমর্থনে লক্ষ লক্ষ বিক্ষুব্ধ মানুষের ঢল রাস্তায় নামে। ঠিক সেই সময় রাফসানজানির সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়; রাফসানজানি বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ান। ২০১৭ সালে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে রাফসানজানির মৃত্যু ছিল খামেইনির কাছে অতি স্বস্তিদায়ক ঘটনা।

তাঁর বিদেশনীতি ছিল একই সঙ্গে বাস্তববাদী ও অনমনীয়। আরব দেশ ও ইউরোপের সঙ্গে তিনি সংলাপের দ্রজা খুলেছিলেন, যদিও তা ওঠানামা করেছে। কিন্তু ইজরায়েল সম্পর্কে তাঁর মনোভাব ছিল প্রচন্ড কঠোর এবং দৃঢ় শত্রুভাবাপন্ন যাদের কোনও সম্পর্ক সম্ভব নয়। ‘মহাশয়তান’ বলে আখ্যা দেওয়া আমেরিকার সঙ্গেও তিনি কাজ করেছেন যখন উভয়ের শত্রু ছিল অভিন্ন। ১৯৯০ সালে কুয়েত মুক্তির যুদ্ধে ইরানের সদর্থক নিরপেক্ষতা, ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালিবান পতনের যুদ্ধ তার উদাহরণ।
২০০০-এর দশক থেকে পারমাণবিক প্রশ্নটি তাঁর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে আসে। শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার দায়ে তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা অনুমোদন করেন, যাতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় এবং আঞ্চলিক মিত্রদের গোপন সমর্থনে অর্থপ্রবাহ বজায় থাকে। ২০১৫ সালে জন কেরির সঙ্গে বৈঠক হয়, তাঁর প্রচ্ছন্ন মদতেই সে বছর আমেরিকার সঙ্গে ইরানের একটি পারমানবিক চুক্তিও সম্পাদিত হয়। তবে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে পাশ্চাত্যের ওপর অতিরিক্ত ভরসা না করতে সতর্ক করেছিলেন। ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা চুক্তি-বাতিল ও কড়া বক্তব্য কট্টরপন্থীদের শক্তি বাড়ায়; নিষেধাজ্ঞার চাপে দমবন্ধ অনুভব করা শাসকগোষ্ঠী দমননীতি জোরদার করে।
২০১৯ সালের নভেম্বরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ঘিরে দেশজুড়ে বিক্ষোভে স্লোগান ওঠে, “অযোগ্য নেতা, পদত্যাগ করো!” প্রথমবার সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়, যাতে দমনপীড়নের খবর বাইরে না যায়। এরপর শাসন আরও কঠোর হয়; প্রতিবেশী দেশ-ইরাক, তুরস্ক-এমনকি নেদারল্যান্ডস ও ব্রিটেনের বিরোধীদের পিছু ধাওয়া করা হয়।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মাহসা আমিনির মৃত্যু-যাকে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে ‘হিজাব ঠিকমতো না পরার’ অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল-ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক অত্যাশ্চর্য বাঁক আনে। ‘নারী, জীবন ও স্বাধীনতা’ আন্দোলন নারীদের নেতৃত্বে শাসনের কর্তৃত্বকে প্রথম চ্যালেঞ্জ করে বসে। কঠোর দমন ও গণগ্রেফতার সত্ত্বেও আন্দোলন সমকালীন ইরানের ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ ফেলে। চাপের মুখে খামেনেইকে রাস্তায় অনাবৃত নারীদের উপস্থিতি মেনে নিতে হয়, যাকে তিনি পাশ্চাত্যের ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’-এর ফল বলে দাবি করেন।
২০২৫ সালে ইরান-ইজরায়েল উত্তেজনা খোলা যুদ্ধের রূপ নেয়-যা কিনা ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর প্রথমবার ইরানের নিজস্ব মাটিতে বড় আকারের সামরিক সংঘর্ষ ডেকে আনে। বহু বছর ধরে আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে পরোক্ষ সংঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আদানপ্রদানের পর অবশেষে তা সরাসরি যুদ্ধে গড়ায়। এই বিস্ফোরক বাস্তবতার মধ্যেই শেষ অধ্যায় রচিত হয় আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর দীর্ঘ, বিতর্কিত এবং কঠোর শাসনের।