বাংলাস্ফিয়ার: লাতিন আমেরিকার মাদক-অর্থনীতির তিনটি ভিন্ন অধ্যায়কে প্রতিনিধিত্ব করেন Pablo Escobar, Joaquín Guzmán (“এল চাপো”) এবং Nemesio Oseguera Cervantes (“এল মেনচো”)। তিনজনই নিজ নিজ সময়ে রাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত হুমকি হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু তাদের ক্ষমতা-গঠন, সহিংসতার ধরন, সাংগঠনিক স্থাপত্য ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট।
প্রথমত, সংগঠন কাঠামোর প্রশ্নে এসকোবার ছিলেন এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাম্রাজ্যের নির্মাতা। তার Medellín Cartel মূলত তার ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ও বিপুল অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। নেতৃত্বের কেন্দ্র ছিল একক, সিদ্ধান্ত ছিল সরাসরি। বিপরীতে এল চাপোর Sinaloa Cartel ছিল জোট-ভিত্তিক, বহু শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্ক—যেখানে বিভিন্ন আঞ্চলিক কমান্ডার, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী মিলে একটি ঢিলেঢালা কিন্তু টেকসই কাঠামো গড়ে তোলে। এল মেনচোর Jalisco New Generation Cartel (CJNG) এই দুই মডেলের মাঝামাঝি—এটি শক্ত কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বের অধীনে দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও আধাসামরিক ইউনিট ও আঞ্চলিক কমান্ড কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে একজন নেতার পতন সংগঠনকে দুর্বল করলেও তা সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে না।
দ্বিতীয়ত, সহিংসতার রণকৌশলে পার্থক্য স্পষ্ট। এসকোবার প্রকাশ্য সন্ত্রাসকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানিয়েছিলেন—বিচারপতি, প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হত্যা, বোমা হামলা, এমনকি বিমান বিস্ফোরণ। তার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রকে ভয় দেখিয়ে নীতিগত ছাড় আদায়। এল চাপো তুলনামূলকভাবে নীরব ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিনির্ভর কৌশল অনুসরণ করেন; তিনি ব্যাপক সহিংসতায় জড়িত থাকলেও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সন্ত্রাসে যাননি। এল মেনচো এখানে আলাদা। CJNG সামরিক শৈলীর শক্তিপ্রদর্শনে বিশ্বাসী: রকেট লঞ্চার দিয়ে হেলিকপ্টার ভূপাতিত করা, ড্রোন থেকে বিস্ফোরক নিক্ষেপ, মাইন পেতে রাখা—এগুলো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ এসকোবারের মতো রাজনৈতিক সন্ত্রাস নয়, বরং কৌশলগত সামরিকীকরণ তার বৈশিষ্ট্য।
তৃতীয়ত, মাদক-বাজারের প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। এসকোবারের যুগ ছিল কোকেন-নির্ভর; কলম্বিয়া ছিল উৎপাদনের কেন্দ্র। এল চাপোর সময়ে মেক্সিকো হয়ে ওঠে ট্রানজিট ও বহুমুখী উৎপাদনের কেন্দ্র, কোকেনের পাশাপাশি মেথঅ্যামফেটামিন ও হেরোইন। এল মেনচোর সময় সিন্থেটিক ড্রাগ, বিশেষত ফেন্টানিল বৈশ্বিক বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে, এবং CJNG সেই সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রধান খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি, রসায়ন ও লজিস্টিক, এই ত্রিমাত্রিক সক্ষমতা তার সংগঠনকে আলাদা মাত্রা দেয়।
চতুর্থত, জন-ইমেজের দিক থেকে এসকোবার এক ধরনের “রবিন হুড” বয়ান নির্মাণ করেছিলেন; স্থানীয় দরিদ্রদের জন্য অবকাঠামো গড়ে তুলে তিনি সামাজিক সমর্থন আদায় করেন। এল চাপো মিডিয়া-সচেতন ছিলেন; কারাগার ভাঙা ও আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকার তাকে কিংবদন্তিতে পরিণত করে। এল মেনচো বরং ছায়ামূর্তি, তার ব্যক্তিগত প্রচার সীমিত, সংগঠনের সহিংসতাই তার পরিচয়ের প্রধান বাহক।
পঞ্চমত, রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও পার্থক্য আছে। এসকোবার সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে জড়ান। এল চাপো রাজনৈতিক পদে না গেলেও প্রশাসনিক দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বজায় এল মেনচোর কৌশল তুলনামূলকভাবে আঞ্চলিক। জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামো দখলের চেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে ভূখণ্ড ও লজিস্টিক নিয়ন্ত্রণে জোর দেন।
মিলের জায়গা অবশ্য রয়েছে। তিনজনই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে লক্ষ্য করে বিপুল সম্পদ সঞ্চয় করেছেন; তিনজনই আন্তঃসীমান্ত পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন; এবং তিনজনের বিরুদ্ধেই মার্কিন ফেডারেল আদালতে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই প্রমাণ করেছেন যে মাদক-অর্থনীতি কেবল অপরাধ নয়, এটি ভূ-রাজনীতি, দুর্নীতি ও বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি সমান্তরাল অর্থব্যবস্থা।
সারাংশে, এসকোবার ছিলেন এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক, প্রকাশ্য সন্ত্রাস-নির্ভর সাম্রাজ্যের নির্মাতা; এল চাপো ছিলেন নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক, দুর্নীতিনির্ভর দীর্ঘস্থায়ী শক্তির মুখ; আর এল মেনচো সামরিকীকৃত, প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমুখী মাদক-অর্থনীতির আধুনিক রূপের প্রতিনিধি। তিনটি নাম, তিনটি যুগ, একই ছায়াবৃত ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।