Table of Contents
পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলের উদ্যোগের ইতিহাস: রাজনীতি, পরিচয় ও প্রতীকের দীর্ঘ পথচলা
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের প্রশ্নটি নতুন নয়। এটি অন্তত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে ফিরে এসেছে— কখনও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের দাবিতে, কখনও প্রশাসনিক যুক্তিতে, আবার কখনও সর্বদলীয় ঐকমত্যের পরীক্ষায়। এই ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ফিরে যেতে হবে।
১. ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার: “West Bengal” নামের জন্ম
“West Bengal” নামটির উৎস ব্রিটিশ আমলে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তে প্রশাসনিকভাবে বাংলা দু’ভাগে বিভক্ত হয়— পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ। যদিও ১৯১১ সালে সেই বিভাজন রদ হয়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে আবার এক স্থায়ী বিভাজন ঘটে। পূর্ববঙ্গ হয় পূর্ব পাকিস্তান (পরবর্তীতে বাংলাদেশ), আর পশ্চিম অংশ ভারতীয় ইউনিয়নের একটি রাজ্য হিসেবে থেকে যায়— “West Bengal”।
এই “West” উপসর্গটি ছিল বিভক্ত ভূখণ্ডের একটি দিক-নির্দেশক চিহ্ন যা স্বাধীনতার পরও থেকে যায়।
২. ১৯৯৯: জ্যোতি বসুর আমলে প্রথম বড় উদ্যোগ
১৯৯৯ সালে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে প্রথম সংগঠিতভাবে রাজ্যের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব ওঠে।
তখন বামফ্রন্ট সরকার “পশ্চিমবঙ্গ” নামটি প্রস্তাব করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল, ইংরেজি ঔপনিবেশিক শব্দবন্ধ বাদ দিয়ে রাজ্যের নিজস্ব ভাষায় নামকরণ করা উচিত। তবে কংগ্রেস চেয়েছিল “বাংলা” নামটি।
বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে গিয়েছিল, যেখানে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী L. K. Advani বিশেষ আগ্রহ দেখাননি। শোনা যায়, “বাংলা” নামটি বাংলাদেশের সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, এই যুক্তিও তোলা হয়েছিল। ফলে প্রস্তাবটি আর এগোয়নি।
৩. ২০১১-পরবর্তী সময়: নতুন সরকার, পুরনো প্রশ্ন
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পর নাম পরিবর্তনের প্রশ্নটি আবার সামনে আসে।
এই সময় যুক্তিগুলি কিছুটা বদলে যায়।
- একটি যুক্তি ছিল— “West Bengal” নামটি বর্ণানুক্রমিক তালিকায় অনেক নিচে পড়ে (W অক্ষরে), ফলে কেন্দ্রীয় বৈঠক বা সম্মেলনে রাজ্যের প্রতিনিধিদের বক্তব্য রাখার সুযোগ অনেক সময় পিছিয়ে যায়।
- আরেকটি যুক্তি ছিল— ঔপনিবেশিক ইংরেজি নাম বাদ দিয়ে একটি ভারতীয় ভাষার নাম গ্রহণ করা উচিত।
৪. ২০১৬: সর্বদলীয় বৈঠক ও “পশ্চিমবঙ্গ” প্রস্তাব
২০১৬ সালের ১৯ আগস্ট সর্বদলীয় বৈঠকে নাম পরিবর্তনের প্রশ্নে ঐকমত্য গড়ে ওঠে। একটি দু’সদস্যের কমিটি, তৃণমূলের পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং সিপিআই(এম)-এর সূর্যকান্ত মিশ্র, আলোচনার ভিত্তিতে “পশ্চিমবঙ্গ” নামটি সুপারিশ করেন।
বামফ্রন্টের প্রথম পছন্দ ছিল “বাংলা”। মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে “বঙ্গভূমি” পছন্দ করলেও শেষ পর্যন্ত “পশ্চিমবঙ্গ” নামটিই সর্বসম্মত প্রস্তাব হিসেবে গৃহীত হয়।
এই সিদ্ধান্তের মূল বক্তব্য ছিল- ইংরেজি সংস্করণ “West Bengal” বাদ দেওয়া হবে, আর বাংলা সংস্করণ “পশ্চিমবঙ্গ”ই সরকারি নাম হবে।
৫. জনমত ও বুদ্ধিজীবী প্রতিক্রিয়া
নাম পরিবর্তনের ঘোষণার পর রাজ্যের বিভিন্ন স্তরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
অনেকেই বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ” তো বহুদিন ধরেই বাংলায় ব্যবহৃত নাম; তাহলে আসল পরিবর্তন কোথায়?
ইতিহাসবিদরা যুক্তি দেন, যদি বিভক্ত পরিচয় মুছতেই হয়, তবে “পশ্চিম” শব্দটিও বাদ দেওয়া উচিৎ। “বঙ্গ” বা “বাংলা” নামটি ঐতিহাসিকভাবে অধিকতর প্রাসঙ্গিক।
অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, নাম পরিবর্তনের চেয়ে প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক সংস্কার অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ২০১৮: নতুন প্রস্তাব— “Bangla”
২০১৮ সালে বিধানসভায় আবার একটি প্রস্তাব পাস হয়, এবার রাজ্যের নাম সব ভাষায় “Bangla” করা হবে।
এই প্রস্তাবও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন তা অনুমোদন পায়নি। ফলে কার্যত রাজ্যের নাম সরকারি নথিতে “West Bengal” হিসেবেই থেকে যায়।
শেষ কথা
পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলের ইতিহাস আসলে তিনটি স্তরের গল্প—
- ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ঝেড়ে ফেলার আকাঙ্ক্ষা
- ভাষা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন
- রাজনৈতিক ঐকমত্য ও প্রশাসনিক বাস্তবতার টানাপোড়েন
প্রশ্নটি কেবল একটি শব্দের পরিবর্তন নয়। এটি বিভক্ত ইতিহাসের স্মৃতি, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক প্রতীকের লড়াই।