বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের বিতর্কটি আসলে কেবল একটি প্রশাসনিক সংশোধনের প্রশ্ন নয়; এটি ইতিহাস, দেশভাগ, ভাষাগত পরিচয় এবং কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্কের এক জটিল সংযোগস্থল। বিষয়টির ধারাবাহিকতা বুঝতে গেলে তিনটি আলাদা পর্যায় স্পষ্ট করতে হয়—বাম আমল, তৃণমূলের প্রথম প্রস্তাব, এবং চূড়ান্ত “বাংলা” প্রস্তাব।
বামফ্রন্ট সরকারের সময়েই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব ওঠে। ১৯৯৯ সালে জ্যোতি বসু-র নেতৃত্বাধীন সরকার “West Bengal” নামটির পরিবর্তে “বাংলা” করার প্রস্তাব বিধানসভায় পাশ করায়। যুক্তি ছিল, “West” শব্দটি দেশভাগ-উত্তর একটি অস্থায়ী রাজনৈতিক বাস্তবতার চিহ্ন; স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরে সেটি বহাল রাখা ঐতিহাসিকভাবে অস্বস্তিকর। তবে সে সময় কেন্দ্রীয় স্তরে বিষয়টি অগ্রসর হয়নি।
২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে একটি আপেক্ষিকভাবে মৃদু পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন—“West Bengal”–এর পরিবর্তে “Paschim Banga” ধরনের রূপ। এটি মূলত ইংরেজি নামের ঔপনিবেশিক কাঠামো ভেঙে ভারতীয় উচ্চারণের দিকে ঝোঁকার চেষ্টা ছিল। কেন্দ্র এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি; যুক্তি ছিল, পরিবর্তনটি আংশিক এবং পরিষ্কার নয়।
এরপর ২০১৬ সালে রাজ্য সরকার আরও স্পষ্ট প্রস্তাব আনে। বিধানসভায় সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হয়—ইংরেজিতে “Bengal”, বাংলায় “বাংলা”, হিন্দিতে “बंगाल”। অর্থাৎ তিন ভাষায় তিন রূপ। এখানেই প্রথম কেন্দ্র আপত্তি তোলে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য ছিল—একই রাজ্যের তিন ভাষায় তিন আলাদা নাম গ্রহণযোগ্য নয়; সংবিধান ও প্রশাসনিক রীতিতে একটি অভিন্ন নাম থাকা প্রয়োজন। এই আপত্তির পর রাজ্য সরকার অবস্থান সংশোধন করে। ২০১৮ সালে আবার সর্বসম্মত প্রস্তাব পাশ হয়: সব ভাষায় রাজ্যের নাম হবে “বাংলা” (Bangla)। অর্থাৎ এক নাম, এক রূপ।
এই পর্যায়ে কেন্দ্রের আপত্তির প্রকৃতি বদলে যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশ মন্ত্রকের দপ্তর থেকে যে যুক্তি সামনে আসে, তার মূল সুর ছিল কূটনৈতিক। পাশের সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ-এর নামের সঙ্গে “বাংলা” শব্দটির ধ্বনিগত ও ভাষাগত সাদৃশ্য আন্তর্জাতিক স্তরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। কূটনৈতিক যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক চুক্তি, বৈদেশিক নথিপত্র বা বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে “Bangla” শব্দটি রাষ্ট্র-পরিচয় ও ভাষা-পরিচয়ের মধ্যে দ্ব্যর্থতা তৈরি করবে, এমন আশঙ্কা জানানো হয়। এই যুক্তিকেই কেন্দ্র কার্যত নাকচ করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে।
আইনগত দিক থেকে কেন্দ্রের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩ অনুযায়ী, কোনও রাজ্যের নাম পরিবর্তনের চূড়ান্ত ক্ষমতা সংসদের। রাজ্য বিধানসভা প্রস্তাব দিতে পারে, কিন্তু সংসদ আইন পাস না করলে পরিবর্তন কার্যকর হয় না। অর্থাৎ কেন্দ্রের সম্মতি ছাড়া নাম পরিবর্তন অসম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাব সংসদে বিল আকারে আনা হয়নি; কার্যত ফাইল পর্যায়েই তা থেমে যায়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—কেন্দ্রের “বাংলাদেশ-সাদৃশ্য” যুক্তি কতটা শক্ত? নজিরের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশেই “Punjab” নামে প্রদেশ/রাজ্য আছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে তা আলাদা করে চিহ্নিত করা হয় “Indian Punjab” ও “Pakistani Punjab” হিসেবে। ফলে একেবারে নজিরবিহীন সমস্যা নয়। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে, “Punjab” দুটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক একক; “Bangla” শব্দটি আবার ভাষা ও জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিদেশি প্রেক্ষাপটে “Bangla” শব্দটি অনেক সময় সরাসরি বাংলাদেশকেই নির্দেশ করে। কেন্দ্র সম্ভবত সেই অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার যুক্তি দাঁড় করিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও অগ্রাহ্য করা যায় না। ২০১৬–১৮ পর্বে পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি দ্রুত সংগঠন বিস্তার করছে, আর রাজ্যে ক্ষমতায় তৃণমূল কংগ্রেস। কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্ক ক্রমেই সংঘাতময়। এই পরিস্থিতিতে নাম পরিবর্তনের মতো উচ্চ-প্রতীকী দাবিকে দ্রুত অনুমোদন দেওয়া কেন্দ্রের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে লাভজনক ছিল না। কারণ “বাংলা” নামটি আঞ্চলিক আত্মপরিচয়ের শক্তিশালী প্রতীক; এটি অনুমোদিত হলে তার রাজনৈতিক কৃতিত্ব স্বভাবতই রাজ্য সরকারের ঝুলিতেই যেত।
সুতরাং গোটা ঘটনাক্রম দাঁড়ায় এভাবে—বাম আমলে “বাংলা” প্রস্তাবের সূচনা, তৃণমূল আমলে প্রথমে আংশিক পরিবর্তনের চেষ্টা, পরে ত্রিভাষিক প্রস্তাব, কেন্দ্রের ‘এক নাম’ আপত্তি, তার পর সর্বভাষায় “বাংলা” প্রস্তাব, এবং শেষে কেন্দ্রের কূটনৈতিক-প্রশাসনিক যুক্তিতে কার্যত নাকচ। আইনগত বাধা ছিল না; ছিল সংসদীয় সম্মতির প্রয়োজন। কেন্দ্র সেই রাজনৈতিক সম্মতি দেয়নি।
অতএব, এটি কেবল নামের প্রশ্ন নয়। এটি দেশভাগ-উত্তর পরিচয়, ভাষাগত আত্মমর্যাদা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং ক্ষমতার রাজনীতির এক সমান্তরাল গল্প। “West Bengal” নামটি ইতিহাসের স্মারক; “বাংলা” নামটি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের দাবি। কোনটি বহাল থাকবে—সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক।