Home বড় খবর পিছন দিকে এগোতে চাইছে গুজরাত

পিছন দিকে এগোতে চাইছে গুজরাত

0 comments 5 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: গুজরাত সরকার প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশনের (নিবন্ধন) প্রক্রিয়ায় “অভিভাবকের সম্মতি/অবগতকরণ”কে কার্যত বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে আইনি পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছে। বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নিয়মের পরিবর্তন নয়; ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনকে নতুন করে সামনে এনেছে।

খসড়ার মূল শর্ত: রেজিস্ট্রেশনের আবেদন জমা দেওয়ার সময় যুগলকে ঘোষণা করতে হবে তারা তাদের বাবা-মাকে বিয়ের বিষয়ে জানিয়েছে কি না। পাশাপাশি আবেদনপত্রে উভয়পক্ষের অভিভাবকদের নাম, ঠিকানা, আধার ও যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। আবেদন যাচাইয়ের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের কাছে বার্তা বা নোটিস পাঠাবে।  খসড়ায় “ঘোষণা + অভিভাবকদের নোটিফিকেশন”—এই দুইটির সংযোগই মূল, কারণ এতে পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার ভেতরে টেনে আনা হচ্ছে, এবং ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশনকে তাৎক্ষণিক নয় বরং অপেক্ষা-কাল ও যাচাই-পর্বসমেত “হাই-স্ক্রুটিনি” প্রক্রিয়া বানানো হচ্ছে।

প্রক্রিয়ার কাঠামোবর্তমান নিয়মে (২০০৬ সালে প্রণীত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ) প্রাপ্তবয়স্ক যুগল নির্দিষ্ট কাগজপত্র ও সাক্ষীর তথ্য দিয়ে স্থানীয় স্তরে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশনের আবেদন করতে পারে এবং পলাতক/এলোপমেন্ট ধাঁচের ক্ষেত্রে অনেক সময় পরিবারকে জানানোই হয় না। নতুন খসড়া অনুযায়ী আবেদনকারী যুগলকে সহকারী রেজিস্ট্রারের সামনে উপস্থিত হয়ে অবগতকরণের বিষয়টি জানাতে হবে। এরপর কর্তৃপক্ষ সাধারণত ১০ কর্মদিবসের মধ্যে উভয় পক্ষের অভিভাবকদের ইলেকট্রনিক বা শারীরিকভাবে নোটিফাই করবে। এই ক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপ/মেসেজিং মাধ্যম ব্যবহারের কথাও প্রকাশ্যে বলা হয়েছে। তারপর আবেদন উপরের স্তরে (জেলা/তালুকা রেজিস্ট্রার) যাবে, এবং যাচাই/আপত্তির সুযোগ রেখে নির্দিষ্ট অপেক্ষা-কাল শেষে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হবে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আবেদন জমা থেকে শংসাপত্র পাওয়া পর্যন্ত মোটামুটি ৪০ দিনের মতো সময় লাগতে পারে।একই সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টালে ছবি, সাক্ষীর বিবরণসহ জমা পড়া তথ্য আপলোড করে “ট্রেসেবল ডিজিটাল অডিট ট্রেইল” তৈরি করার লক্ষ্যও খসড়ার অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।

সরকারি অবস্থানসরকারি যুক্তির ভাষা এবং এই উদ্যোগের রাজনৈতিক সুর, দুটোই বেশ স্পষ্ট। সরকারি অবস্থান স্পষ্ট করে রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভি বলেছেন, সরকার “জেনুইন লাভ ম্যারেজ”-এর বিরোধী নয়; প্রতারণা, জবরদস্তি বা পরিচয় গোপন করে বিয়ের মতো ঘটনাকে রুখতেই প্রক্রিয়া কঠোর করা হচ্ছে।  একই বক্তব্যে “লাভ জিহাদ” কথাটিও এসেছে, এবং “পরিচয় বদলে ফাঁদে ফেলে বিয়ে” ধরনের কেসকে তিনি সামাজিক-সাংস্কৃতিক আক্রমণ হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় এই বদলটা কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়; সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচয়-রাজনীতিরও একটি প্রকল্প।

‘অবগতকরণ’ নাকি ‘সম্মতির শর্ত’:তবে সরকার যে শব্দচয়ন করছে (“অভিভাবককে জানানো”, “ডিক্লেয়ারেশন”, “নোটিফিকেশন”), তার বাস্তব ফলাফল অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে “সম্মতির শর্ত” বলেই ধরা পড়ছে। কারণ ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়ায় অভিভাবকদের আনুষ্ঠানিকভাবে ঢোকানো মানে, পরিবারের আপত্তি/হস্তক্ষেপকে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দেওয়া – এমন প্রশ্নই জোরালো হচ্ছে। খসড়ায় ৩০ দিনের জনমত আহ্বানের কথা আছে; অর্থাৎ এখনই এটি চূড়ান্ত আইন নয়, নাগরিকদের আপত্তি-প্রস্তাব নিয়ে কমিটি দেখে তারপর নোটিফাই করা হবে। কিন্তু খসড়া যে দিশা দেখাচ্ছে, তাতে “প্রাপ্তবয়স্কের পছন্দ”, এই ধারণা সরাসরি চাপের মুখে পড়ছে।

সাংবিধানিক প্রেক্ষাপট: সাংবিধানিক প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নিজের সঙ্গী বেছে নেওয়ার অধিকারকে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মর্যাদার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এবং স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন মানুষ বিয়ে করতে চাইলে “পরিবার/সম্প্রদায়/গোষ্ঠী” কারও সম্মতি বাধ্যতামূলক নয়। দ‍্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি  আইনি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে ২০২১ সালের লক্ষ্মীবাই চান্দারাগী মামলার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিবারের সম্মতির প্রয়োজন নেই এবং ব্যক্তির “চয়েস” মর্যাদার অবিচ্ছেদ্য অংশ। একই প্রতিবেদনে শাফিন জাহান (হাদিয়া মামলা) ও লতা সিং এই দুটি মামলার রায়ের প্রসঙ্গ প্রসঙ্গ এনে দেখানো হয়েছে, আদালত বারবার পরিবারকে “অভিভাবক রাষ্ট্র” বানানোর প্রবণতা থেকে সরে এসে ব্যক্তিস্বাধীনতাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।  এমনকি কিছু উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে বিশেষ বিবাহ আইন (Special Marriage Act)–এর নোটিস/পাবলিকেশন পর্বকে “প্রাইভেসি ইনভেশন” হিসেবে দেখার প্রবণতাও আলোচনায় এসেছে যার সঙ্গে গুজরাতের প্রস্তাবিত ‘পরিবারকে জানানো’ নীতি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী।

সোলেমনাইজেশন বনাম নিবন্ধন: রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও Special Marriage Act প্রসঙ্গ

এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, বিয়ে “সোলেমনাইজ” করা (অর্থাৎ বিয়ে সম্পন্ন হওয়া) বনাম বিয়ে “রেজিস্টার” করা (অর্থাৎ সরকারি নথিভুক্তি)। প্রস্তাবিত পরিবর্তন সরাসরি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াকে কঠোর করে, যা বাস্তবে বিয়ের আইনি স্বীকৃতি পাওয়াকে কঠিন করে তুলতে পারে। যেহেতু রেজিস্ট্রেশন অনেক নাগরিক সুবিধা ও আইনি নিশ্চয়তার দরজা খুলে দেয়, তাই রেজিস্ট্রেশনের শর্ত কঠোর হওয়া মানে বিয়ের ওপর কড়া সরকারি  নিয়ন্ত্রণ তৈরি হওয়া। উপরন্তু আন্তঃধর্ম বা সিভিল ম্যারেজের ক্ষেত্রে এদেশে স্পেশাল ম‍্যারেজ অ‍্যাক্ট আছে যার কাঠামো সম্পূর্ণ আলাদা। এই আইনে ৩০  দিনের নোটিশ বাধ‍্যতামূলক কিন্তু “অভিভাবকের সম্মতি” নয়,  ফলে গুজরাতের এই খসড়া যদি “সব রেজিস্ট্রেশন”-এ অভিভাবকের সম্মতিকে  সাধারণ নীতি বানায়, তাহলে বিশেষ বিবাহ আইনকে ঘিরে চলা প্রাইভেসি-তর্ককে আরও তীব্র করতে পারে।

সামাজিক ও বাস্তব প্রভাব: সবশেষে, এই প্রস্তাবের সামাজিক অভিঘাতও কম নয়। একদিকে সরকার বলছে এর ফলে  “ফ্রড” ও “কোয়ার্সন” কমবে, অভিভাবকদের ‘সেন্টিমেন্ট’ বাঁচবে, তরুণীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, এবংম্যারেজ রেজিস্ট্রেশনে স্বচ্ছতা আসবে। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন এটা প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের  স্বাধীনতা  খর্ব করবে, পরিবার-সমাজের চাপকে প্রাতিষ্ঠানিক করবে,  বিশেষত আন্তঃধর্ম/আন্তঃজাত বিয়ের ক্ষেত্রে “পুলিশিং” বা নজরদারির হাতিয়ার হয়ে উঠবে। বাস্তবতা সম্ভবত এটাই যে কাগজে কলমে একে সামান‍্য  “অবগতকরণ” বলা হলেও, রাষ্ট্র যখন নিবন্ধনকে দীর্ঘসূত্রিতা(procrastination), নোটিশ এবং সম্ভাব্য আপত্তির মঞ্চ বানায়, তখন তার অর্থ দাঁড়ায় সরকারের হাতে ‘না’ বলার ক্ষমতা তুলে দেওয়া, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে সেই যুগলদের ওপর যারা পরিবার-সমাজের বিরোধিতাকে পাশ কাটিয়ে জীবন গড়তে চায়। এই কারণেই বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে বাধ‍্য।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles