বাংলাস্ফিয়ার: ভোটের মুখে কেরালার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবে কেন্দ্রীয় সম্মতি—এটিকে নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি অনেক বেশি সূক্ষ্ম। কারণ এখানে প্রশ্ন কেবল একটি রাজ্যের নামের বানান সংশোধনের নয়; প্রশ্ন হল, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের রাজনৈতিক প্রতীক, আঞ্চলিক আত্মপরিচয়ের মর্যাদা এবং নির্বাচনী বয়ানের উপকরণ।
কেরালার ক্ষেত্রে বহুদিন ধরেই দাবি উঠেছিল যে ইংরেজি নাম “Kerala”-র বদলে মালয়ালম উচ্চারণঘনিষ্ঠ “Keralam” ব্যবহার করা হোক। Pinarayi Vijayan-এর নেতৃত্বে Kerala Legislative Assembly সর্বসম্মত প্রস্তাব পাশ করে, এবং কেন্দ্র আপত্তি না জানিয়ে সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে এগোতে দেয়। ভারতীয় সংবিধানের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজ্যের নাম পরিবর্তন সংসদের আইনসাপেক্ষ; অতীতে Orissa থেকে Odisha, Uttaranchal থেকে Uttarakhand কিংবা Pondicherry থেকে Puducherry—এইসব পরিবর্তনের নজির রয়েছে। অর্থাৎ নীতিগতভাবে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তবু বাংলার রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। কারণ ২০১৮ সালে West Bengal Legislative Assembly রাজ্যের নাম “West Bengal” থেকে “Bangla” করার প্রস্তাব পাশ করেছিল। সেই প্রস্তাব দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় স্তরে ঝুলে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে কেরালার দাবিতে দ্রুত অগ্রগতি হলে তুলনা টানা অবশ্যম্ভাবী। আর সেই তুলনাই রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
মমতা বন্দোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে একটি বয়ান নির্মাণ করেছেন—বিজেপি বাংলার সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করে না, “বহিরাগত” রাজনীতি চাপিয়ে দিতে চায়, এবং বাংলা ভাষা ও পরিচয়ের প্রতি সংবেদনশীল নয়। এই বয়ানের ভিতেই তিনি বিজেপিকে “বাংলা-বিরোধী” হিসেবে চিত্রিত করতে চেয়েছেন। কেরালার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সম্মতি যদি দেখানো যায় আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি হিসেবে, তাহলে মমতার পক্ষে বলা সহজ হবে যে বাংলার ক্ষেত্রে একই মনোভাব দেখা যায়নি। অর্থাৎ “কেরালার মর্যাদা স্বীকৃত, বাংলার দাবি উপেক্ষিত”—এই ফ্রেমিং রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে।
তবে বাস্তবতার স্তরে পার্থক্যও আছে। কেরালার ক্ষেত্রে প্রস্তাবটি মূলত ইংরেজি বানানের সামান্য রূপান্তর; রাজ্যের মৌলিক পরিচয় বা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ব্যবহারে বড় পরিবর্তন আনতে হয় না। অন্যদিকে “West Bengal” থেকে “Bangla” করা মানে সম্পূর্ণ নামপরিচয়ের বদল, যা প্রশাসনিক নথি, কেন্দ্রীয় আইন, আন্তর্জাতিক মানচিত্র ও প্রোটোকলে বিস্তৃত প্রভাব ফেলে। কেন্দ্র অতীতে যুক্তি দিয়েছিল যে বহুভাষিক ব্যবহার ও আইনি স্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই যুক্তি কেন্দ্রকে একটি প্রক্রিয়াগত ঢাল দেয়, যদিও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সেই ঢালকে ভেদ করতে পারে।
নির্বাচনী প্রভাবের প্রশ্নে বিষয়টি আরও জটিল। বাংলার ভোটার আচরণ ঐতিহাসিকভাবে পরিচয়-সচেতন হলেও ভোটের নির্ণায়ক ইস্যু সাধারণত কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, আর্থিক বরাদ্দ, স্থানীয় উন্নয়ন এবং সাংগঠনিক শক্তির লড়াই। নাম পরিবর্তন একটি প্রতীকী প্রশ্ন; এটি আবেগ উস্কে দিতে পারে, কিন্তু এককভাবে ভোটের স্রোত ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি সচরাচর রাখে না। তবে যদি এটি বৃহত্তর “বাংলা বনাম দিল্লি” আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থাৎ কেন্দ্র বাংলাকে অবহেলা করছে, আর তৃণমূল বাংলা পরিচয়ের রক্ষক, তাহলে এর প্রতীকী মূল্য বহুগুণ বাড়তে পারে।
বিজেপির দিক থেকে ঝুঁকি মূলত প্রতীকের রাজনীতিতে। বাংলায় ইতিমধ্যেই “বাইরের নেতা” ইস্যুতে তর্ক চলছে। যদি এই নাম-বিতর্ক সেই আখ্যানের সঙ্গে জুড়ে যায়, তাহলে বিজেপির বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যখন প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ এটিকে বৈষম্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরবে। অন্যদিকে বিজেপি যুক্তি দিতে পারে যে কেরালার প্রস্তাব ছিল ভাষাগত সামঞ্জস্যের প্রশ্ন, আর বাংলার প্রস্তাব ছিল প্রশাসনিক পুনর্গঠনের বিষয়—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির।
অতএব, কেন্দ্র কেরালার নাম পরিবর্তনে সম্মতি দিয়ে সরাসরি মমতার হাতে এক নতুন ও মারাত্মক অস্ত্র তুলে দিয়েছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়ো হবে। কিন্তু রাজনীতিতে প্রতীক কখনও কখনও নীতির চেয়ে শক্তিশালী। যদি মমতা এই ঘটনাকে বঞ্চনার বয়ানে রূপ দিতে পারেন, তবে এটি নির্বাচনী প্রচারে কার্যকর উপাদান হতে পারে। আর যদি ভোটাররা এটিকে প্রশাসনিক নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখেন, তবে বিষয়টি দ্রুতই অন্য ইস্যুর আড়ালে মিলিয়ে যাবে। বাংলার ভোটের ময়দানে শেষ কথা বলবে কে এই প্রতীককে কত দক্ষতায় অর্থবহ করে তুলতে পারে।