বাংলাস্ফিয়ার: কেরলের নাম বদলে গেছে—এমন খবর শুনলে মনে হতে পারে, হঠাৎ কোনও রাজনৈতিক আবেগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটি আকস্মিক নয়। এটি দীর্ঘদিনের ভাষাগত আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং উপনিবেশ-উত্তর মানসিকতার এক স্বাভাবিক পরিণতি।
দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যের সরকারি ইংরেজি নাম এতদিন ছিল “Kerala”, অথচ মালয়ালম ভাষায় তার নাম “Keralam” (കേരളം)। স্থানীয় উচ্চারণে শব্দটির শেষে একটি মৃদু ‘ম’ ধ্বনি রয়েছে। মালয়ালম সাহিত্য, সংবাদপত্র, প্রশাসনিক নথি—সবখানেই রাজ্যের নাম “কেরলম”। ইংরেজি বানান “Kerala” মূলত উপনিবেশিক যুগের রূপ, যা ইউরোপীয় মানচিত্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পায়। স্বাধীনতার পর ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠনের সময়ও ইংরেজি নামটি অপরিবর্তিত থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালে কেরল বিধানসভা সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে, যাতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়—রাজ্যের ইংরেজি নামও “Keralam” করা হোক। যুক্তিটি সরল এবং সুস্পষ্ট: যখন “Orissa” হয়ে গেছে “Odisha”, “Uttaranchal” হয়েছে “Uttarakhand”, “Bombay” হয়েছে “Mumbai”, “Madras” হয়েছে “Chennai”—তখন কেরলের ক্ষেত্রেও স্থানীয় ভাষার স্বীকৃত নামটি সরকারি ইংরেজি রূপে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
এই দাবির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তিনটি স্তরে বোঝা যায়।
প্রথমত, ভাষাগত মর্যাদা। কেরল এমন একটি রাজ্য যেখানে সাক্ষরতার হার উচ্চ, এবং ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে সামাজিক সচেতনতা প্রবল। “Kerala” বানানে স্থানীয় উচ্চারণের শেষ ধ্বনিটি লুপ্ত হয়; “Keralam” সেই ধ্বনিগত পূর্ণতাকে ফিরিয়ে আনে। এটি কেবল বানান সংশোধন নয়, ভাষার স্বরকে অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়াস।
দ্বিতীয়ত, উপনিবেশ-উত্তর আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। ভারতীয় উপমহাদেশের বহু শহর ও রাজ্য তাদের ঔপনিবেশিক নাম বদলে স্থানীয় নাম গ্রহণ করেছে। এই পরিবর্তন অনেক সময় আবেগপ্রসূত হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক। কেরলের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। “Kerala” একটি বহিরাগত বানানরীতি; “Keralam” তার নিজস্ব ভাষাগত রূপ।
তৃতীয়ত, সাংবিধানিক সামঞ্জস্য। ভারতের সংবিধানের প্রথম তফসিলে রাজ্যগুলির ইংরেজি নাম নির্দিষ্ট আছে। সেখানে পরিবর্তন আনতে হলে সংসদে সংশোধন প্রয়োজন। অর্থাৎ, বিধানসভা প্রস্তাব দিলেই নাম বদলে যায় না; কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতি ও সংসদের অনুমোদন অপরিহার্য। ফলে এটি এখনও কার্যকর পরিবর্তন নয়, বরং প্রস্তাবিত সংশোধন।
রাজনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি লক্ষণীয়। কেরলে বামপন্থী সরকার দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যীয় স্বাতন্ত্র্য ও ফেডারেল অধিকারের প্রশ্নে সক্রিয়। তবে এই নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দলীয় বিভাজন সৃষ্টি করেনি; বরং তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে। কারণ এটি কোনও বিভাজনমূলক পরিচয়ের প্রশ্ন নয়, বরং ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতির দাবি।
সুতরাং “অকস্মাৎ” নাম বদল হয়নি। এটি ধীরে জমে ওঠা এক নীরব আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। একটি অক্ষর,শেষের সেই ‘ম’, ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে কেরল তার নিজস্ব উচ্চারণকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে পারল।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা প্রস্তাব অনুমোদন করার ফলে নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখন আনুষ্ঠানিকতার চূড়ান্ত ধাপে। সংবিধানের প্রথম তফসিলে সংশোধনের জন্য সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই “Kerala” আনুষ্ঠানিকভাবে “Keralam” হবে। অর্থাৎ এটি আর কেবল সাংস্কৃতিক দাবি নয়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পথে অগ্রসর এক সিদ্ধান্ত।
এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কেরালা তার নিজস্ব ভাষাগত রূপকে ইংরেজি সরকারি ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা করার দিকে এগোল। বহু বছর ধরে প্রচলিত একটি উপনিবেশিক বানানের স্থলে স্থানীয় উচ্চারণভিত্তিক রূপের স্বীকৃতি—এটি কেবল প্রতীকী সংশোধন নয়, ভাষাগত আত্মপরিচয়ের আনুষ্ঠানিক পুনর্দাবি।
এখন আর প্রশ্নটি “হবে কি হবে না” নয়; বরং প্রশ্ন—কবে থেকে এবং কীভাবে নতুন নামটি সরকারি নথি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কার্যকর হবে।