6
বাংলাস্ফিয়ার: আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া বা ইন্টারনেটে যখনই নতুন কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকির খবর আসে, সেটা শুধু তথ্য দেয় না বরং মনের মধ্যে একটা অদৃশ্য ভয়ও ঢুকিয়ে দেয়। ক্যানসারের বাড়তি হার, কোনো সেলিব্রিটির হঠাৎ মৃত্যু, বা খাবার নিয়ে সতর্কবার্তা, এসব পড়ে কেউ কেউ সচেতন হয়ে টেস্ট করায়। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে উল্টোটা হয়। শরীরের একেবারে সাধারণ লক্ষণও তখন বড় কোনো বিপদের ইঙ্গিত বলে মনে হতে শুরু করে। গবেষকরা এই প্রবণতাকে বলেন সাইবারকন্ড্রিয়া, মানে ইন্টারনেটে বারবার রোগের লক্ষণ খুঁজতে খুঁজতে আরও বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়া। এটা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। আসলে এটা মানুষের মন আর এমন একটা তথ্যের জগতের সংঘর্ষ, যেটা মানুষের মানসিক শান্তির জন্য নয়, বরং মনোযোগ ধরে রাখার জন্য তৈরি। এমনকি যারা জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন, তারাও এই ভয় থেকে পুরোপুরি মুক্ত নন। আপনি জানেন ঝুঁকিটা পরিসংখ্যান অনুযায়ী কম তবুও মনের ভয় থামানো কঠিন। এখানেই একটা বড় দ্বিধা তৈরি হয়। স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সঠিক তথ্য দেওয়া খুবই জরুরি। না বললে মানুষ ভুল তথ্যের শিকার হবে। কিন্তু একই সঙ্গে, এই সত্য তথ্যই আবার অনেক সময় অকারণ ভয় বাড়িয়ে দেয়, বিশেষ করে যখন কোনো বিষয়ে শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। আসলে সত্যিটা খুব সাধারণ। স্বাস্থ্য ভালো রাখার মূল উপায়গুলো জটিল নয়, সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, ঠিকমতো ঘুমানো, ধূমপান এড়ানো, আর সময়মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো। এগুলো ঝুঁকি কমায়, কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চয়তা দেয় না। আর এই অনিশ্চয়তার সুযোগটাই কাজে লাগায় ওয়েলনেস ইন্ডাস্ট্রি। তারা নানা সাপ্লিমেন্ট, ডিটক্স, আর দামী টেস্টকে “নিশ্চিত সমাধান” হিসেবে বিক্রি করে, যার বেশিরভাগের পেছনেই শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিশ্বজুড়ে ওয়েলনেস ইন্ডাস্ট্রি দ্রুত বাড়ছে। এর প্রধান চালিকাশক্তি নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়, বরং মানুষের ভয় আর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার ইচ্ছে। বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা ঝুঁকি কমাতে পারে, কিন্তু শতভাগ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে না। অন্যদিকে, ওয়েলনেস মার্কেটিং প্রায়ই সেই মিথ্যা নিশ্চয়তাটাই বিক্রি করে। এখানে সচেতনতা আর অতিরিক্ত আতঙ্কের মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। সচেতনতা মানুষকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে, যেমন সময়মতো ডাক্তারের কাছে যাওয়া বা প্রয়োজনীয় টেস্ট করানো। কিন্তু অতিরিক্ত আতঙ্ক মানুষকে বারবার শরীর নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে, ছোট বিষয়কে বড় বিপদ মনে করায়, আর মানসিক চাপ বাড়ায়। স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার আসল উদ্দেশ্য অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর করা নয়, কারণ সেটা সম্ভব নয়। বরং মানুষের সঙ্গে এমন একটা ভারসাম্য তৈরি করা, যাতে তারা বাস্তবসম্মতভাবে নিজের শরীরের যত্ন নিতে পারে। নিয়মিত ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা, ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া, আর এটুকু মেনে নেওয়া যে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত জীবন বলে কিছু নেই। সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ একটা ভ্রম। কিন্তু তথ্যভিত্তিক, শান্ত আর ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন, সেটাই আসল নিরাপত্তা দেয়। ভয় নয়, সত্যের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটানো এক ধরনের মানসিক শান্তি।