বাংলাস্ফিয়ার: ছোটবেলায় কেউ আমাকে “স্মার্ট” বললে মনে হত, যেন আমার অস্তিত্বের একটা স্বীকৃতি মিলেছে। একজন বধির আর অটিস্টিক মেয়ে হিসেবে, আমি নিজের মূল্য সবসময় পড়াশোনার ফলাফল দিয়ে মাপতাম। ভালো নম্বরই ছিল আমার ঢাল, যা দিয়ে সহপাঠীদের সন্দেহ আর তাচ্ছিল্যের বিরুদ্ধে নিজেকে প্রমাণ করতাম। স্কুল ছিল একসাথে আশ্রয়ও, আবার যুদ্ধক্ষেত্রও, যেখানে সাফল্য মানেই ছিল আমি “কম কিছু” নই। হাই স্কুলে আমি অ্যাডভান্সড ক্লাসে ভর্তি হই, ভেবেছিলাম আমিও সেই তথাকথিত মেধাবী দলে পড়ি। কিন্তু যখন পড়ায় একটু হোঁচট খেলাম, শিক্ষক আর সহপাঠীরা খুব তাড়াতাড়ি আমার ওপর বিশ্বাস হারাল। তখন বুঝলাম, বুদ্ধিমত্তা শুধু ক্ষমতার ব্যাপার নয়, এটা অন্যদের চোখে তুমি কেমন, সেটার ওপরও নির্ভর করে। আমি কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই গ্র্যাজুয়েট হলাম, কমিউনিটি কলেজে ভর্তি হলাম, আর ভেতরে ভেতরে একটা অনুভূতি রয়ে গেল—আমি যেন বুদ্ধি আর জীবনের দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছি। সময়ের সাথে সাথে আমি ভাবতে শুরু করলাম, আসলে “বুদ্ধিমান” হওয়া মানে কী? বুদ্ধিমত্তার অনেক রকম আছে—অ্যাকাডেমিক জ্ঞান, সামাজিক বোঝাপড়া, রসবোধ, সৃজনশীলতা, আবেগ বোঝার ক্ষমতা। কিন্তু সমাজ সাধারণত শুধু কয়েকটা নির্দিষ্ট ধরণের বুদ্ধিকেই গুরুত্ব দেয়, বিশেষ করে যেগুলো আত্মবিশ্বাসী, সফল, শারীরিকভাবে সক্ষম, প্রভাবশালী মানুষদের সাথে জড়িত। জনপ্রিয় সংস্কৃতিও এই ধারণাটাকেই বারবার শক্ত করে তোলে। এই পক্ষপাতের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বুদ্ধিমত্তার ধারণাকে ব্যবহার করা হয়েছে অসমতা আর বৈষম্যকে ন্যায্য প্রমাণ করতে; দাসপ্রথা থেকে শুরু করে ইউজেনিক্স, এমনকি স্ট্যান্ডার্ডাইজড টেস্ট পর্যন্ত, যেগুলো অনেক সময় সুবিধাপ্রাপ্তদের পক্ষেই কাজ করে। এগুলো শুধু বুদ্ধিমত্তা মাপে না, বরং ঠিক করে দেয় কাকে “বুদ্ধিমান” হিসেবে দেখা হবে আর কাকে নয়। একজন বধির আর অটিস্টিক মানুষ হিসেবে, আমি নিজের জীবনে দেখেছি, মানুষ কত সহজে অক্ষমতাকে অযোগ্যতা ভেবে বসে। ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি বা যোগাযোগের পার্থক্যকেই তারা বুদ্ধির অভাব হিসেবে ধরে নেয়। এই বিচারগুলো খুব দ্রুত হয়ে যায়, আর এগুলো তোমার সুযোগ, সম্পর্ক, এমনকি নিজের সম্পর্কে ধারণাকেও প্রভাবিত করে। সবচেয়ে ক্লান্তিকর ব্যাপারটা হল, সবসময় নিজেকে প্রমাণ করে যাওয়ার চাপ, এমন একটা সমাজে যা শুরু থেকেই তোমাকে সন্দেহ করে। কিন্তু হয়তো আসল প্রশ্নটা এটা নয় যে কেউ “যথেষ্ট স্মার্ট” কি না। হয়তো আসল সমস্যা হল, সমাজ বুদ্ধিমত্তাকে খুব সংকীর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করে আর সেটার ওপরই মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে। হয়তো আমাদের শুধু বুদ্ধিমত্তা নয়, আরও অনেক গুণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যেমন সহানুভূতি, সৃজনশীলতা, রসবোধ, আর মানবিকতা। কারণ বুদ্ধিমত্তা কোনো স্থির জিনিস নয়, বা কিছু নির্বাচিত মানুষের সম্পত্তিও নয়। এটা অনেকভাবে প্রকাশ পায়, যদিও সমাজ সবসময় সেটা দেখতে পায় না।
3
previous post