Home সংবাদদেশ এ আই সম্মেলনে ভিআইপি সংস্কৃতির নির্লজ্জ প্রদর্শন

এ আই সম্মেলনে ভিআইপি সংস্কৃতির নির্লজ্জ প্রদর্শন

0 comments 0 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: রাজনীতিবিদদের পক্ষে ক্ষমতার চাকচিক্যের মধ্যে ভুলে যাওয়া খুব সহজ—তাঁরা আসলে জনসেবক। কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর ক্ষেত্রে নাকি তা নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বরাবরই জোর দিয়ে বলেছেন, সরকার ক্ষমতার জন্য নয়, সেবার জন্য। ২০১৪ সালে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে উঠে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী নন, “প্রধান সেবক”। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও দাবি করেছেন, “মোদি সরকার ক্ষমতার নয়, সেবার সমার্থক।” তাঁর ভাষায়, এই প্রধান সেবক “সপ্তাহে সাত দিন, দিনে চব্বিশ ঘণ্টা মানুষের জন্য কাজ করেন।”

এই সেবামুখী ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করতে সরকার নানা প্রতীকী পদক্ষেপ নিয়েছে। মোদীর বাসভবনের রাস্তার নাম ‘রেস কোর্স রোড’ থেকে বদলে রাখা হয়েছে ‘লোককল্যাণ মার্গ’। রাজ্যপালদের সরকারি বাসভবনের নাম ‘রাজভবন’ থেকে পাল্টে ‘লোক ভবন’ করা হয়েছে। আর ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন তাঁর নতুন কার্যালয়, যার নাম—‘সেবা তীর্থ’। ভবনের গায়ে উৎকীর্ণ রয়েছে একটি বাণী: “নাগরিকই দেবতুল্য।”

কিন্তু নাগরিকেরা নিজেদের দেবতুল্য বলে অনুভব করেছিলেন কি? অন্তত তিন দিন পরের অভিজ্ঞতা তা বলবে না। যখন প্রধানমন্ত্রী দিল্লিতে পাঁচ দিনব্যাপী ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’-এর উদ্বোধনে এলেন, তখন প্রায় দুপুর নাগাদ তাঁর আগমনের প্রস্তুতিতে কনভেনশন কমপ্লেক্সের বড় অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার মানুষকে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেওয়া হয়; ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পরে তাঁদের ফের প্রবেশের অনুমতি মেলে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্ব প্রতিযোগিতাকে সাধারণত আমেরিকা ও চীনের দ্বৈরথ হিসেবে দেখা হয়।এই দুই দেশই এ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় মডেল তৈরি করছে। ভারত প্রযুক্তির আগ্রহী ব্যবহারকারী, কিন্তু উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এখনও প্রথম সারির খেলোয়াড় নয়। এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সামনে ভারতের আধুনিক মুখ তুলে ধরা। কিন্তু উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষের চোখে ধরা পড়ল এক অন্য চিত্র, ভারতের পশ্চাদমুখী ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’র প্রকট প্রদর্শন।

অনুষ্ঠানের আয়োজনেই তার প্রমাণ। সাধারণ দর্শকদের জন্য ছিল বিধিনিষেধের এক হাস্যকর দীর্ঘ তালিকা—ব্যাগ, ল্যাপটপ, এমনকি হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও জলের বোতল পর্যন্ত নিষিদ্ধ। অথচ ভিআইপিরা নির্বিঘ্নে ঢুকলেন। বেরোনোর সময়ও দুর্ভোগ কম ছিল না। এক সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানস্থলের দিকে যাওয়া রাস্তা ভিআইপি ছাড়া সবার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। তথাকথিত ‘দেবতুল‍্য জনতাকে’ ম এক মাইলেরও বেশি হেঁটে গিয়ে ট্যাক্সি বা গণপরিবহন ধরতে হয়। কনভেনশন সেন্টারের বাইরের দিল্লিবাসীরাও রেহাই পাননি। ভিআইপিদের চলাচল সহজ করতে শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। তার অভিঘাতে সারা সপ্তাহ জুড়ে যানজট বেড়েছে, দিল্লি বিমানবন্দর থেকে বহু উড়ান বিলম্বিত হয়েছে।

ভারতে এমন কোনও জনপরিকাঠামো নেই, যা ভিআইপিদের জন্য ব্যাহত করা যাবে না। ইতিমধ্যেই যানজটে জর্জরিত শহরগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রায়শই বন্ধ করে দেওয়া হয় জনসেবকদের দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার্থে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রচারে মুম্বইয়ে গেলে একটি মেট্রো লাইন এবং বাস পরিষেবাও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। গত বছর দিল্লিতে এক বিস্ফোরণের পর নিহতদের আত্মীয়রা অভিযোগ করেন, তাঁদের হাসপাতালে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছিল কেননা ভিআইপিদের বিশেষ ব্যবস্থায় ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

এইসব কাণ্ডকারখানার মূল্য কখনও কখনও শুধু অসুবিধায় সীমাবদ্ধ থাকে না। গত বছর উত্তর ভারতে এক বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ জায়গা ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত থাকায় সাধারণ ভক্তদের ঠেলে গাদাগাদি করে সংকীর্ণ ঘেরাটোপে ঢোকানো হয়েছিল। কয়েক মাস পর আরেকটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আবারও পদদলনের ঘটনা ঘটে। সেখানেও তীর্থযাত্রীরা বলেন, ভিআইপিদের জন্য নির্গমনপথ আটকে রাখা হয়েছিল। প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য একটি মাত্র পথ খোলা থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে এবং মৃত্যুসংখ্যা বেড়ে যায়।

নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই গুরুতর বিষয় বিশেষ করে এমন একটি দেশে যেখানে দুই প্রধানমন্ত্রী (একজন দায়িত্বে থাকা অবস্থায়, অন্যজন ক্ষমতায় ফেরার প্রচারে) হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আর মোদীর মতো নেতাদের ক্ষেত্রে তাঁদের ভক্তদের আবেগ থেকেও সুরক্ষা দিতে হয়। কিন্তু সমস্যা নিরাপত্তা নয়, তার অজুহাতে গড়ে ওঠা এক সর্বব্যাপী ও অতিরঞ্জিত অধিকারবোধ। এই সংস্কৃতি ভৌগোলিক সীমা মানে না, দলভেদ মানে না, শাসনব্যবস্থার শাখাভেদও মানে না। যে কোনও সামান্য ক্ষমতাই কাউকে ভিআইপিতে পরিণত করে। কিছু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বহরের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। এমনকি তুচ্ছ মন্ত্রীরাও পান পুলিশ এসকর্ট, যারা ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে, অন্য গাড়িচালকদের ধমকায়।

ভিআইপি সংস্কৃতি আসলে সামাজিক মর্যাদার চিহ্ন। এর শিকড় ভারতের বহুস্তরবিশিষ্ট, ঐতিহাসিকভাবে স্তরবিন্যস্ত সমাজে—যেখানে প্রভু ও ভৃত্য একই গ্লাসে জল পান করতে পারে না, একই টেবিলে বসতে পারে না, একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারে না, সমান হিসেবে উপস্থিত হতে পারে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই নিয়মে প্রভুই ছিলেন সর্বেসর্বা। আধুনিক ভারতের জনসেবকদের কৃতিত্ব, তাঁরা সেই শ্রেণিবিন্যাস উল্টে দিয়েছেন। নামমাত্র সেবক, বাস্তবে প্রভু।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles