Home খবরদেশ ভোটের আগে ভাষা প্রেম

ভোটের আগে ভাষা প্রেম

0 comments 39 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে—রাজবংশী ও কুর্মালি ভাষাকে ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে (Eighth Schedule) অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং আদিবাসী সমাজে প্রচলিত সারি ধরম ও সর্না ধরমকে পৃথক ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হোক। প্রস্তাবটি কেবল সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন নয়; এটি ভাষা-নীতি, সাংবিধানিক কাঠামো এবং পরিচয়-রাজনীতির এক জটিল সংযোগবিন্দুতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

এটি বাইরে থেকে “আরও দুটো ভাষা যোগ, আরও দুটো ধর্মের স্বীকৃতি”এ রকম মনে হলেও আসলে এর ভেতরে আছে তিনটি গভীর স্তর:

এক, সংবিধান-রাষ্ট্রের স্বীকৃতির রাজনীতি; দুই, ভাষা ও শিক্ষানীতির বাস্তব সুবিধা; তিন, পরিচয়-নিরাপত্তা ও আদিবাসী সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন।

অষ্টম তফসিল: এটা আসলে কী, আর কেন সবাই “অষ্টম তফসিল চাই” বলে

ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিল হোল সেই তালিকা যেখানে রাষ্ট্র কিছু ভাষাকে “সংবিধানস্বীকৃত” বা “Scheduled” ভাষা হিসেবে গণ্য করে। সময়ের সঙ্গে তালিকাটি সম্প্রসারিত হয়েছে; অতীতে একাধিক সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে ভাষা যোগ হয়েছে।

কিন্তু “স্বীকৃতি” কথাটা এখানে আবেগ নয়, এটা রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতরে প্রবেশের চাবি। অষ্টম তফসিলে ঢোকা মানে কেবল “সম্মান” নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে—

(ক) ভাষার মান্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: পাঠ্যক্রম, গবেষণা, অভিধান-ব্যাকরণ, অনুবাদ প্রকল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে সরকারি সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

(খ) প্রশাসনিক ও প্রতীকী ক্ষমতা: সরকারি নথি, সরকারি উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক সংস্থার অনুদান, ভাষা-উন্নয়ন বোর্ড—এই সব জায়গায় “রাষ্ট্রীয় যুক্তি” তৈরি হয়।

(গ) রাষ্ট্রের ভাষানীতির বড় কাঠামোতে জায়গা: সংবিধানের ভাষা-সংক্রান্ত ধারাগুলোর প্রেক্ষিতে (যেমন রাষ্ট্রের ভাষা-প্রচারের কর্তব্য ইত্যাদি) Scheduled ভাষার একটি আলাদা গুরুত্ব তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নথিতেও অষ্টম তফসিল সংক্রান্ত সাংবিধানিক কাঠামোর কথা উল্লেখ আছে।

সোজা ভাষায় বললে অষ্টম তফসিলে থাকা মানে ভাষাটি রাষ্ট্রের চোখে “ঘরে ঢোকা ভাষা” না থাকলে সেটা অনেক সময় “বাইরের ভাষা”। যদিও মানুষের মুখে মুখে, সংস্কৃতিতে, দৈনন্দিন জীবনে ভাষাটা বাস্তব ও জীবন্ত।

রাজবংশী ও কুর্মালি: কেন এই দুটো ভাষা নিয়ে এই মুহূর্তে উদ্যোগ

পশ্চিমবঙ্গের মুখ‍্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী  কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে লেখা চিঠিতে যে যুক্তি সামনে এনেছেন, তার মূল সুর হলএই ভাষাগুলি পশ্চিমবঙ্গের “প্রান্তিক/বঞ্চিত” জনগোষ্ঠীর ভাষা; সংবিধানস্বীকৃতি তাদের ভাষাগত অধিকারের সুরক্ষা ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে দৃঢ় করবে।

রাজবংশী- উত্তরবঙ্গের বড় অংশে (এবং সীমান্ত-সন্নিহিত সাংস্কৃতিক অঞ্চলে) মানুষের দৈনন্দিন কথ্য-জগতের এক প্রভাবশালী ভাষা-প্রবাহ।

কুর্মালি- বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চল/ঝাড়খণ্ড-সংলগ্ন বলয়ে বহু মানুষের মুখের ভাষা, যা স্থানীয় সমাজ-অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই ভাষাগুলোর দাবির ইতিহাস নতুন নয়; নতুন হল রাষ্ট্রীয় স্তরে একটি আনুষ্ঠানিক চাপ যেখানে সরকার নিজেই কেন্দ্রকে অনুরোধ করছে এবং বিষয়টি “ভাষা-নীতি” থেকে “সাংবিধানিক স্তর” পর্যন্ত তুলে আনছে।

এখানে একটি বাস্তবতা মনে রাখা দরকার। অষ্টম তফসিলে ভাষা যোগ করা সরকারি সিদ্ধান্তে এক দফায় হয়ে যায় না। এটা সাধারণত সাংবিধানিক সংশোধনী ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার বিষয় অর্থাৎ কেন্দ্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা, এবং নীতিগত অবস্থান, সব কিছু জড়িত।

তাই পশ্চিমবঙ্গের চিঠি একদিকে যেমন “সাংস্কৃতিক অধিকার”-এর কথা বলছে, অন্যদিকে এটা কেন্দ্রের সামনে একধরনের নীতিগত চাপও তৈরি করছে, কারণ একবার রাজ্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টা তুললে, কেন্দ্রকে “না” বলার ভাষাটাও তৈরি করতে হয়।

‘সারি ধরম’ ও ‘সর্না ধরম’—এই স্বীকৃতির দাবির মর্ম কী

ভাষার দাবির সঙ্গে ধর্মের দাবিকে পাশাপাশি রাখার কারণটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। চিঠি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ সরকার চাইছে আদিবাসী সমাজে প্রচলিত সারি ধরম এবং সর্না ধরম-কে “সরকারি স্বীকৃতি” দেওয়া হোক যাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকারের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়।

এখানে “স্বীকৃতি” বলতে কী বোঝানো হচ্ছে এই প্রশ্নটাই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ভারতীয় প্রশাসনিক বাস্তবতায় ধর্মীয় স্বীকৃতি সবচেয়ে দৃশ্যমান হয় জনগণনা, সরকারি নথিভুক্তি, শিক্ষা-সংস্কৃতি নীতি, এবং আইনগত প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাসে। বহু আদিবাসী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে তাদের স্বতন্ত্র ধর্মবিশ্বাসকে আলাদা করে গণ্য করার সুযোগ দেওয়া হোক, বিশেষ করে সেনসাসে পৃথক ‘ধর্ম কোড/কলাম’ বা নির্দিষ্ট ক্যাটাগরি তৈরির দাবি বহু জায়গায় দেখা যায়।

সর্না কোড–এর আন্দোলন মূলত এই দাবিকেই ধারালো করেছে যে আদিবাসী ধর্মকে শুধু “Others” ঘরে ঠেলে না দিয়ে, স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

আর সারি ধরম পশ্চিমবঙ্গসহ কিছু অঞ্চলে বিশেষ আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত একটি ধর্মীয় পরিচয়, যাকে কেন্দ্র করে “আমাদের আচার-অনুষ্ঠান, দেব-দেবী ধারণা, প্রকৃতি-আস্থার ধর্মতত্ত্ব সব কিছুই আলাদা, এমন যুক্তি উঠে আসে। সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবেদনের মধ্যে এই দুই ধর্মের নাম পাশাপাশি এসেছে, এবং এটিকে “আদিবাসী ধর্মীয় পরিচয় সুরক্ষা”-র অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা হয়েছে।

কেন ভাষা-ধর্ম একসঙ্গে: ‘পরিচয়-নিরাপত্তা’কে এক প্যাকেজে আনা

ভাষা ও ধর্ম—দুটোই পরিচয়ের গভীর স্তম্ভ। বহু এলাকায় ভাষাগত দাবি আলাদা থাকে, ধর্মীয় দাবি আলাদা; কিন্তু যখন কোনও সমাজ দীর্ঘদিন ধরে অনুভব করে যে তার পরিচয় রাষ্ট্রের বড় খোপে মিশে যাচ্ছে বা “অদৃশ্য” হয়ে যাচ্ছে, তখন ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতি একত্রে “স্বীকৃতির প্যাকেজ” হয়ে ওঠে।

এই ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের আবেদন কার্যত বলছে—

রাজবংশী ও কুর্মালি ভাষাভাষী মানুষরা শুধু “কথ্য ভাষার ব্যবহারকারী” নন; তারা ঐতিহাসিকভাবে একটি সাংস্কৃতিক জনসমষ্টি।

একইভাবে সারি/সর্না ধর্ম মানে শুধু ব্যক্তিগত আচার নয়; এটা বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমষ্টিগত সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব।

রাষ্ট্র যদি এই দুটো স্তম্ভকে সাংবিধানিক/সরকারি কাঠামোয় স্বীকৃতি দেয়, তাহলে সমাজের এক বড় অংশের কাছে সেটা “আমরা রাষ্ট্রের মানচিত্রে আছি”—এই অনুভূতি তৈরি করে।

কেন্দ্রের সামনে বাস্তব চ্যালেঞ্জ: সিদ্ধান্তটি কেন কঠিন

কেন্দ্রের কাছে এই ধরনের দাবিতে তিন রকমের প্রশ্ন আসে।

  1. নীতিগত প্রশ্ন : অষ্টম তফসিলের তালিকা কি আরও বাড়বে? বহু ভাষা বহু বছর ধরে অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলে, একটিকে মানলে অন্যগুলোর দাবিও তীব্র হয়।
  2. প্রশাসনিক প্রশ্ন : ভাষা অন্তর্ভুক্তির পর শিক্ষা-সংস্কৃতি কাঠামো, অনুবাদ, মান্য বানান-ব্যাকরণ, সরকারি সহায়তা এসবের জন্য সক্ষমতা ও অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন।
  3. রাজনৈতিক-সামাজিক প্রশ্ন : ধর্মীয় স্বীকৃতি (বিশেষত জনগণনা-সংক্রান্ত পৃথক কোড) নিয়ে বিভিন্ন মত থাকে—কেউ এটিকে সাংস্কৃতিক অধিকার বলেন, কেউ একে “পরিচয় ভাঙন/সামাজিক বিভাজন” বলেও ব্যাখ্যা করতে চান। এই টানাপোড়েন সরাসরি নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে।

এই কারণে পশ্চিমবঙ্গের আবেদনের গুরুত্ব একদিকে সাংস্কৃতিক, অন্যদিকে এটা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের একটি পরীক্ষাও—কেন্দ্র কীভাবে “স্বীকৃতির রাজনীতি” পরিচালনা করে।

সব মিলিয়ে এর তাৎপর্য: রাষ্ট্র, সংবিধান, এবং ‘দেখা পাওয়া’র লড়াই

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হল এটা পশ্চিমবঙ্গের ভেতরে বহুদিন ধরে চলা কিছু অদৃশ্যতার অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রের দরজায় টেনে আনছে। ভাষা-ধর্ম-পরিচয়ের প্রশ্ন কাগজে-কলমে যতই “ডিমান্ড” মনে হোক, মানুষের জীবনে তা “অস্তিত্বের স্বীকৃতি”।

কেন্দ্র যদি রাজবংশী ও কুর্মালিকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করে, সেটা হবে কেবল দুটো ভাষার জন্য নয় সামগ্রিকভাবে একটি একটা বড় বার্তা যেখানে রাষ্ট্র বলছে, “তোমাদের ভাষা রাষ্ট্র-সত্বার অন্তর্গত।”

আর সারি ধরম ও সর্না ধরমকে কোনও স্তরে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ হবে, আদিবাসী ধর্মবিশ্বাসকে “Others”–এর ছায়ায় না রেখে, তাকে পৃথক পরিচয়ে দৃশ্যমান করার পথে রাষ্ট্র এগোচ্ছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles