বাংলাস্ফিয়ার: শঙ্কর। নামটি উচ্চারণ করলেই আমার ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। যেন দূরের কোনও বিকেলের রোদ, ধূলোমাখা পথের ওপর হেলে পড়েছে আর সেখানে এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে-চোখে বিস্ময়, কপালে প্রশ্ন, হাতে অদেখা জীবনের মানচিত্র। বাংলা সাহিত্যে তিনি পরিচিত শঙ্কর নামেই, কিন্তু জন্মেছিলেন মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় হিসেবে। আমাদের সাহিত্যের পরস্পরায় তিনি এমন এক সেতু, যিনি স্বাধীনতার পরবর্তী শহুরে মধ্যবিত্তের মানস-উপাখ্যানকে শব্দে, চরিত্রে, রসে ও বেদনায় রূপ দিয়েছেন। তাঁর কলমে কলকাতা কেবল একটি শহর নয়, এক জীবন্ত সত্বা যে কখনও নির্মম, কখনও মাতৃসম, কখনও রূপসী, কখনও নিষ্ঠুর কিন্তু সর্বদাই সত্য।
শঙ্করের শৈশব ছিল আর পাঁচটা বাঙালি ছেলের মতোই স্বপ্নময়, আবার দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার ছায়ায় আচ্ছন্ন। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হওয়ার অভিঘাত তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় বাস্তবের কঠিন পাঠশালায়। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকার সন্ধান, আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই, এবং সমাজের অদৃশ্য স্তরগুলোকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ এই সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে তাঁর অন্তর্লোক। তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলেন, জীবনের সত্য গল্পের চেয়েও গভীর; আর গল্প যদি সত্যের কাছাকাছি যেতে না পারে, তবে তা কেবল বিনোদন সাহিত্য নয়।
কলকাতার আদালতপাড়া, চেম্বার, টাইপিস্টদের ঘর, ব্যারিস্টারদের ব্যক্তিত্ব: চাকরিপ্রার্থী তরুণদের হতাশা-এই সবই তাঁর চোখে জমা হতে থাকে। সেই সঞ্চয়ই একদিন রূপ নেয় কত অজানারেতে। এই উপন্যাসে তিনি যে আত্মজৈবনিক সুর তুলেছিলেন, তা কেবল একজন তরুণের চাকরি খোঁজার গল্প নয় তা ছিল স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার মধ্যবিত্ত মানসের এক দলিল। পাঠক প্রথমবার অনুভব করলেন তাঁদের নিজের জীবনের ঘাম, লজ্জা, অপমান, স্বপ্ন, সবই সাহিত্যের উপকরণ হতে পারে। শঙ্কর সেখানে নায়ক নন, তিনি সাক্ষী। আবার সাক্ষী হয়েও তিনি ভেতরের মানুষটির কান্না আড়াল করেননি।
তারপর এল সেই বিস্ময়কর সৃষ্টি- চৌরঙ্গী। এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। হোটেল, লবি, রিসেপশন, ককটেল, বিদেশি অতিথি, ব্যবসায়ী, পতিতালয়-সংলগ্ন গোপন লেনদেন, এইসব উপাদান বাংলা উপন্যাসে আগে কখনও এমন খোলামেলাভাবে আসেনি। শঙ্কর আমাদের নিয়ে গেলেন কলকাতার সেই আলোকোজ্জ্বল মুখোশের আড়ালে, যেখানে সম্পর্কগুলি স্বার্থের, ভালোবাসা অনিশ্চিত, আর মানুষ ক্রমাগত নিজের অবস্থান বাঁচিয়ে চলেছে। তিনি দেখালেন সফলতার ভিত কত নড়বড়ে, আর ব্যর্থতার ভেতরেও কত মানবিক দীপ্তি লুকিয়ে থাকে।

চৌরঙ্গীর সাফল্য তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, তিনি কখনও কেবল জনপ্রিয়তার লেখক হয়ে থাকেননি। তাঁর লেখায় সবসময় একধরনের নৈতিক অনুসন্ধান ছিল। তিনি প্রশ্ন করতেন, ক্ষমতা কী? অর্থ কী? মানুষের মর্যাদা কোথায়? এই অনুসন্ধান আরও গভীরভাবে ফুটে ওঠে সীমারন্ধে। কর্পোরেট দুনিয়ার প্রতিযোগিতা, পদোন্নতির জন্য নীরব ষড়যন্ত্র, আত্মসম্মান ও সুবিধাবাদের দ্বন্দ্ব এই সবকিছুকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরলেন, যেন পাঠক নিজেই সেই অফিসঘরে দাঁড়িয়ে আছেন। এই উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়এবং তা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক স্মরণীয় সংযোজন। সৎাজিৎ ও শঙ্করের সৃষ্টিশীল মিলন আমাদের বুঝিয়েছিল, সাহিত্য ও সিনেমা যখন একে অন্যের ভাষা বোঝে, তখন শিল্পের গভীরতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
শঙ্করের সাহিত্যজগৎ কেবল শহুরে জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়, তা এক নৈতিক ভূগোল। তাঁর চরিত্ররা কখনও পুরোপুরি সৎ নয়, আবার পুরোপুরি অসৎও নয়। তারা পরিস্থিতির সন্তান। শঙ্কর তাঁদের বিচার করেন না; বরং বোঝার চেষ্টা করেন। তাঁর গদ্যে এক ধরনের স্বচ্ছতা আছে অতিরিক্ত অলংকারহীন, অথচ গভীর আবেগময়। তিনি জানতেন, সত্য উচ্চারণের জন্য জটিল বাকা প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন সততা।
আমি যখন তাঁর লেখা প্রথম পড়ি, মনে হয়েছিল, এই মানুষটি আমাদের খুব কাছের। তিনি বড় বড় তত্ত্ব বলেন না; তিনি গল্প বলেন। কিন্তু সেই গল্পের ভেতর দিয়ে সমাজের অস্থিরতা, শ্রেণি-বিভাজন, আকাঙ্ক্ষা ও হতাশার জটিল সমীকরণ ফুটে ওঠে। তাঁর কলমে কলকাতা যেন এক চলমান নাট্যমঞ্চ, যেখানে প্রতিদিন নতুন দৃশ্য, নতুন চরিত্র, নতুন সঙ্কট।
শঙ্করের ব্যক্তিজীবন ছিল সংযত। তিনি প্রচারের আলো এড়িয়ে চলতেন। অথচ তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল। পাঠকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এক অদ্ভুত বিশ্বাসের। পাঠক জানতেন, শঙ্কর তাঁদের ঠকাবেন না। তিনি যে গল্প বলবেন, তা অভিজ্ঞতার ভিতর থেকে উঠে আসবে। হয়তো সেই কারণেই তাঁর উপন্যাসগুলির চরিত্ররা আজও জীবন্ত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সমাজ বদলেছে। কর্পোরেট দুনিয়া আরও বিস্তৃত হয়েছে, শহরের চেহারা পাল্টেছে, মধ্যবিত্তের স্বপ্নের রং বদলেছে। কিন্তু শঙ্করের লেখা পড়লে মনে হয় মানুষের ভেতরের দ্বন্দ্ব একই রয়ে গেছে। অর্থ ও মর্যাদার টানাপোড়েন, ভালোবাসা ও সুবিধাবাদের সংঘর্ষ, আত্মসম্মান ও নিরাপত্তার দ্বিধা, এই সবকিছু আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর সাহিত্য তাই কেবল একটি সময়ের দলিল নয়; তা এক চিরন্তন মানব-অভিজ্ঞতার ভাষ্য।
শঙ্করের প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি যুগের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু তাঁর শব্দগুলি রয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে তিনি এমন এক স্বর, যা আধুনিকতার সঙ্গে মানবিকতার সমন্বয় ঘটিয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, জনপ্রিয়তা ও সাহিত্যগুণ পরস্পরবিরোধী নয়। তিনি দেখিয়েছেন, বাস্তবের কঠোরতা থেকেও গভীর শিল্প জন্ম নিতে পারে।
আজ যখন তাঁর কথা ভাবি, মনে হয়, তিনি ছিলেন এক নীরব পর্যবেক্ষক। তিনি দেখেছেন, লিখেছেন, কিন্তু নিজেকে গল্পের কেন্দ্রে রাখেননি। তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা তাঁর পক্ষ থেকে কথা বলেছে। হয়তো এটাই একজন প্রকৃত শিল্পীর পরিচয়, তিনি নিজের চেয়ে বড় হয়ে ওঠেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে।
শঙ্করের স্মৃতি মানে আমার কাছে এক শহরের স্মৃতি, এক প্রজন্মের সংগ্রাম, এক সাহিত্যের বিবর্তন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, জীবন যত কঠিনই হোক, তাকে ভাষায় ধারণ করা যায়। আর ভাষা যখন সত্যকে স্পর্শ করে, তখন তা মানুষের অন্তরে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকে।

তাঁর প্রয়াণে আমরা শোকাহত, কিন্তু একই সঙ্গে কৃতজ্ঞ। কারণ তিনি আমাদের দিয়েছেন এমন কিছু গল্প, যা আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে শেখায়। তিনি দেখিয়েছেন, অন্ধকারের মধ্যেও আলো খোঁজা যায়, আর মানুষের ভেতরের সম্ভাবনাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
শঙ্কর নেই কিন্তু তাঁর শহর আছে, তাঁর চরিত্ররা আছে, তাঁর বাক্যগুলি আছে। বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি এক উজ্জ্বল। নক্ষত্র, যার আলো নিভে গেলেও তার দীপ্তি বহুদিন ধরে পথ দেখাবে। তাঁর স্মৃতির প্রতি প্রণাম জানিয়ে আমি মনে মনে বলি-আপনি আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে জীবনের সাধারণ ঘটনাও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। আপনার কলমের ঋণ আমরা শোধ করতে পারব না,, কেবল গড়ে, মনে রেখে, নতুন প্রজন্মকে গড়িয়ে সেই ঋণ স্বীকার করতে পারি।
এই স্মৃতিকথা শেষ করতে গিয়ে মনে হয়, শঙ্কর আসলে আমাদের ভেতরের মানুষটিকে চিনতে শিখিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, সাফল্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সততা স্থায়ী। অর্থ ক্ষয় হয়, কিন্তু স্মৃতি বেঁচে থাকে। আর সাহিত্য, যদি তা সত্যের ভিত্তিতে দাঁড়ায়, তবে সময় তাকে মুছে দিতে পারে না।
প্রয়াত শঙ্করকে স্মরণ করে তাই আজও মনে হয়, কলকাতার কোনো এক পুরনো হোটেলের লবিতে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে নোটবই, চোখে গভীর মনোযোগ। মানুষ আসছে-যাচ্ছে, আলো বদলাচ্ছে, সময় এগিয়ে যাচ্ছে আর তিনি নীরবে সেই চলমান জীবনের গল্প লিখে চলেছেন। তাঁর সেই লেখা আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকবে, যতদিন আমরা মানুষকে বোঝার চেষ্টা করব, যতদিন আমরা জীবনের কঠিন সত্যকে সাহিত্যের আলোয় দেখতে চাইব।