বুদ্ধিমত্তা একটি অভ্যাস। জিনিয়াসের মতো কীভাবে চিন্তা করবেন? সত্যিকারের বুদ্ধিমান মানুষ কীভাবে আলাদা ভাবে চিন্তা করে AI-শাসিত যুগে?
অভিজ্ঞান ভাদুড়ি: আজ গোটা দুনিয়ায় তথ্যের কোনও অভাব নেই। যে কোনও তথ্য, ব্যাখ্যা বা সারসংক্ষেপ এখন মুহূর্তেই পাওয়া যায়। কিন্তু আজকের দিনে বুদ্ধিমত্তা মানে আপনি কত কিছু জানেন তা নয়, আপনি কত গভীরভাবে বোঝেন, সেটাই আসল। সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা— যেটা আমরা বড় বিজ্ঞানী বা মৌলিক চিন্তাবিদদের মধ্যে দেখি— সেটা মুখস্থ করার ক্ষমতা নয়। বরং জটিল বিষয়ের ভেতরটা দেখা, সঠিক প্রশ্ন করা, আর নিজের মতো করে নতুন সংযোগ তৈরি করা। মেশিন তথ্য দিতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের বোঝাপড়া তৈরি করতে পারে না।
এই পার্থক্যটা আমি নিজের জীবনে বুঝেছি। ছোটবেলায় আমাকে এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ানো হয়েছে যেখানে মুখস্থ করা আর পরীক্ষায় ঠিকভাবে লেখা এটাই ছিল মূল লক্ষ্য। চিন্তা করা শেখানো হতো না। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এটা বদলায়। আমার পিএইচডি সুপারভাইজার ছিলেন খুব কঠোর শিক্ষক। অস্পষ্ট উত্তর তিনি মেনে নিতেন না। সবকিছু পরিষ্কারভাবে বোঝাতে হতো। প্রথমে আমরা তাকে ভয় পেতাম। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, তিনি মুখস্থ উত্তর নয়, সত্যিকারের চিন্তাকে মূল্য দিতেন। তিনি আমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শিখিয়েছিলেন: কোনও কিছুর নাম জানা মানে সেটা বোঝা নয়।
বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানও ছোটবেলায় একই শিক্ষা পেয়েছিলেন। তার বাবা তাকে বলেছিলেন, কোনও পাখির নাম জানলেই তুমি জানতে পারনা কীভাবে সেটা ওড়ে, বাঁচে বা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। নাম জানা আর বোঝা এক জিনিস নয়। এই কারণেই পরীক্ষায় ভালো করা সবসময় সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ নয়। অনেক ছাত্র পরীক্ষায় ভালো করে, কারণ তারা সূত্র মুখস্থ করে। কিন্তু যখন তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, এর আসল মানে কী তখন তারা ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ পরীক্ষায় মুখস্থ করা পুরস্কৃত হয়, চিন্তা করা নয়।
ফাইনম্যান এটা মেনে নেননি। তিনি মনে করতেন, যদি তিনি কোনও কিছু সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারেন তাহলে তিনি সেটা আসলে বোঝেননি। এখানেই আসল সত্যটা আছে: বুদ্ধিমত্তা কোনো জন্মগত প্রতিভা নয়। এটা একটা অভ্যাস। বেশিরভাগ মানুষ যে কোনও ব্যাখ্যা শুনে সন্তুষ্ট হয়ে যায়। তারা প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সত্যিকারের চিন্তাবিদরা তা করে না। তারা ধীরে চিন্তা করে, প্রশ্ন করে, আর নিজের বোঝাপড়া যাচাই করে। যাকে আমরা “ব্রিলিয়ান্স” বলি সেটা প্রায়ই শুধু একটা প্রশ্ন নিয়ে অন্যদের চেয়ে বেশি সময় ধরে ভাবার ক্ষমতা।
এই অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। প্রথম ধাপ হোল, কোনও ধারণাকে বাস্তবের সঙ্গে যুক্ত করা। আপনি যদি সেটা কল্পনা করতে না পারেন, তাহলে আপনি সেটা পুরোপুরি বোঝেননি। দ্বিতীয় ধাপ হোল, বারবার “কেন?” প্রশ্ন করা। বাচ্চারা এটা স্বাভাবিকভাবে করে। বড়রা করে না কারণ তারা অজ্ঞ পরিচয় দিতে ভয় পায়। তৃতীয় ধাপ হলো, নতুন ধারণাকে পুরনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা। সংযোগ তৈরি না হলে জ্ঞান দুর্বল থাকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, না বুঝেও বুঝেছি এমন ভান না করা।
ফাইনম্যান নিজেও খেলাচ্ছলে চিন্তা করতে ভালোবাসতেন। তার নোবেল পুরস্কার পাওয়া গবেষণার শুরু হয়েছিল একটা সাধারণ ঘটনা থেকে— একটা ঘূর্ণায়মান প্লেট দেখে তার কৌতূহল হয়েছিল। যেখানে অন্যরা কিছু দেখেনি, তিনি একটা প্রশ্ন দেখেছিলেন। এই মানসিকতাই আসল পার্থক্য তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত, গভীরভাবে চিন্তা করা শুধু জিনিয়াসদের জন্য নয়। এটা যে কেউ শিখতে পারে। যখন আপনি মুখস্থ করা বন্ধ করে সত্যিকারের বোঝা শুরু করেন, তখনই আসল বুদ্ধিমত্তা শুরু হয়।