Table of Contents
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক | ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: কেমব্রিজ, যুক্তরাষ্ট্র: তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক নতুন যুগের সূচনা হলো। যে গাণিতিক জটিলতা গত চার দশক ধরে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানীদের আটকে রেখেছিল, তার সমাধান বাতলে দিল ওপেনএআই-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘চ্যাটজিপিটি’ (ChatGPT)। সম্প্রতি হার্ভার্ড, ভ্যান্ডারবিল্ট এবং আইএএস (IAS)-এর একদল গবেষক আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স (AAAS)-এর বার্ষিক সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন।
গ্লুয়ন মিথস্ক্রিয়া: অসম্ভব এখন সম্ভব
প্রোটন এবং নিউট্রনের ভেতরে ‘গ্লুয়ন’ (Gluon) নামক কণাগুলো শক্তিশালী নিউক্লীয় বল বহন করে। এই কণাগুলোর মিথস্ক্রিয়া বা সংঘর্ষ বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা ‘স্ক্যাটারিং অ্যাম্প্লিচিউড’ (Scattering Amplitude) নামক গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করেন।
এতদিন পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত ধারণা ছিল যে, যদি অনেকগুলো গ্লুয়নের মধ্যে মাত্র একটির ঘূর্ণন বা হেলিসিটি (Helicity) নেগেটিভ (–) হয় এবং বাকি সব পজিটিভ (+) হয়, তবে সেই সংঘর্ষ ঘটার সম্ভাবনা বা অ্যাম্প্লিচিউড হবে শূন্য। গাণিতিকভাবে একে বলা হতো:

কিন্তু চ্যাটজিপিটি প্রমাণ করেছে যে, একটি বিশেষ অবস্থায় (Collinear Limit) এই মিথস্ক্রিয়া আসলে সম্ভব এবং এর মান শূন্য নয়।
যেভাবে এলো এই সাফল্য: মানুষের মেধা ও এআই-এর গতি
হার্ভার্ডের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু স্ট্রোমিঞ্জার এবং তার দল প্রায় এক বছর ধরে এই সমস্যার সমাধান খুঁজছিলেন। হাতে কলমে করা তাদের হিসেবগুলো ছিল অত্যন্ত জটিল। গবেষক আলফ্রেডো গুয়েভারা ৪টি ও ৫টি গ্লুয়নের ক্ষেত্রে একটি প্যাটার্ন খুঁজে পেলেও সেটিকে কয়েকশ পদের (Terms) দীর্ঘ এক সমীকরণ থেকে একটি সাধারণ সূত্রে রূপান্তর করতে পারছিলেন না।
ঠিক এই সময়েই গবেষক দল ওপেনএআই-এর সর্বশেষ মডেল GPT-5.2 Pro-এর সাহায্য নেন। ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্য:
- সংক্ষিপ্তকরণ: ৩২টি পদের একটি বিশালাকার যোগফলকে চ্যাটজিপিটি মাত্র ২০ মিনিটে একটি মাত্র লাইনের গুণফলে রূপান্তর করে।
- সাধারণ সূত্র (Generalization): ৪টি বা ৫টি গ্লুয়ানের গণ্ডি পেরিয়ে চ্যাটজিপিটি সংখ্যক যে কোনো গ্লুয়ানের জন্য একটি সাধারণ সূত্র প্রদান করে।
- সুপারচ্যাট (SuperChat) ও প্রমাণ: এরপর ওপেনএআই-এর একটি নির্মাণাধীন শক্তিশালী মডেল, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘সুপারচ্যাট’ বলছেন, সেটি মাত্র ১২ ঘণ্টার প্রসেসিং শেষে এই সূত্রের একটি নিখুঁত গাণিতিক প্রমাণ উপস্থাপন করে।
স্পিনর-হেলিসিটি এবং পার্ক-টেইলর সূত্রের নতুন রূপ
এই গবেষণায় চ্যাটজিপিটি স্পিনর-হেলিসিটি (Spinor-helicity) নামক একটি আধুনিক গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। ১৯৮০-এর দশকে আবিষ্কৃত বিখ্যাত পার্ক-টেইলর (Parke-Taylor) সূত্রটি যেখানে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে কাজ করত, চ্যাটজিপিটি সেটিকে আরও বিস্তৃত করেছে। এর ফলে এখন বিজ্ঞানীরা প্রোটনের ভেতরের অত্যন্ত উচ্চ শক্তির সংঘর্ষগুলো নিখুঁতভাবে হিসেব করতে পারবেন।
| বৈশিষ্ট্য | আগের ধারণা (Old Theory) | এআই-এর নতুন আবিষ্কার (AI Discovery) |
| সিঙ্গেল নেগেটিভ হেলিসিটি | মিথস্ক্রিয়া অসম্ভব (A = 0) | নির্দিষ্ট অবস্থায় সম্ভব (A ≠ 0) |
| হিসাবের জটিলতা | কয়েকশ পৃষ্ঠার সমীকরণ | এক লাইনের সংক্ষিপ্ত সূত্র |
| সমাধানের সময় | কয়েক বছর/দশক | মাত্র কয়েক মিনিট |
কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির পথে পরবর্তী ধাপ
গবেষক অ্যালেক্স লুপসাস্কা জানান, তারা এখন এই একই পদ্ধতি ব্যবহার করে মহাকর্ষের তাত্ত্বিক কণা ‘গ্র্যাভিটন’ (Graviton) নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো মহাকর্ষের সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মিলন ঘটানো। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এআই-এর এই গাণিতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ‘কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি’ (Quantum Gravity)-র রহস্য উন্মোচিত হতে পারে।
“এটি পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় একটি আমূল পরিবর্তন বা প্যারাডাইম শিফট। এআই এখন কেবল আমাদের সহকারী নয়, এটি একজন দক্ষ সহকর্মীর মতো জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান দিচ্ছে।”
— আলফ্রেডো গুয়েভারা, গবেষক, আইএএস।
বিজ্ঞানীদের প্রতিক্রিয়া: আশাবাদ ও সতর্কতা
ইউসিএলএ-এর কণা বিজ্ঞানী ভিৎ বের্ন এবং ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইদা এল-খাদরা এই সাফল্যকে স্বাগত জানালেও কিছুটা সতর্ক। তারা মনে করেন, এআই ব্যবহারের ফলে গবেষকদের কাজের গতি বাড়লেও মৌলিক তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনে যেন ঘাটতি না পড়ে। তবে তারা সবাই একমত যে, চ্যাটজিপিটি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণার ধরন চিরতরে বদলে দিয়েছে।