বাংলাস্ফিয়ার: ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক বিরল দৃশ্যের জন্ম দিল।কোনও রাষ্ট্রপতির এত প্রতীকী, এত উচ্চকিত নীতিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এত জোরালোভাবে খারিজ করে দিল, এমন অভিজ্ঞতা বিরল।। Learning Resources বনাম ট্রাম্প মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বিপুল শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তার সিংহভাগই অবৈধ।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ১৯৭০-এর দশকে প্রণীত International Emergency Economic Powers Act (IEEPA) তাঁকে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে নিজের ইচ্ছামতো শুল্ক নির্ধারণের ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু নয় বিচারপতির মধ্যে ছয়জন—প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস-সহ—এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লিখতে গিয়ে রবার্টস স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সংবিধানের প্রণেতারা “শান্তিকালে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসকেই দিয়েছেন” এবং কর আরোপের কোনও অংশই নির্বাহী শাখার হাতে তুলে দেননি। IEEPA-র “regulate” বা “importation” শব্দগুলি কোনও দেশ, কোনও পণ্য, যে কোনও হারে, যে কোনও সময়সীমার জন্য শুল্ক বসানোর স্বাধীন ক্ষমতা দেয় না। কংগ্রেস যখন এই আইন পাশ করেছিল, তখন তারা তাদের জন্মগত কর আরোপের ক্ষমতাকে ‘নিয়ন্ত্রণ’-এর মতো সাধারণ শব্দের আড়ালে লুকিয়ে দেয়নি। রবার্টসের ভাষায়, বিষয়টি এতটাই স্পষ্ট।

রায় ঘোষণার পর সাংবাদিক বৈঠকে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে “গভীরভাবে হতাশাজনক” বলে মন্তব্য করেন। এমনকি তিনি বলেন, আদালতের “কিছু সদস্যের জন্য তিনি লজ্জিত।” একই সঙ্গে নতুন বাণিজ্য-প্রাচীর গড়ে তোলার অঙ্গীকারও করেন।
ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, দু’টি ‘জরুরি পরিস্থিতি’ তাঁকে শুল্ক বাড়াতে বাধ্য করেছে—একটি অবৈধ মাদক আমদানির ফলে সৃষ্ট “জনস্বাস্থ্য সঙ্কট”, অন্যটি “বৃহৎ ও স্থায়ী” বাণিজ্য ঘাটতি। কিন্তু ছোট ব্যবসায়ীদের একাধিক মামলা নিম্ন আদালতগুলিতে তাঁর ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নভেম্বরে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছালে, উদারপন্থী ও রক্ষণশীল—উভয় শিবিরের বিচারপতিরাই প্রেসিডেন্টকে এত বিস্তৃত ক্ষমতা দিতে অনীহা দেখান।
এই রায় কার্যত ট্রাম্পের শুল্ক-প্রাচীরে একটি বড় ফাটল ধরাল। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাজেট ল্যাব’-এর হিসাব অনুযায়ী, IEEPA-র অধীনে আরোপিত শুল্ক বাতিল হলে আমেরিকার কার্যকর শুল্কহার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে। তবু ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, IEEPA-র থেকেও “আরও শক্তিশালী পদ্ধতি ও আইনি ভিত্তি” ব্যবহার করে তিনি তাঁর শুল্কনীতি পুনর্গঠন করবেন।
প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি ১৯৭০-এর দশকের আরেকটি বিধান, ‘সেকশন ১২২’ ব্যবহার করে বিদ্যমান শুল্কের উপর অতিরিক্ত ১০% বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছেন। কিন্তু এই বিধান সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য সাময়িক শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয়। উপরন্তু, এর আগে কখনও এই ধারা ব্যবহার করা হয়নি। ফলে “বৃহৎ ও গুরুতর” পেমেন্ট-ভারসাম্য ঘাটতির যুক্তি তুলে ধরতে হবে এবং তা নিয়েও নতুন আইনি জটিলতা তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী।
সম্পূর্ণভাবে শুল্ক পুনর্গঠন করতে হলে ট্রাম্পের সামনে আরও কয়েকটি পথ খোলা আছে। একটি উপায় হলো কংগ্রেসের মাধ্যমে শুল্ক পাশ করানো,কারণ শুল্ক আসলে কর, আর কর আরোপের অধিকার আইনসভার। কিন্তু অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় এই পথ প্রায় অচল। আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ পথ ‘সেকশন ৩৩৮’, যা ১৯৩০ সালের Smoot-Hawley Tariff Act-এর অংশ। কোনও দেশ যদি আমেরিকান বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ‘বৈষম্য’ করে, তবে উচ্চ শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয় এই ধারা।কিন্তু এটিও কখনও প্রয়োগ করা হয়নি।

সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হলো খাতভিত্তিক ও দেশভিত্তিক শুল্ক—বিশেষত ‘সেকশন ২৩২’ ও ‘সেকশন ৩০১’। এগুলির আইনি ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্ত এবং ইতিমধ্যেই ব্যবহার হচ্ছে। তবে এগুলির একটি বড় সীমাবদ্ধতা আছে: শুল্ক আরোপের আগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন। ফলে ট্রাম্পের সেই স্বভাবসিদ্ধ আকস্মিক হুমকি ও তড়িঘড়ি সমঝোতার রাজনীতি আর সহজ হবে না। তবু লক্ষ্য, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শুল্কহার এখনও অর্জনযোগ্য।
তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাব হবে আরও অনিশ্চয়তা। গত এক বছর ধরে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন, ক্রমাগত বদলে যাওয়া বাণিজ্যনীতি নিয়োগ ও বিনিয়োগকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। ২০২৬ সালে স্থিতি ফিরবে এই আশাও এখন ভঙ্গ। নতুন কাঠামো দাঁড় করাতে গিয়ে নতুন বিজয়ী ও পরাজিতের জন্ম হবে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে ট্রাম্প কতটা আগ্রাসীভাবে বাতিল হওয়া শুল্কের পরিবর্তে নতুন শুল্ক আরোপ করেন তার উপর। আপাতত বাজারের প্রতিক্রিয়া সংযত। রায়ের পর বন্ডের সুদের হার সামান্য বেড়েছে, ডলার কিছুটা দুর্বল হয়েছে—কিন্তু কোনও বড় ধাক্কা দেখা যায়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আদালত প্রায় নীরব থেকেছে—শুল্ক ফেরত। আমদানিকারকেরা ইতিমধ্যেই ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি (মোট জিডিপির প্রায় ০.৩%) শুল্ক পরিশোধ করেছেন, যা আমেরিকার বিশাল বাজেট ঘাটতি সামান্য হলেও কমিয়েছিল। এখন সেই অর্থ ফেরত দিতে হতে পারে। কিন্তু কী প্রক্রিয়ায়, কত জটিল কাগজপত্রের মাধ্যমে তা এখনও অস্পষ্ট। বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানাহ তাঁর ভিন্নমতে সতর্ক করেছেন, এই ফেরত-প্রক্রিয়া একটি “বিশৃঙ্খলা”-য় পরিণত হতে পারে।
তবে যদি দ্রুত অর্থ ফেরত যায়, তা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনীতিকে কিছুটা উজ্জীবিতও করতে পারে।বিচিত্রভাবে, যা ট্রাম্পের পক্ষেই যেতে পারে।
এই রায় সুপ্রিম কোর্টের সামগ্রিক দিকনির্দেশ সম্পর্কেও ইঙ্গিত দেয়। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে আদালত ‘শ্যাডো ডকেট’-এ জরুরি শুনানিতে তাঁকে একের পর এক জয় দিয়েছে—রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ও বরখাস্তের ক্ষমতা, ট্রান্সজেন্ডার সেনা নিষেধাজ্ঞা, অভিবাসন নীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে। কিন্তু নিয়মিত শুনানি, পূর্ণাঙ্গ যুক্তিতর্ক ও লিখিত রায়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ট্রাম্পের সব উদ্যোগ সেখানে সমান সাফল্য পাচ্ছে না।
ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করার ট্রাম্পের প্রচেষ্টাও গত মাসের শুনানিতে খুব একটা শক্ত ভিত্তি পায়নি। যদি তিনি সফল হন, তবে ফেডের বোর্ড পুনর্গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করার পথ খুলে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে, ট্রাম্পের প্রধান অর্থনৈতিক নীতিতে সুপ্রিম কোর্টের এই দৃঢ় প্রত্যাখ্যান ফেড ও লিসা কুকের জন্য সাময়িক স্বস্তির বার্তা বয়ে আনতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই রায় কেবল শুল্কনীতি নয়, নির্বাহী ক্ষমতার সীমারেখা নিয়েও একটি স্পষ্ট বার্তা দিল—সংবিধানের কাঠামোতে কর আরোপের চাবিকাঠি এখনও কংগ্রেসের হাতেই।