Home সংস্কৃতি ও বিনোদন চৌরঙ্গী পেরিয়ে জনঅরণ্যে হারিয়ে গেলেন শংকর

চৌরঙ্গী পেরিয়ে জনঅরণ্যে হারিয়ে গেলেন শংকর

by Ankita Senapati
0 comments 77 views
A+A-
Reset

প্রতিবেদন: অঙ্কিতা সেনাপতি

সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে নক্ষত্রপতন। প্রয়াত বর্ষীয়ান সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

ওরা বলে- এসপ্ল্যানেড। আমরা বলি- চৌরঙ্গী। সেই চৌরঙ্গীরই কার্জন পার্ক। সারা দিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত শরীরটা যখন আর নড়তে চাইছিল না, তখনই ওইখানেই আশ্রয় মিলল। ইতিহাসের মহামান্য কার্জন সাহেব বাংলাদেশের অনেক অভিশাপ কুড়িয়েছিলেন। সুজলা-সুফলা এই দেশটাকে কেটে দুভাগ করার বুদ্ধি যেদিন তাঁর মাথায় এসেছিল, আমাদের দুর্ভাগ্যের ইতিহাস নাকি সেই দিন থেকেই শুরু হয়েছিল। এভাবেই শুরু হয়েছে শংকরের জনপ্রিয় উপন্যাস “চৌরঙ্গী”। তাঁর পুরো নাম মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। কিন্তু “চৌরঙ্গী”, “মুক্তির স্বাদ” ও “কত অজানারে” সহ বহু জনপ্রিয় উপন্যাসের স্রষ্টা এই লেখক পাঠকমহলে শংকর নামেই অধিক জনপ্রিয়।

সূত্রের খবর, লেখক দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন, ২০ ফেব্রুয়ারি শহরের বাইপাস সংলগ্ন একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হয়েছেন তিনি। বার্ধক্যের নীরব ক্লান্তি ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে গেল সময়ের ওপারে, রেখে গেলেন তাঁর অনন্য সৃষ্টিতে ভরা এক অনন্ত ভুবন।

১৯৩৩ সালে যশোর জেলার বনগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শংকর — আর সেই জন্মভূমির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অল্প সময়ের জন্য বনগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে; এমনকি সেখানে পাকিস্তানের পতাকাও উত্তোলিত হয়েছিল। কিন্তু পরে র‍্যাডক্লিফের সীমারেখা নির্ধারণে গুরুতর ভুল ধরা পড়লে অঞ্চলটি পুনরায় ভারতের অংশ হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন তাঁর প্রবন্ধ “এ বঙ্গাল ফ্রম বনগ্রাম”-এ।

কিশোর বয়সেই পিতৃহীন হয়ে জীবিকার তাগিদে নানা পেশায় যুক্ত হতে হয় তাঁকে— কখনও কেরানির কাজ, কখনও হকারি।  পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বাওয়েলের অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে কাজ শুরু করলেন।এই হাইকোর্টের কেরানির জীবন, সেখানকার পরিবেশ, চেনা-অচেনা মানুষ ও কলকাতা , বারওয়েল সাহেব, তাঁর জীবনের গল্প, হাইকোর্টের দৃশ্য এবং সেখানকার গল্প— সব নিয়ে লিখে ফেললেন আস্ত এক উপন্যাস। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ, এবং ১৯৫৫ সালে বইয়ের আকারে প্রকাশ পেল শংকরের প্রথম বই “কত অজানারে”। প্রথম বইতেই বাজিমাত। বয়স তখন মাত্র উনিশ বা কুড়ি।

শংকরের সাহিত্যজীবনের সূচনালগ্নেই জড়িয়ে রয়েছে বাংলা সাহিত্যের দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নাম। তাঁর প্রথম উপন্যাসের নামকরণ করেছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র। প্রকাশের পর সেই বইয়ের একটি কপি তিনি পাঠিয়েছিলেন সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়-এর কাছে। আশীর্বাদ জানিয়ে তিনি লিখেছিলেন— “আপনার প্রথম সাফল্য যেন জীবনের শেষ সাফল্য না হয়।”

তবে সাহিত্যজীবনের শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। নবাগত লেখক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়কে ঘিরে সমালোচনা ও কটুক্তিও কম হয়নি। সাহিত্য মহলের একাংশে বিদ্রূপ করে বলা হয়েছিল, এক উকিলের মুহুরীর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই নাকি হঠাৎ একটি গল্প লিখে ফেলেছেন তিনি। অথচ সংগ্রামী জীবনের কঠোর বাস্তবতার মধ্যেই জন্ম নেয় তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য রচনা “কত অজানারে”। সেই বইয়ের পারিশ্রমিক হিসেবে পাওয়া ২৮৫ টাকায় তাঁর বাড়িতে প্রথমবার বিদ্যুৎ সংযোগ আসে। বোধোদয় উপন্যাস প্রকাশের পর শংকরকে উৎসাহ-বাণী পাঠান শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়: “ব্রাইট বোল্ড বেপরোয়া”। ভাবনা বা প্রকাশভঙ্গিতে এ-উপন্যাস নিজের অন্য লেখালেখি থেকে অনেকটাই অন্য রকম হওয়ায় তখন তা পড়তে দিয়েছিলেন মুম্বইবাসী শরদিন্দুকে, পড়ে তিনি বলেছিলেন “তোমার এই লেখায় জননী-জন্মভূমিকেই আমি সারাক্ষণ উপলব্ধি করলাম।”

তবে শংকরকে ঘরে ঘরে জনপ্রিয়তা এনে দেয় চৌরঙ্গী। কলকাতার অভিজাত হোটেলজীবনের আলো-অন্ধকারের অনন্য চিত্রণ পাঠকসমাজে বিপুল সাড়া ফেলে। তবু সংশয় থামেনি। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন— হাওড়ার অন্ধকার, বিদ্যুৎবিহীন গলির ঘরে বসে পাঁচতারা হোটেলজীবনের এত জীবন্ত চিত্র কীভাবে লেখা সম্ভব? এমনও অভিযোগ ওঠে, বিদেশি কোনও অখ্যাত ইংরেজি বই থেকে নাকি তিনি উপাদান নিয়েছেন।

পরবর্তীতে তাঁর কলম থেকে একের পর এক সৃষ্টি – “সীমাবদ্ধ”, “জন অরণ্য”, “নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি”, “সম্রাট ও সুন্দরী”, “চরণ ছুঁয়ে যাই” – বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। সাহিত্য আকাদেমি, বঙ্কিম পুরস্কার-সহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর কলমের শক্তি এবং পাঠকের অকুণ্ঠ ভালোবাসা শংকরকে প্রতিষ্ঠা দেয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারিতে। একজন লেখকের কাছে পাঠকের এই স্বীকৃতিই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

শংকরের সাহিত্যকর্মের প্রভাব বাংলা চলচ্চিত্রেও সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর একাধিক উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য ছবি। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেন “সীমাবদ্ধ ” ও “জন অরণ্য” – নাগরিক জীবনের অন্তর্গত অবক্ষয় ও মানসিক সংকটের গভীর দলিল হিসেবে যেগুলি বিশেষভাবে সমাদৃত। অন্যদিকে পরিচালক পিনাকিভূষণ মুখোপাধ্যায় নির্মাণ করেন চৌরঙ্গী। সেই ছবিতে উত্তম কুমার অভিনীত ‘স্যাটা বোস’ চরিত্রটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এছাড়া প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্বর্গীয় ঋত্বিক ঘটক শংকরের কত অজানারে  অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন, তবে সেই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

২০১৫ সালে ৮১ বছর পূর্তিতে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মস্মৃতিমূলক গ্রন্থ “একা একা একাশি”। পরবর্তীতে অনুবাদক অরুণাভ সিংহ’র ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে বইটি আন্তর্জাতিক পাঠকমহলেও সমাদৃত হয়। উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ-অনুসন্ধান— নানা ধারার রচনায় তিনি ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে আলোকবর্তিকার মতো ব্যবহার করেছেন। এই অনুবাদের ফলে তাঁর সাহিত্যভুবন আরও বিস্তৃত পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে যায় এবং তাঁর জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা লাভ করে।

পুরস্কার, সম্মান বা খ্যাতির গণ্ডি পেরিয়ে মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ছিলেন মূলত গল্পের সাধক। জীবনের অতি সাধারণ অভিজ্ঞতাকেও তিনি রূপ দিয়েছিলেন সময়ের স্পন্দিত দলিলে। তাঁর কলমে শহর ছিল জীবন্ত, মানুষ ছিল বহমান, আর জীবন ছিল নিভে গিয়ে আবার জ্বলে ওঠা আলোর মতো ঠিক যেমনটা তিনি বলেছিলেন ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের শেষে – শাজাহান হোটেলের লাল আলোগুলো তখনও জ্বলছে, নিভছে।

চৌরঙ্গীতে শংকর লিখেছিলেন শাজাহানের প্রতিটি ইঁটের মধ্যে এক একটি উপন্যাস লুকিয়ে আছে। সেই উক্তির মতোই তাঁর প্রতিটি রচনার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে জীবন, সময় আর মানুষের অনির্বচনীয় গল্প। তাই লেখক চলে গেলেও, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়েই তিনি চিরদিন ভাস্বর হয়ে থাকবেন পাঠকের হৃদয়ে।

“পৃথিবীর পথে ঘুরে-ঘুরে আমার ভিতরটা মরুভূমি হয়ে গিয়েছে। দুনিয়ার মানুষের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হলে বুকের মধ্যে মরুভূমিই দরকার – মনে রাখবেন মরুভূমির পথে কাদা থাকে না, পিছলে পড়ার সম্ভাবনা অনেক কম।” – মুক্তির স্বাদ, শংকর

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles