বাংলাস্ফিয়ার: অবশেষে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) জবাবে হলফনামা জমা পড়েছে সুপ্রিম কোর্টে যদিও এর পরেও পরবর্তী শুনানির দিন কেন এক মাস পিছিয়ে দেওয়া হোল সেই রহস্যের কিনারা হয়নি।
রাজ্যের পক্ষে জমা দেওয়া হলফনামায় দাবি করা হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তল্লাশি চলাকালীন আইপ্যাকের অফিস ও সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে দফতর থেকে কিছু নথি নিয়ে গেলেও সংস্থার তাতে কোনও আপত্তি ছিল না। কিন্তু ইডি বলেছে, ওই নথিপত্র একবার তল্লাশির স্থান থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে যে সেগুলি শুধুই তৃণমূল কংগ্রেসের গোপন দলিল ছিল নাকি কয়লা কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও ছিল।
নিজেদের রিট আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংস্থাটি যুক্তি দিয়েছে যে এই আবেদন দুটি শ্রেণির মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন তোলে—প্রথমত সাধারণ নাগরিক, যাদের জনশৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের অধিকার রয়েছে; দ্বিতীয়ত ইডির আধিকারিকেরা, যাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দায়িত্ব পালনের সময় অবাধে চলাচলের অধিকার সংবিধানপ্রদত্ত। ইডির দাবি, অর্থপাচারবিরোধী আইন সঠিকভাবে কার্যকর হওয়া প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকারসংশ্লিষ্ট বিষয়। ফলে কোনও বৈধ তল্লাশিতে বাধা দেওয়া মানে আইনের শাসন ও সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধিকার লঙ্ঘন। তাদের বক্তব্য, এই মামলায় অবৈধ খনির কয়লা পাচারের সম্ভাব্য শিকার আসলে সাধারণ মানুষ, যাদের ন্যায্য তদন্ত পাওয়ার অধিকার আছে।
ইডি আরও বলেছে, তাদের আধিকারিকদের ভয় দেখানো, বলপ্রয়োগ, বেআইনি আটক বা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে তদন্তে বাধা দেওয়া হলে তা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের সামিল। সংস্থার মতে, আদালত ইতিমধ্যেই নোটিস জারি করে ইডি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপে স্থগিতাদেশ দিয়েছে এবং পর্যবেক্ষণ করেছে যে হস্তক্ষেপ না করলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে।এই অবস্থায় মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি টেকে না।
রাজ্যের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ হওয়ায় বিষয়টি সংবিধানের ১৩১ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়া উচিত। ইডি তার জবাবে বলেছে, এটি কোনও ফেডারেল বিরোধ নয় বরং রাজ্যের কিছু আধিকারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগযোগ্য অপরাধ ও ক্ষমতার প্রকাশ্য অপব্যবহারের অভিযোগে এফআইআর নথিভুক্ত করার দাবি। তাদের যুক্তি, এফআইআর নথিভুক্ত হওয়ার আগে অভিযুক্তদের শুনানি পাওয়ার অধিকার নেই, এই অবস্থান তারা সুপ্রিম কোর্টের Union of India v. W.N. Chadha এবং Anju Chaudhary v. State of UP মামলার রায়ের ভিত্তিতে জানিয়েছে। বর্তমানে তারা চূড়ান্ত রায় নয়, শুধু অভিযোগগুলি প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না এবং তা কোনও জ্ঞাত অপরাধের ইঙ্গিত দেয় কি না এই বিষয়টিই বিবেচনার অনুরোধ করেছে।
তল্লাশিতে রাজ্য পুলিশের হস্তক্ষেপের যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, সশস্ত্র ভুয়ো কেন্দ্রীয় আধিকারিকেরা ঢুকেছে এমন খবর পেয়ে তারা সেখানে গিয়েছিল। ইডি এই ব্যাখ্যাকে ‘ছদ্ম অজুহাত’ বলে আখ্যা দিয়ে দাবি করেছে যে তাদের আধিকারিকেরা পরিচয়পত্র ও তল্লাশির অনুমতিপত্র দেখিয়েছিলেন। তবু রাজ্য পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে সক্রিয় তল্লাশি চলা স্থানে প্রবেশে সহায়তা করে এবং সেখান থেকে নথি সরিয়ে নেওয়া হয় যাকে তারা ‘অভিযোগযোগ্য চুরি’ বলেছে।
রাজ্যের দাবি ছিল, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই ইডিকে ভেতরে ঢোকার অনুরোধ করেছিলেন এবং আপত্তি ছাড়াই কিছু ডিজিটাল ডিভাইস ও নথি নিয়ে যান। এর উত্তরে সংস্থাটি বলেছে, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।শারীরিক সংঘর্ষ এড়াতে বাধ্য হয়েই তাদের তল্লাশি শেষ করতে হয়। হলফনামায় আরও বলা হয়েছে, বহু সংখ্যক পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকের উপস্থিতি এক ধরনের শক্তি প্রদর্শনের পরিবেশ তৈরি করেছিল যার মধ্যে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও নথি সরিয়ে নেওয়া হয়। সাধারণ পরিস্থিতিতে কোনও তদন্তকারী সংস্থা চলমান তল্লাশির স্থানে তৃতীয় পক্ষকে ঢুকে প্রমাণ নিয়ে যেতে দিত না বলেও তারা মন্তব্য করেছে।
এছাড়া যে পঞ্চনামায় তল্লাশি শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে উল্লেখ ছিল, সেটিও চাপ ও ভয়ের পরিবেশে লেখা হয়েছিল বলে ইডির দাবি। তাদের বক্তব্য, সেখানে ‘শান্তিপূর্ণ’ শব্দটির অর্থ কেবল এটুকুই যে ইডি আধিকারিকেরা নিজেরা কোনও বলপ্রয়োগ করেননি কিন্তু কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের উপস্থিতির কারণে পরিস্থিতি ছিল ভীতিপ্রদ। শেষ পর্যন্ত সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, কয়েকজন উত্তরদাতার হলফনামায় মুখ্যমন্ত্রীর নিয়ে যাওয়া ফাইলগুলির উল্লেখ নেই যা পক্ষপাত ও তথ্যগত অসঙ্গতির ইঙ্গিত বহন করে।