Home সুমন নামা নাভালনি স্মরণ, ব্যাঙের বিষপ্রয়োগে হত্যার অভিযোগ পুতিনের বিরুদ্ধে

নাভালনি স্মরণ, ব্যাঙের বিষপ্রয়োগে হত্যার অভিযোগ পুতিনের বিরুদ্ধে

0 comments 27 views

বাংলাস্ফিয়ার: রাশিয়ার বিরোধী নেতা অ্যালেক্সেই নাভালনির দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে রাজধানী মস্কোর বোরিসোভো কবরস্থানে শত শত মানুষ নীরবে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গিয়েছে। ডিটেনশনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, রাশিয়ার শহর ভ্লাদিভোস্তক, নভোসিবির্স্ক এবং বারনাউলেও মানুষ নাভালনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।
“জনসমক্ষে আমাদের একত্রিত হওয়ার অবশিষ্ট হাতেগোনা উপায়গুলোর মধ্যে এটি একটি। ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে। নাভালনির পক্ষে…”— টেক্সট মেসেজে এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা জানান ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নাস্তিয়া। গত সোমবার, ১৬ই ফেব্রুয়ারি, আরও শত শত মস্কোবাসীর সঙ্গে তিনিও বোরিসোভো সিমেট্রি গিয়েছিলেন নাভালনির মৃত্যুর দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করতে। সেখানেই শায়িত রয়েছে তাঁর মরদেহ। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ায় তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ অ্যালেক্সেই নাভালনির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা আইনত নিষিদ্ধ নয়। তবে নাভালনির আন্দোলনের প্রতি যেকোনো জনসমর্থন প্রদর্শন কার্যত দণ্ডনীয় অপরাধ, কারণ তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলোকে সরকারিভাবে “চরমপন্থী” ও “সন্ত্রাসবাদী” হিসেবে ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তাই এদিন বিরোধীদের নীরবে ফুল অর্পণ করতে দেখা গিয়েছে।কবরস্থানের প্রবেশপথে ছিল পুলিশ ও ক্রেমলিনপন্থী সমর্থকদের কড়া নজরদারি। শোকজ্ঞাপনকারীদের মধ্যে ছিলেন আলেক্সেই নাভালনির মা ল্যুদমিলা নাভালনায়া এবং তাঁর শাশুড়ি আল্লা আব্রোসিমোভা।
শোকজ্ঞাপনকারী নাস্তিয়া বলেন, “তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের সাহসী একজন মানুষ, একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক, যিনি কেবল নিজের দেশে স্বাধীনতা আর শান্তির আকাঙ্ক্ষা করার কারণেই প্রাণ হারিয়েছেন। এখানে আমরা সবাই একই আদর্শের অংশীদার।” এখানে বলতে তিনি বোরিসোভো সিমেট্রিকেই বোঝান, যা ক্রেমলিন থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। এই উপশহর এলাকাতেই ২০২০ সালের আগস্টে সাইবেরিয়ায় বিষপ্রয়োগের ঘটনার আগে নাভালনি পরিবার বসবাস করত। জার্মানিতে দীর্ঘ কয়েক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মস্কো ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নাভালনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৪ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ৪৭ বছর বয়সে, রাশিয়ার সুদূর উত্তরের একটি কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। চরমপন্থা সংক্রান্ত অভিযোগে ১৯ বছরের সাজা ভোগ করতে তাঁকে মৃত্যুর দুই মাস আগে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। সরকারিভাবে তার মৃত্যুকে হঠাৎ অসুস্থতা বলা হলেও সমর্থকরা শুরু থেকেই হত্যার অভিযোগ তুলেছেন। নতুন করে যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস যৌথভাবে দাবি করেছে—নাভালনির দেহ থেকে সংগৃহীত নমুনায় অত্যন্ত বিষাক্ত পদার্থ এপিবাটিডিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গত শনিবার মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে তারা একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। সেখানে নাভালনির মৃত্যুর পর রাশিয়া থেকে গোপনে বের করে আনা নমুনার ওপর পরিচালিত তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বেশ কয়েকটি স্বাধীন গবেষণাগার তার নমুনায় ‘এপিবাটিডিন’ (Epibatidine) শনাক্ত করেছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, ডার্ট ফ্রগ হলো এক ধরনের ছোট আকারের, উজ্জ্বল রঙের ব্যাঙ যা মূলত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার রেইনফরেস্টে পাওয়া যায়। এদের শরীরের ত্বকে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক বিষ থাকে। আদিম যুগে শিকারিরা এই বিষ তীরের অগ্রভাগে ব্যবহার করে শিকার করতে বলে জানা যায়। এটি শরীরে তীব্র অসাড়তা, পক্ষাঘাত, চেতনা হারানো, খিঁচুনি, কোমা এবং পরিণামে মৃত্যু ঘটায়।

 

“রাশিয়ার কারাগারে নাভালনি বন্দি থাকা অবস্থায় এই বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেবল রুশ সরকারেরই সক্ষমতা, উদ্দেশ্য এবং সুযোগ ছিল,” জার্মানির মিউনিখে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সম্মেলনে বলেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার। এভাবে তারা নাভালনির মৃত্যুর জন্য সরাসরি মস্কোকে দায়ী করেছে। লন্ডন এই বিষপ্রয়োগের বিষয়টি রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থাকেও (OPCW) জানিয়েছে। বিবৃতিতে দেশগুলো জানায়, এই বিষটি মস্কোর ‘রাষ্ট্রীয় জৈব রসায়ন ও প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে’ (GosNIIOKhT) সংশ্লেষিত করা হয়েছিল, যার গবেষকরা ২০১৩ সালেই এপিবাটিডিন নিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। এই একই প্রতিষ্ঠান “নভিচক” নামের স্নায়ুবিষ তৈরি করেছিল যা ২০২০ সালে নাভালোনির ওপর প্রয়োগ করা হয়। ক্রেমলিন এসব অভিযোগ “পক্ষপাতদুষ্ট ও ভিত্তিহীন” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে নাভালনির মা ল্যুদমিলা নাভালনায়া বলেছেন “কিন্তু এটি সেই সত্যটিকেই নিশ্চিত করে যা আমরা প্রথম থেকেই জানতাম: আমাদের ছেলে কেবল জেলেই মারা যায়নি, তাকে খুন করা হয়েছে। ” অন্যদিকে তার বিধবা স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া প্যারিস থেকে জানান, “এই হত্যাকাণ্ড এখন বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রমাণিত।”

বোরিসোভো সিমেট্রিতে এদিন সমবেত রুশদের মধ্যে ক্ষোভ আর দৃঢ়তার এক মিশ্র প্রতিফলন দেখা গেছে। ৪৫ বছর বয়সী পিওতর বলেন, “এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড এখনো বিচারহীন। আলেক্সেই ভয় পাননি। তাঁকে হত্যা করে তারা আমাদের ভয় দেখাতে পারেনি। আমি এখানে এসেছি শোক ও ক্ষোভ থেকে—সেই কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে, যারা স্বাভাবিকতার সব বোধ হারিয়েছে।”
অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁদের উপস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব। উপস্থিতদের মধ্যে ইউক্রেনীয়রাও ছিলেন।
নিরাপত্তার কারণে কেউ কেউ সার্জিক্যাল মাস্ক পরে মুখ ঢেকেছিলেন। ৬০ বছর বয়সী ইরিনা বলেন, “নাভালনি অন্য এক রাশিয়ার স্বপ্ন দেখতেন। আমি যদি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতাম, তিনিই হতেন আমাদের প্রেসিডেন্ট!” সারা দেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি নাভালনির সমাধিতে বিশাল একটি ফুলের তোড়া অর্পণ করেন। তাঁর কথায়, “ক্রমবর্ধমান দমনের মুখে আমাদের হাতে বিকল্প কম। এখানে আসা আমাদের শক্তি জোগায়। প্রতি বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি আমি আসব, নাভালনিকে স্মরণ করতে এবং পুতিনের নীতিকে ‘না’ বলতে।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles