বাংলাস্ফিয়ার: কল্পনা করুন, মাঝরাতে আপনার ফোনের স্ক্রিনটা নীল-সাদা আলোয় জ্বলে উঠল। কোনও রক্ত-মাংসের প্রেমিকা নয়, স্বয়ং সরকারি প্রকল্প ‘যুবসাথী’ আপনার ইনবক্সে হানা দিয়েছে। নিচে রইল এক হতাশ বেকার যুবক এবং ডিজিটাল ‘যুবসাখী’র সেই কাল্পনিক চ্যাট।
চ্যাট উইন্ডো: বেকার বনাম যুবসাখী
বেকার যুবক: ওরে বাবা! রাত দুটোর সময় মেসেজ? কে রে ভাই?
যুবসাথী: ভয় পাস না রে পাগলা, আমি তোর ‘যুবসাখী’। নবান্নের সার্ভার থেকে সটান তোর ইনবক্সে ল্যান্ড করলাম।
কেমন আছিস?
বেকার যুবক: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আর কেমন থাকব? পকেটে গড়ের মাঠ, পেটে খিদে আর আলমারিতে এম.এ পাসের সার্টিফিকেটে আরশোলা বাসা বেঁধেছে। ইন্টারভিউ দিচ্ছি না ছাই, শুধু রিজেকশন লেটার জমছে।
যুবসাথী: আহারে! তুই তো বড্ড সেকেলে রে। এখনও ইন্টারভিউ-চাকরি এসব নিয়ে পড়ে আছিস? দেখ, আমি তোর জন্য কী এনেছি- মাসের ১ তারিখ মানেই তোর অ্যাকাউন্টে ১৫০০ টাকার ‘ভালোবাসা’।
বেকার যুবক: ১৫০০ টাকা? বন্ধু তুই বাজারে যাসনা? গেলে দেখতে পাবি এই টাকায় তো একটা ভালো জুতোর শুকতলাও হয় না। তুই আমায় ভালোবাসা জানাচ্ছিস না কি বিদ্রূপ করছিস!?
যুবসাথী: তুই শালা বড্ড অকৃতজ্ঞ! এই ১৫০০ টাকা দিয়ে তুই অন্তত দশটা সিঙাড়া আর এক কাপ চা খেতে পারিস প্রতিদিন। দিদিমণি চান না তুই ডায়েটিং করে শুকিয়ে যাস। তাছাড়া, এই টাকাটা হলো ‘সাইলেন্স মানি’।
বেকার যুবক: মানে?
যুবসাথী: মানে হলো, এই টাকাটা পাবি আর চুপচাপ ল্যাপটপের সামনে বসে থাকবি। রাজপথে গিয়ে ওই ‘চাকরি চাই’ বলে ব্যানার ধরবি না একদম! দেখছিস না রোদে কত কালো হয়ে যাচ্ছে ছেলেগুলো? তোর গায়ের রং তো নীল-সাদা হওয়ার কথা!
বেকার যুবক: কিন্তু বন্ধু আমি তো পড়াশোনা করেছিলাম বড় কোনও কোম্পানিতে কাজ করব বলে। এখন তুই বলছিস ১৫০০ টাকায় আমায় খুশি থাকতে হবে! রাত দুপুরে ফোন করে এভাবে চাটছিস কেন? সবাইকে তোর মতো চটি চাটা ভাবিস নাকি?
যুবসাথী: যা বলি মন দিয়ে শোন। উচ্চাশা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। তুই বরং আমার দেওয়া টাকা দিয়ে একটু বেসন আর আলু কেন। দিদিমণি তো বলেছেই, ‘চপ শিল্প’। তুই যদি চপ ভাজিস, তবে আমি তোর ‘পার্টনার’ হব। দোকানের নাম রাখবি ‘যুবসাথী তেলেভাজা সেন্টার’।’
বেকার যুবক: (মাথায় হাত দিয়ে) তুই তো দেখি আমার ভবিষ্যৎ চপের কড়াইতে চুবিয়ে মারবি! আমার তো বিয়ের বয়স হতে চলল। ১৫০০ টাকা দেখে কি কোনও মেয়ে বিয়ে করতে রাজি হবে?
যুবসাথী: কেন হবে না? তুই বলবি আমি ‘সরকারি বেতনভূক বেকার’। চাকরিজীবীরা রিটায়ার করে, কিন্তু বেকাররা অমর। আমি তোর সাথে আজীবন থাকব, যদি না তুই ভুল করে চাকরি পেয়ে যাস। চাকরি পেলেই কিন্তু আমাদের ‘ব্রেক-আপ’!
বেকার যুবক: তার মানে আমায় আজীবন ভিখারি হয়ে থাকতে হবে তোর সাথে রিলেশন রাখতে গেলে?
যুবসাথী: ভিখারি কেন? তুই হবি ‘ভাতা-নির্ভর স্বাধীন যুবক’। মাঝে মাঝে মিছিলে যাবি, একটু ঝান্ডা ধরবি, আর মাসে মাসে আমার মেসেজের অপেক্ষা করবি। এর চেয়ে রোমান্টিক আর কী হতে পারে?
বেকার যুবক: তোর ভালোবাসা আসলে একটা বিষাক্ত লজেন্স। চুষতে মিষ্টি লাগে, কিন্তু ভেতরে কোনো পুষ্টি নেই।
যুবসাথী: আহা, কাব্য করিস না তো! এখন যা, ঘুমিয়ে পড়। সকালে উঠে আবার ‘অ্যালেক্সার-৩’ ফর্মটা ফিলাপ করতে হবে তো? মনে রাখবি, তুই যত বেশি ‘অপদার্থ’ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করবি, আমি তোকে তত বেশি ভালোবাসব।
বেকার যুবক: আহা কী আনন্দ আর ধন্য তোর নবান্ন! গুড নাইট।
যুবসাথী: গুড নাইট। স্বপ্ন দেখিস যেন কাল সকালে আকাশ থেকে চাকরির বদলে ১৫০০ টাকার নোট ঝরছে! টা-টা!
পরিশিষ্ট: বেকারত্বের নতুন সংজ্ঞা
এই চ্যাট থেকেই স্পষ্ট, ‘যুবসাখী’ কোনো সাধারণ প্রকল্প নয়; এটি হলো বাংলার শিক্ষিত যুবকদের জন্য এক প্রকারের ‘ডিজিটাল হিপনোটাইজম’। যেখানে স্বপ্ন দেখার চেয়ে ভাতার লাইনে দাঁড়ানো বেশি লাভজনক বলে মনে করা হয়।