তিমিরেন্দু রায়চৌধুরি: বাংল আকাশ-বাতাসে এখন শুধু ‘ভাতা’র সুবাস। সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার আগেই শোনা যায় কার অ্যাকাউন্টে কত ঢুকলো। কিন্তু এই ভাতার মহাসমুদ্রে একটি দ্বীপ যেন চিরকালই নির্জন, ধুধু মরুভূমি যার নাম ‘বেকার ভাতা’ বা পোশাকি ভাষায় ‘যুবসাথী’। দিদিমণির উন্নয়নের সরণিতে বেকাররা হোল সেই ‘সৎ ভাই’, যাদের কপালে ছাই জোটে না, কিন্তু মাথায় আশীর্বাদের হাতটা সর্বদা থাকে।

১. দেড় হাজার টাকার মহিমা:
এক পকেটমারি দর্শন বেকারদের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দয়া অপরিসীম। মাসে ১৫০০ টাকা! ভাবা যায়? আজকের বাজারে যেখানে এক কেজি খাসির মাংসের দাম হাজার টাকা ছুঁইছুঁই, সেখানে এক মাস জীবন অতিবাহিত করার জন্য দিদি দিচ্ছেন ঠিক ততটুকুই, যাতে একটা বেকার যুবক অন্তত মাসশেষে দুটো ভালো মানের শ্যাম্পু আর এক প্যাকেট সস্তা বিড়ি কিনে নিজের ‘বেকারত্ব’ উদযাপন করতে পারে। এই ১৫০০ টাকা আসলে এক অদ্ভুত ‘টনিক’। এটি এমন এক পরিমাণ অর্থ, যা খেলে পেট ভরে না, আবার না খেলে সম্মানে লাগে। দিদি খুব ভালো করেই জানেন, বেকারদের পকেটে বেশি টাকা দিলে তারা আবার পড়াশোনা করে সরকারি চাকরির দাবি তুলে বসতে পারে। তার চেয়ে ভালো, ওদের হাতে এমন একটা লজেন্স ধরিয়ে দেওয়া হোক, যেটা চুষতে চুষতে ওরা নবান্নের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসবে।
২. এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ: এক নস্টালজিক মিউজিয়াম এককালে লোকে কর্মসংস্থান কেন্দ্রে নাম নথিভুক্ত করত চাকরির আশায়। এখন সেখানে নাম লেখানো মানে হলো এক অন্তহীন অপেক্ষার লাইনে দাঁড়ানো। যুবসাথী প্রকল্পের তালিকায় নাম আসা মানেই লটারি জেতা। তবে এই লটারি জেতার পর কাজ পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় শুধু ওই মাসিক কিস্তি। যাঁরা এই তালিকায় আছেন, তাঁদের জীবন এখন ‘অ্যানেক্সার-৩’ ফর্ম জমা দেওয়ার ঘেরাটোপে বন্দি। প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রমাণ দিতে হয় যে, “হ্যাঁ মা জননী, আমি এখনও বেকার আছি। আমি এখনও সরকারি চোর হইনি বা কর্পোরেট গোলাম হইনি।” এই যে নিজেকে বারবার ‘অপদার্থ’ হিসেবে প্রমাণ করার আনন্দ, এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া আর কে বাঙালির মজ্জায় ঢুকিয়ে দিতে পারতেন?
৩. চপ শিল্প বনাম বেকার ভাতা:
দিদিমণি বারবার বলেছেন, “সবাইকে কি সরকারি চাকরি দেওয়া সম্ভব?” এক্কেবারে খাঁটি কথা। সেই কারণেই তিনি নিয়ে এসেছেন ‘চপ শিল্প’। বেকার ভাতার ১৫০০ টাকা দিয়ে যদি তিনটে কড়াই আর পাঁচ কেজি বেসন কেনা যায়, তবে সেই বেকার আর বেকার থাকে না, সে হয়ে যায় ‘ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা’।
তীর্যকভাবে দেখলে, যুবশ্রী ভাতা আসলে একটি স্টার্ট-আপ ক্যাপিটাল। এই টাকা দিয়ে তেলেভাজা বিক্রি করে যদি কোটিপতি হওয়া না যায়, তবে সেটা সেই যুবকের বার্থতা, সরকারের নয়। দিদি তো পথ দেখিয়েই দিয়েছেন- আলুর দম থেকে ঘুগনি, সবখানেই সাফালার চাবিকাঠি। অথচ কিছু কুচুটে বেকার এখনও পিএসসি বা এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকে। দিদির মতে, তারা আসলে কাজ করতে চায় না, শুধু এসি ঘরে বসে ফাইল নাড়াতে চায়।
৪. ডিজিটাল বাংলার বেকার ‘ডেটা’:
বাংলার বেকাররা এখন ইন্টারনেটে খুব উন্নত। ১৫০০ টাকায় কত জিবি ডেটা কেনা যায়, তার নিখুঁত হিসেব
তাদের নখদর্পণে। দিদি জানেন, বেকারদের হাতে স্মার্টফোন থাকলে তারা ইউটিউবে ‘রান্নার রেসিপি’ বা ‘তৃণমূলের জনসভা’ দেখবে। এতে একদিকে যেমন বিনোদন হয়, অন্যদিকে বেকারত্বের জ্বালাও কমে। যুবসাথীর টাকা আসলে সেই ইন্টারনেটের রিচার্জ প্যাকেরই নামান্তর। সরকার আপনাকে চাকরি দেবে না ঠিকই, কিন্তু ফেসবুক করার জন্য ডেটাটুকু জোগাড় করে দেবে। এর চেয়ে বড় গণতন্ত্র আর কী হতে পারে?
৫. বিরোধীদের জ্বালা ও দিদির হাসিমুখ:
বিরোধীরা চিৎকার করে বলবে “চাকরি কোথায়? নিয়োগ দুর্নীতি কেন?” দিদি তখন একগাল হেসে বলবেন, “ওরা সব কুৎসা করছে। আমি তো বেকারদের টাকা দিচ্ছি।” আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি হলো ‘ম্যাজিক’। একদিকে হাজার হাজার শূন্যপদ ফাঁকা পড়ে থাকবে, যোগ্য প্রার্থীরা রাস্তায় বসে আন্দোলন করবে, আর অন্যদিকে যুবককে ১৫০০ টাকা দিয়ে কয়েক লাখ যুবককে একটা ঘোরের মধ্যে রাখা হবে।
এই ঘোরটা অনেকটা সেই রূপকথার ঘুমের দেশের মতো। যেখানে সবাই জানে যে তারা বঞ্চিত, কিন্তু পকেটে ওই সামান্য টাকার মৃদু শব্দ শুনে তারা ভাবছে- “যাক গে, দিদি অন্তত মনে তো রেখেছেন!”..
৬. উপহাসের উপসংহার:
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেকার ভাতা আসলে বাংলার যুবসমাজের জন্য এক ডিজিটাল সান্ত্বনা পুরস্কার। মেধা যেখানে বিক্রি হয় হাজারে হাজারে, সেখানে ১৫০০ টাকা হোল ক্ষতের ওপর একটা পাতলা ব্যান্ডেজ। এই ব্যান্ডেজ ক্ষত সারায় না, বরং সেটাকে আড়াল করে রাখে। ভবিষ্যতে হয়তো এই প্রকল্পের নাম বদলে ‘বেকার গৌরব’ রাখা হবে। সেদিন বেকাররা গর্ব করে বলবে, “আমরা কর্মহীন হতে পারি, কিন্তু আমরা দিদির নথিভুক্ত বেকার!” নীল-সাদা রঙে রাঙানো বাংলায় বেকারত্ব এখন আর অভিশাপ নয়, বরং এটি একটি ‘যোগ্যতা’, যার বিনিময়ে’ প্রতি মাসে নবান্ন থেকে একটি মিষ্টি বার্তা আসে- “খেলা হবে!”