বাংলাস্ফিয়ার: ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি (আরআইএন) বিদ্রোহের ৮০তম বার্ষিকী-একটি স্বল্পস্থায়ী সশস্ত্র অভ্যুত্থান, যা বম্বের নৌবাহিনীর ব্যারাক থেকে শুরু হয়ে দ্রুত শহরের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে এবং জনসমর্থন অর্জন করে। আশি বছর পরে, দক্ষিণ এশিয়ায় যখন সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে, তখন এই স্বল্পস্থায়ী বিদ্রোহটির তাৎপর্য নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি।

বিক্ষোভ না বিদ্রোহ
এই ঘটনাকে কেবল নৌসেনাদের শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অবাধ্যতার স্থানীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করে ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা একে প্রায়শই ‘মিউটিনি’ বলে বর্ণনা করেছিলেন কারণ এতে নাকি কেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব ও সমন্বয়ের অভাব ছিল। কিন্তু ১৮ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারির ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত বিবরণই এই তথাকথিত ‘মিউটিনি’র প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝাতে যথেষ্ট।
১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বের এইচএমআইএস তালওয়ার নৌঘাঁটিতে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির শত শত রেটিং অনশন ধর্মঘট শুরু করলে ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটে। তারা নিম্নমানের খাদ্য, কম বেতন এবং ব্রিটিশ অফিসারদের বর্ণবিদ্বেষী আচরণের প্রতিবাদে এই পদক্ষেপ নেয়। ধর্মঘটের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্যাসল ও ফোর্ট ব্যারাকসহ তীরবর্তী নৌ-ঘাঁটিগুলির কর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেয় এবং বম্বে বন্দরে নোঙর করা ২২টি জাহাজও কর্মবিরতিতে যোগ দেয়। সুভাষ চন্দ্র বসুর প্রতিকৃতি নিয়ে নৌসেনারা শহরে মিছিল বের করে, তাদের জাহাজে কংগ্রেস, মুসলিম লিগ ও কমিউনিষ্ট পার্টির পতাকা উত্তোলন করে। ধর্মঘটের অল্প পরেই গঠিত নৌ-কেন্দ্রীয় ধর্মঘট কমিটি তাদের অভিযোগের সঙ্গে বৃহত্তর জাতীয় দাবিও যুক্ত করে দেয়। যেমন আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দিদের মুক্তি।
২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোটামুটি শান্তিপূর্ণ অনশন ধর্মঘট শহরের ভিতরে সংক্ষিপ্ত সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। ব্রিটিশ সেনারা গুলি চালালে ব্যারাকের ভিতরে নৌসেনারা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পাল্টা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এটাই ছিল সংঘর্ষের চূড়ান্ত মুহূর্ত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয়; বিদ্রোহী জাহাজগুলো তীরে থাকা সহযোদ্ধাদের রক্ষা করতে কামান প্রস্তুত রাখে। পরবর্তী পাঁচ দিনে এই বিদ্রোহ করাচি ও বম্বে থেকে শুরু করে মাদ্রাজ, কোচিন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, বিশাখাপত্তনম ও কলকাতা পর্যন্ত বিভিন্ন নৌঘাঁটিতে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে ৭৮টি জাহাজ, ২০টি তীরবর্তী ঘাঁটিতে-যার মধ্যে দিল্লির একটি ছাউনিও ছিল- প্রায় ২০ হাজার নৌসেনা এই বিদ্রোহে অংশ নেয়।
ভারতের ঔপনিবেশিক মুক্তিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হয়েও এই ঘটনাটি জনস্মৃতিতে প্রায় মুছেই গেছে বলা চলে কারণ খুব শিগগিরই তা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং দেশভাগের হিংস্রতার অতলে চাপা পড়ে যায়।
ঐক্যের মুহূর্ত
এই বিদ্রোহের গুরুত্ব মূল্যায়নের সময় প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট। ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বরে সিমলা বৈঠক ভেঙে যাওয়ার পর থেকে দেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল। বম্বেও তার ব্যতিক্রম ছিল না, সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরআইএন বিদ্রোহ চলাকালীন স্বল্পস্থায়ী হলেও এক নজিরবিহীন সাম্প্রদায়িক ঐক্যের প্রদর্শনও দেখা যায়। ব্রিটিশ সেনা ও নৌসেনাদের সংঘর্ষের পর হিন্দু ও মুসলিম প্রতিবাদকারীরা একসঙ্গে রাস্তায় নেমে বিদ্রোহীদের ওপর গুলিচালনার প্রতিবাদে হরতালের আহ্বান জানায়। সেই বিকেলে জনতা পোস্ট অফিসে হামলা চালায়, ট্রামলাইনের পাটাতন তুলে ফেলে।
২২ ফেব্রুয়ারি এই পারস্পরিক সংহতি রূপ নেয় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে। শ্রমিক, ছাত্র এবং দরিদ্র মানুষ নৌসেনাদের সমর্থনে রাস্তায় নেমে শহরে শাসনক্ষমতা প্রয়োগের ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তারা মিছিল বের করে, পাথর ও ব্যারেল দিয়ে বিভিন্ন এলাকা ব্যারিকেড করে এবং যানবাহন চলাচল ব্যাহত করতে বাস ও সামরিক যানবাহনে আগুন ধরায়। কংগ্রেসের আগের আন্দোলনগুলিতে তুলনামূলকভাবে নীরব থাকা মুসলিম মহল্লাগুলো এই গণঅভ্যুত্থানের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। মুসলিম পাড়াগুলো পাহারা দিতে শুরু করে হিন্দুরা এবং এই মিছিলগুলো হিন্দু-মুসলিম এলাকাজুড়ে ঘুরে বেড়ায় যেখানে সাধারণ মানুষ ত্রিবর্ণ পতাকা, লিগের পতাকা ও কমিউনিষ্ট পতাকা বহন করে অপেক্ষমান ছিল।
বম্বের মিল-এলাকাগুলি এই বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। সমস্ত টেক্সটাইল মিল, রেলওয়ে কর্মশালা ও অন্যান্য কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, স্কুল-কলেজও বন্ধ হয়। শ্রমিকরা এই সব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে পুলিশ স্টেশন জ্বালিয়ে দেয় এবং টহলরত পুলিশ ও ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে রাস্তায় সংঘর্ষে জড়ায়, যার ফলে বহু হতাহত হয়েছিল। এই গণঅভ্যুত্থান দমনে ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীর ব্যাটালিয়ন ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে।
কামাঠিপুরা ও মাদানপুরায় তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম শ্রমিকরা ব্যারিকেড গড়ে অগ্রসরমান ব্রিটিশ বাহিনীর দিকে পাথর ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এরপর মেশিনগান ও বেয়নেটধারী ব্রিটিশ সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এই অসম লড়াইয়ে প্রায় ২০০ দরিদ্র শ্রমজীবী নিহত হয় এবং আরও শত শত আহত হয়। এত ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের পরও নৌসেনারা ২৩ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পণ করার সময় পর্যন্ত ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কয়েক দিন শহর ও মিল এলাকাগুলি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।
অম্লান উত্তরাধিকার
সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঘূর্ণাবর্তের মাঝেও ১৯৪৬ সালের আরআইএন বিদ্রোহ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক অনন্য মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয়, যাকে প্রখ্যাত প্রগতিশীল কবি সাহির লুধিয়ানভি বর্ণনা করেছিলেন এভাবে: “ঝলসে যাওয়া বিরান বাগানে আশা-ভরসার একটি ফুল ফুটেছিল।” ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্বে সৈনিক, শ্রমিক ও কৃষকদের যে একাধিক স্থানীয় কিন্তু প্রায়শই মিলিট্যান্ট ও ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, আরআইএন বিদ্রোহ ছিল তারই অংশ, যেগুলি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কঠিন প্রাচীর অতিক্রম করতে পেরেছিল।
আজ, আশি বছর পরে, এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যুদ্ধোত্তর যুগের ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততার ভারে চাপা পড়েও জনসমাজের সংহতির সম্ভাবনা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি।