- বাংলাস্ফিয়ারঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় হঠাৎ এক ধরনের নীরব কম্পন অনুভূত হচ্ছে। ঘোষণা হয়েছে বেকারদের জন্য ভাতা। ঘোষণা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অঙ্ক এখনও পরিষ্কার নয়, কাঠামো সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়নি, অর্থের উৎস অজানা। কিন্তু তাতে ঘোষণা থেমে থাকে না। বরং রাজনৈতিক বার্তাটি পৌঁছে যায় দ্রুত সরকার যুবকদের কথা ভাবছে।
কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে চায়ের দোকানে আলোচনা চলছে। সল্টলেকের কোচিং সেন্টারে পরীক্ষার্থীরা হিসেব কষছে, কারা পাবেন, কবে পাবেন। মফস্বলের এক গ্র্যাজুয়েট, যিনি দু’বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায়, বলছেন, “চাকরি নেই, অন্তত কিছু তো দেবে।” সন্দেহও আছে, “নির্বাচনের আগে বলছে, পরে কী হবে?”
রাজনীতির ভাষা এখানে খুব সরল। নগদ বা নগদসম মূল্য এটাই সবচেয়ে স্পষ্ট সংকেত। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, জিডিপি বৃদ্ধির মতো বিমূর্ত শব্দ ভোটারদের মনে তেমন দাগ কাটে না। কিন্তু প্রতি মাসে অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকা, এই অভিজ্ঞতা তাদের স্পর্শ করে। যারা দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিতর্ক, আদালতে মামলা, পরীক্ষা
বাতিলের খবর শুনেছেন, তাদের কাছে এই ঘোষণা একধরনের মানসিক স্বীকৃতি: হ্যাঁ, সমস্যা আছে, সস্বকার জানে।
কিন্তু আরেকটি প্রশ্ন একইসঙ্গে ভেসে ওঠে- টাকা কোথা থেকে আসবে? রাজ্যের আর্থিক অবস্থা নিয়ে বিরোধীরা বহুদিন ধরেই আক্রমণ করে আসছে। ঋণের বোঝা, সুদের দায়, সীমিত রাজস্ব, এই সব শব্দ রাজনৈতিক মঞ্চে ঘুরে বেড়ায়। অর্থ দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, বেতন, ভাতা, সুদ এবং সামাজিক প্রকল্প মিলিয়ে ব্যয়ের বড় অংশ আগেই নির্ধারিত। নতুন একটি স্থায়ী স্কিম মানে নতুন দায়। সেই দায় কি কর বাড়িয়ে মেটানো হবে? নাকি আরও ঋণ নিয়ে? নাকি অন্য খাতে কাটছাট করে?
সরকারি মহল থেকে এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা আসেনি। কতজন উপভোক্তা, শেষ পর্যন্ত কতদিন এই ভাতা পাওয়া যাবে, কী শর্তে, সবকিছু স্পষ্ট নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সময়সূচি স্পষ্ট। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, তত বেশি দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন হয়। বেকার ভাতা সেই দৃশ্যমানতার এক শক্তিশালী উপায়। এটি সরাসরি যুব ভোটব্যাঙ্ককে সম্বোধন করে, বিশেষত শহর ও মফস্বলের শিক্ষিত কিন্তু কর্মহীন প্রজন্মকে।
এই প্রজন্মের ক্ষোভ নীরব হলেও গভীর। বহুজনের বয়স সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ সীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ বেসরকারি
খাতে অস্থায়ী কাজ নিয়েছেন, কেউ কোচিং করাচ্ছেন, কেউ আবার ঘরে বসে পরবর্তী বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায়। তাদের কাছে ভাতা হয়তো স্থায়ী সমাধান নয়, কিন্তু তাৎক্ষণিক স্বস্তি। এবং রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক স্বস্তির মূল্য অনেক।
বিরোধীরা অবশ্য অন্য গল্প বলছে। তারা বলছে, এটি নির্বাচনী কৌশল, একটি ‘গিমিক’। তাদের যুক্তি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে নগদ বিতরণ সমস্যার মূলকে স্পর্শ করে না। তারা রাজ্যের আর্থিক অবস্থার কথা তুলে ধরে সতর্ক করছে, আজকের প্রতিশ্রুতি আগামী দিনে করদাতার বোঝা হতে পারে। কিন্তু এই যুক্তি কতটা ভোটারদের মনে প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করে সময় ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
কারণ রাজনীতিতে বিশ্বাসই আসল মুদ্রা। যদি মানুষ মনে করেন সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, তাহলে অর্থের উৎস নিয়ে অনিশ্চয়তা ততটা বাধা নয়। কিন্তু যদি পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা সন্দেহ তৈরি করে, তাহলে একই ঘোষণা সংশয় জাগায়। পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক বছরে নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্ক সেই বিশ্বাসের ওপর প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। ফলে বেকার ভাতার ঘোষণা একইসঙ্গে আশা ও সংশয়ের জন্ম দিচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে চিত্র কিছুটা আলাদা। সেখানে সামাজিক প্রকল্পের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, লক্ষ্মীর
ভাণ্ডার, এই সব প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ভোটারদের মনে আছে। অনেকেই বলছেন, “আগেও দিয়েছে, এবারও দেবে।” এই ধারাবাহিকতার অনুভূতি শাসকদলের পক্ষে কাজ করতে পারে। কারণ একবার যদি নগদ সহায়তার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে নতুন প্রকল্প সেই ধারাবাহিকতার অংশ হয়ে যায়।
তবু অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতা থেকে পালানো যায় না। যদি উপভোক্তার সংখ্যা বড় হয়, ব্যয়ও বড় হবে। আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে হয় নতুন রাজস্ব উৎস খুঁজতে হবে, নয়তো অগ্রাধিকার বদলাতে হবে। প্রশাসনের ভেতরে এই হিসেব নিশ্চয়ই চলছে। কিন্তু জনসমক্ষে এখনও সেই অঙ্ক উন্মুক্ত নয়।
ভোটে প্রভাবের প্রশ্নে একটি বিষয় স্পষ্ট, এই ঘোষণা আলোচনার কেন্দ্র দখল করেছে। বিরোধীদের এজেন্ডা সরিয়ে দিয়ে এটি নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এখন আলোচনা হচ্ছে, কত টাকা, কবে, কারা পাবে। অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও রাজনৈতিক বার্তাটি ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে।
শেষ পর্যন্ত, এই প্রতিশ্রুতি ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতির ওপর। যদি নির্বাচনের আগেই কিছু উপভোক্তা অর্থ পান, প্রভাব দৃশ্যমান হবে। যদি কেবল ঘোষণা স্তরেই থাকে, তাহলে তা প্রতিশ্রুতির ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক অদ্ভুত সঙ্কটে দাঁড়িয়ে, একদিকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের দাবি, অন্যদিকে তাৎক্ষণিক সহায়তার আকাঙ্ক্ষা। বেকার ভাতার ঘোষণা এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে একটি সেতু নির্মাণের চেষ্টা। সেতুটি কতটা মজবুত, তা সময়ই বলবে। কিন্তু আপাতত ঘোষণা নিজেই একটি রাজনৈতিক ঘটনা এবং নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ঘটনাই কখনও কখনও ফল নির্ধারণ করে দেয়।
কত হলে কত ব্যয়
মাসিক ভাতা = ২১,৫০০
প্রতি ব্যক্তির বার্ষিক ভাতা =১৮,০০০
অতএব মোট বার্ষিক ব্যয় = (উপভোক্তার সংখ্যা) ×₹ ১৮,০০০
নিচে ১০ লাখ থেকে ১ কোটি পর্যন্ত, প্রতি ৫ লাখ বৃদ্ধি ধরে বার্ষিক মোট ব্যয় দেওয়া হলো:
১০ লাখ – ₹১,৮০০ কোটি
১৫ লাখ – ₹ ২,৭০০ কোটি
২০ লাখ – ₹ ৩,৬০০ কোটি
২৫ লাখ – ₹ ৪,৫০০ কোটি
৩০ লাখ – ₹ ৫,৪০০ কোটি
৩৫ লাখ -₹ ৬,৩০০ কোটি
৪০ লাখ – ₹ ৭,২০০ কোটি
৪৫ লাখ – ₹ ৮,১০০ কোটি
৫০ লাখ – ₹ ৯,০০০ কোটি
৫৫ লাখ – ₹ ৯,৯০০ কোটি
৬০ লাখ – ₹ ১০,৮০০ কোটি
৬৫ লাখ – ₹১১,৭০০ কোটি
৭০ লাখ – ₹ ১২,৬০০ কোটি
৭৫ লাখ – ₹ ১৩,৫০০ কোটি
৮০ লাখ – ₹ ১৪.৪০০ কোটি
৮৫ লাখ – ₹ ১৫. ৩০০ কোটি
৯০ লাখ – ₹ ১৬,২০০ কোটি
৯৫ লাখ – ₹ ১৭,১০০ কোটি
২ কোটি – ₹ ১৮,০০০ কোটি
একটি সরল পর্যবেক্ষণ
প্রতি অতিরিক্ত ৫ লাখ উপভোক্তা যোগ হলে বার্ষিক ব্যয় বাড়বে ₹৯০০ কোটি করে ( কারণ ৫ লাখ × ₹১৮,০০০= ₹৯০০ কোটি)