বাংলাস্ফিয়ার: বকেয়া মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ (ডিএ) মামলায় বড় জয় পেল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মচারীরা। ৫ই ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়েছে, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সময়কালের জন্য রাজ্য সরকারী কর্মীরা ২০০৯-এর পশ্চিমবঙ্গ পরিষেবা (বেতন ও ভাতা সংশোধন) বিধি অনুযায়ী ডিএ পাওয়ার অধিকারী। বিচারপতি সঞ্জয় করোল ও প্রশান্ত কুমার মিশ্রর বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই ডিএ গণনা করতে হবে অল-ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রাইজ ইনডেক্স (এআইসিপিআই) অনুসারেই। আদালতের পর্যবেক্ষণ, একবার বিধিসংগত নিয়মে ডিএ-কে এআইসিপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত করা হলে, পরবর্তীতে স্রেফ একটি অফিস মেমোরান্ডামের মাধ্যমে রাজ্য সরকার সেই গণনার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ডিএ-র প্রকৃতি ব্যাখ্যা করে কড়া এক পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। বিচারপতিরা জানান, “মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ তার স্বভাবেই স্থির নয়, বরং এটি পরিবর্তনশীল। আর সেই পরিবর্তনের মাপকাঠি হলো অল-ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রাইজ ইনডেক্স বা এআইসিপিআই।” আদালতের মতে, রাজ্য সরকারের জারি করা মেমোরান্ডামগুলো ত্রুটিপূর্ণ, কারণ সেখানে ডিএ নির্ধারণের প্রধান শর্ত এআইসিপিআই-এর কোনো উল্লেখ ছিল না।
বিচারপতিদের স্পষ্ট বক্তব্য, “এই এআইসিপিআই-এরই ওপর মোট বেতন-ভাতার পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। তাই, ডিএ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি একেবারে অপরিহার্য। একবার যখন ডিএ-কে এআইসিপিআই-র মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তখন একে এককালীন ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা যায় না। আইনি পথে হাঁটার পর অন্য কোনো ভিন্ন পথ গ্রহণ করা আইনের দৃষ্টিতে একেবারেই অনুমোদনযোগ্য নয়।”
কলকাতা হাইকোর্টের রায়কে আংশিকভাবে বহাল রাখল দেশের শীর্ষ আদালত। বিচারপতিরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ২০০৯ সালের বেতন ও ভাতা সংশোধন বিধি (রোপা) অনুযায়ী মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্থায়ী কর্মচারীদের একটি ‘আইনি অধিকার’। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ১৯৮২-কে ভিত্তি বর্ষ ধরে এআইসিপিআই-এর গড় অনুযায়ী এই ডিএ প্রদান করতে হবে। তবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের আপিল আংশিকভাবে মঞ্জুর করে আদালত জানিয়েছে, সরকারি কর্মচারীরা বছরে দু’বার ডিএ দাবি করতে পারবেন না। উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে পঞ্চম বেতন কমিশন গঠনের পর ২০০৯-এর ‘রোপা’ বিধি অনুযায়ী ডিএ প্রদান নিয়ে এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে স্পষ্ট হলো যে, ডিএ আর কোনো ‘দয়া’ নয়, বরং তা বিধিসম্মত পাওনা।
২০১৬ সালে কর্মচারী ইউনিয়নগুলি পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনিক ট্রাইবুনালের (এসএটি) দ্বারস্থ হয়ে অভিযোগ করে, রোপা ২০০৯-এ ডিএ-কে এআইসিপিআই-এর গড় ৫৩৬ (১৯৮২=১০০)-এর সঙ্গে যুক্ত করা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া মেটানো হচ্ছে না। পাশাপাশি, নয়াদিল্লির বঙ্গভবন ও চেন্নাইয়ের যুব হোস্টেলে কর্মরত কর্মচারীদের কেন্দ্রীয় সরকারের হারে ডিএ দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগ তুলে তাঁরা এই চরম বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনাল সেই আবেদন খারিজ করে দেয় এবং জানায় যে ডিএ দেওয়া রাজ্যের সম্পূর্ণ বিবেচনার বিষয়, এটি কোনো আইনি অধিকার নয়।
তবে ২০১৮ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ট্রাইবুনালের সেই আদেশ বাতিল করে দেয়। আদালত রায় দেয়, পঞ্চম বেতন কমিশনের সুপারিশ রোপা ২০০৯-এর মাধ্যমে যতটুকু গৃহীত হয়েছে, তার ভিত্তিতে ডিএ পাওয়া কর্মচারীদের একটি আইনি অধিকার। বিষয়টি পুনরায় ট্রাইবুনালে পাঠানো হয় (রিমান্ড) এটি নির্ধারণ করতে যে রাজ্য কর্মচারীরা কেন্দ্রীয় সরকারের হারে ডিএ পাওয়ার অধিকারী কি না এবং পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কর্মরতদের বেশি ডিএ দেওয়া আদৌ বৈষম্যমূলক কি না।
এই রিমান্ড আদেশের বিরুদ্ধে রাজ্যের রিভিউ পিটিশন খারিজ হয়ে গেলে ডিএ-র অধিকার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হয়ে যায়। রিমান্ডের পর, ২০১৯ সালের ২৬ জুলাই ট্রাইবুনাল রায় দেয়, রাজ্য কর্মচারীরা কেন্দ্রীয় সরকারের হারে ডিএ পাওয়ার অধিকারী নন, তবে দিল্লি ও চেন্নাইয়ে কর্মরতদের বেশি ডিএ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে বৈষম্য রয়েছে। পরিশেষে, ট্রাইবুনাল রাজ্যকে এআইসিপিআই-এর ভিত্তিতে ডিএ প্রদানের নীতি নির্ধারণ করতে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দেয়।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজ্যের চ্যালেঞ্জ হাইকোর্ট খারিজ করে দেয় এবং জানায়, একবার রোপা ২০০৯ সংবিধানের ৩০৯ অনুচ্ছেদের অধীনে বিবেচিত হলে, রাজ্য ডিএ-র বিধি লঙ্ঘন করতে পারে না। রাজ্যের রিভিউ পিটিশন ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর খারিজ হয়ে যায়, যার পর রাজ্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, একবার ডিএ-কে এআইসিপিআই-র মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হলে, পরবর্তী সময়ে রাজ্য কর্তৃক জারি করা ডিএ সংশোধন সংক্রান্ত মেমোরান্ডামগুলি “মারাত্মক ত্রুটি”-তে আক্রান্ত হতে বাধ্য, কারণ তাতে এআইসিপিআই-র উল্লেখ নেই।
আদালত জানায়, এআইসিপিআই-ভিত্তিক কাঠামো থেকে কোনো যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি ছাড়া বিচ্যুতি সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পষ্ট স্বেচ্ছাচারিতা (manifest arbitrariness)। এই ধরনের বিচ্যুতিতে নিশ্চিতভাবেই যুক্তিসম্পন্ন নীতির অভাব থেকে যায় এবং তা আদতে রাজ্যের খামখেয়ালিপনাকেই স্পষ্ট করে।
আদালত আরও জানায়, রোপা ২০০৯-এ ডিএ গণনার নির্ধারক হিসেবে এআইসিপিআই-কে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে কর্মচারীদের পক্ষে একটি ন্যায্য প্রত্যাশা (legitimate expectation) সৃষ্টি হয়েছে। আদালত ধরে নেয় যে মামলার প্রথম পর্বে কলকাতা হাইকোর্ট যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, তা কর্মচারীদের পক্ষে কার্যত একটি আইনি অধিকারের মতো কাজ করবে। তবে আদালত রাজ্যের এই যুক্তির সঙ্গে একমত হয় যে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার বছরে দু’বার ডিএ দেয়, তাই বলে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদেরও বছরে দু’বার ডিএ পাওয়ার অধিকার নেই।
আদালত বলে, একবার ডিএ-র একটি আইনত অধিকার সৃষ্টি হলে, তা রাজ্যের আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য নয়। আদালত মন্তব্য করে, “আমরা বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছি যে একবার কোনো ব্যক্তির পক্ষে একটি অধিকার প্রদান করা হলে, তখন রাজস্ব নীতি সেই অধিকার প্রদানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।”
আদালত লক্ষ্য করে যে কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ফোরামে তাঁদের দাবি তুলে ধরেছেন। তাই রাজ্যের দেরি ও গাফিলতির (delay and laches) যুক্তি আদালত খারিজ করে দেয়।
আদালতের নির্দেশ, কর্মচারীরা ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ডিএ-র বকেয়া পাওয়ার অধিকারী। আদালত স্পষ্ট করে জানায় যে অন্তর্বর্তী আদেশ বা বর্তমান রায়ের পরে দেওয়া টাকা, ভবিষ্যতে আইনের পরিবর্তন হলেও ফেরত নেওয়া যাবে না।
আদালতের রায়ের বাস্তবায়ন আদৌ কতটা হচ্ছে, তা তদারকির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে থাকবেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা, ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি তারলোক সিং চৌহান, প্রাক্তন বিচারপতি গৌতম ভাদুরি এবং ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহাহিসাব নিরীক্ষক (সিএজি) অথবা তাঁর মনোনীত কোনো জ্যেষ্ঠ আধিকারিক।
কমিটির দায়িত্ব হবে কর্মচারীদের প্রাপ্য মোট অর্থ নির্ধারণ করা এবং রাজ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি নির্দিষ্ট পরিশোধসূচি স্থির করা। আদালতের নির্দেশ, এই প্রক্রিয়া ৬ মার্চ ২০২৬-এর আগে সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রথম কিস্তি ৩১ মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও এই রায়ের সুবিধা পাবেন বলে জানিয়েছে আদালত।
আদালত ওই কমিটিকে সম্পূর্ণ সহায়তা দেওয়া ও সংশ্লিষ্ট সমস্ত খরচ বহনের নির্দেশ দেয়। প্রথম কিস্তি প্রদানের পর কমিটিকে একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে, যেখানে নির্ধারিত হিসাব, পরিশোধ সূচি এবং কাজের অগ্রগতি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকবে।