বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন একের পর এক সংকট সামলাতে ব্যস্ত—অর্থনৈতিক উদ্বেগ, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের হুমকি, আর অভিবাসন নিয়ে কড়া অভিযানে বাড়তে থাকা উত্তেজনা—ঠিক তখনই আলোচনায় উঠে এল ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের নতুন ডকুমেন্টারি ছবি, ‘Melania’।
এই ডকুমেন্টারির বিপুল বাজেট ঘিরে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে—প্রভাবশালী ধনী দাতা ও কর্পোরেট মহল কি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতেই এই ছবিতে এত বড় অঙ্কের অর্থ ঢালছে?
ছবিটি কী নিয়ে?
১০৪ মিনিটের এই ডকুমেন্টারিটি মেলানিয়া ট্রাম্পের জীবনকে অনুসরণ করেছে প্রায় ২০ দিন ধরে—২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথগ্রহণের ঠিক আগের সময়টুকু। আমাজন এমজিএম স্টুডিওস জানিয়েছে, এই ছবি দর্শকদের মেলানিয়ার জীবনে “অভূতপূর্ব প্রবেশাধিকার” দেবে।
ছবির প্রযোজক মার্ক বেকম্যান জানিয়েছেন, ডকুমেন্টারির সৃজনশীল দিকনির্দেশে মেলানিয়া নিজেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর কথায়, “এটা কোনও রাজনৈতিক ছবি নয়।”
ডকুমেন্টারিতে মেলানিয়ার ফ্যাশন, কূটনৈতিক উপস্থিতি, সিক্রেট সার্ভিসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা—সবই দেখানো হয়েছে। এমনকি ট্রাম্পের রসবোধের কিছু মুহূর্তও নাকি ধরা পড়েছে। ট্রেলারে দেখা যায়, ফোনে ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন মেলানিয়া। ট্রাম্প জিজ্ঞেস করলে তিনি ভাষণ দেখেছেন কি না, মেলানিয়ার জবাব—“না, খবরেই দেখব।”
কবে মুক্তি পাচ্ছে?
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসির কেনেডি সেন্টারে ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হচ্ছে। এই কেন্দ্রটির ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে—ট্রাম্প নিজেই এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত।
এর আগে ২৪ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে একটি ব্যক্তিগত স্ক্রিনিং হয়, যেখানে প্রায় ৭০ জন অতিথি উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন একাধিক কর্পোরেট কর্তা। সোশ্যাল মিডিয়ায় মেলানিয়া লেখেন, তিনি “অভিভূত” এবং এটিকে “ঐতিহাসিক মুহূর্ত” বলে উল্লেখ করেন।
শুক্রবার ছবিটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ১,৬০০ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা, যার মধ্যে ১,৫০০টি যুক্তরাষ্ট্রে। বৃহস্পতিবারই ২১টি থিয়েটারে বিশেষ অতিথিদের জন্য একযোগে প্রিমিয়ার দেখানো হবে।
বাজেট কত?
আমাজন এমজিএম স্টুডিওস ছবিটির স্বত্ব কিনেছে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলারে। এর সঙ্গে রয়েছে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলারের প্রচার খরচ—যার মধ্যে লাস ভেগাসের বিখ্যাত ‘দ্য স্ফিয়ার’-এ বিশাল আকারে ট্রেলার প্রজেকশনও রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, এই অঙ্কের মধ্যে একটি আসন্ন ডকু-সিরিজও অন্তর্ভুক্ত। ডিজনিকে প্রায় ২৬ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে আমাজন এই চুক্তি পায়। তুলনায়, এই ছবির প্রচার বাজেট অন্যান্য বড় ডকুমেন্টারির চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।
মেলানিয়া কত পেলেন?
মেলানিয়া ট্রাম্প ছবিটির এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার, ফলে সম্পাদনা ও বিষয়বস্তুর ওপর তাঁর বড় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এএফপি-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ৪০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির প্রায় ৭০ শতাংশই তিনি নিজে পাবেন।
টিকিট বিক্রি কেমন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে সমর্থকদের ছবি দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “টিকিট দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।”
তবে বাস্তব চিত্র ততটা উজ্জ্বল নয়। পক নিউজ-এর মতে, উদ্বোধনী সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ছবিটি প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। আবার বক্সঅফিস-এর হিসেব বলছে, আয় হতে পারে মাত্র ১–২ মিলিয়ন ডলার।
ব্রিটেনের অন্যতম বড় সিনেমা চেইন ভ্যু-এর সিইও জানিয়েছেন, লন্ডনের এক প্রেক্ষাগৃহে প্রথম শোয়ের জন্য মাত্র একটি টিকিট বিক্রি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই শূন্য আসনের স্ক্রিনশট শেয়ার করে ছবিটি নিয়ে ঠাট্টা করছেন।
অন্য ডকুমেন্টারির সঙ্গে তুলনা
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘মেলানিয়া’র বাজেট ডকুমেন্টারি দুনিয়ায় নজিরবিহীন।
২০০৪ সালের মাইকেল মুরের ‘Fahrenheit 9/11’-এর বাজেট ছিল মাত্র ৬ মিলিয়ন ডলার, অথচ উদ্বোধনী সপ্তাহান্তেই আয় করেছিল ২৪ মিলিয়ন ডলার।
ম্যাট ওয়ালশের ‘Am I Racist?’ মাত্র ৩ মিলিয়ন ডলারের বাজেটে তৈরি হয়ে ২০২৪ সালের সবচেয়ে আয় করা ডকুমেন্টারি হয়।
সিএনএন বিশ্লেষক হ্যারি এন্টেন বলেন, “‘মেলানিয়া’ এসবের ধারেকাছেও নেই।”
পরিচালক কে?
ছবিটি পরিচালনা করেছেন ব্রেট র্যাটনার, ‘রাশ আওয়ার’ সিরিজের জন্য যিনি পরিচিত। ২০১৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ ওঠার পর কেরিয়ার ধাক্কা খায়, যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মেলানিয়া নিজেই ফক্স নিউজে বলেন, “তিনি দারুণ প্রতিভাবান, তাঁর সঙ্গে কাজ করে ভালো লেগেছে।”
বিতর্ক কেন?
অনেকের মতে, প্রত্যাশার তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দামে এই ছবি কেনা আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের মন জয়ের চেষ্টা। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ধনী দাতা ও কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ আগেই রয়েছে—উদ্বোধনী তহবিল, হোয়াইট হাউস সংস্কার, এমনকি ক্রিপ্টো ব্যবসা নিয়েও বিতর্ক চলছে।
ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্প পরিবার ক্রিপ্টো উদ্যোগ থেকে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করছেন, ‘মেলানিয়া’ আসলে একটি উচ্চমূল্যের রাজনৈতিক উপহার। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে আমাজনের প্রাক্তন নির্বাহী টেড হোপ বলেন, “এত দামী ডকুমেন্টারি, তাও মিউজিক লাইসেন্স ছাড়াই—এটা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা নয় বলেই বা কীভাবে বলা যায়?”
সব মিলিয়ে, ‘মেলানিয়া’ শুধু একটি ডকুমেন্টারি নয়—এটি এখন রাজনীতি, ক্ষমতা ও টাকার জটিল সম্পর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে।