বাংলাস্ফিয়ার: গত কয়েক দিনে সোনা ও রুপোর দামে বড় ওঠানামা দেখা গেছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে টানা ঊর্ধ্বগতির পর এই দুই মূল্যবান ধাতুর দাম হঠাৎই তীব্রভাবে পড়ে যায়, আবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। কেন এমন হলো—সংক্ষেপে সহজ ভাষায় দেখে নেওয়া যাক।
গত এক বছরে সোনা–রুপোর দাম এত বেড়েছিল কেন?
সোনা ও রুপোকে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখেন। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এগুলোর চাহিদা বাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনও বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। শুল্কনীতি, ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে চাপ, এমনকি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য—এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে মার্কিন ডলার দুর্বল হয়েছে এবং মানুষ নিরাপদ বিকল্প হিসেবে সোনা–রুপোর দিকে ঝুঁকেছে।
ট্রাম্পের শপথগ্রহণের পর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত
সোনার দাম প্রায় দ্বিগুণ
রুপোর দাম প্রায় চার গুণ
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বাড়তে থাকা জাতীয় ঋণের কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকটও এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ এখন প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
প্লেনিসফার ইনভেস্টমেন্টস-এর ডিয়েগো ফ্রানজিন বলেন, সোনা এমন এক সম্পদ যার কোনও “কাউন্টারপার্টি রিস্ক” নেই—এটি সুদ দেয় না, কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়, শুধু অস্তিত্বেই নিরাপত্তা দেয়।
এছাড়াও, চীন ও তুর্কিয়ের মতো উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিপুল পরিমাণ সোনা কিনছে, যা চাহিদা আরও বাড়িয়েছে।
হঠাৎ দাম পড়ল কেন?
গত বৃহস্পতিবার সোনা প্রায় ৫,৫৯৫ ডলার প্রতি আউন্স এবং রুপো প্রায় ১২২ ডলার—রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু শুক্রবারেই:
সোনার দাম পড়ে প্রায় ১০%
রুপোর দাম পড়ে প্রায় ২৮%
সোমবার পতন আরও বাড়ে। তবে মঙ্গলবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।
পতনের কারণ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে।
একদল মনে করছেন, ট্রাম্পেরই একটি সিদ্ধান্ত বাজারকে শান্ত করেছে। তিনি ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান হিসেবে কেভিন ওয়ারশ-কে মনোনয়ন দেওয়ার ইঙ্গিত দেন—যাকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল পছন্দ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা কমে এবং সোনা–রুপো বিক্রি শুরু হয়।
ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতার আশাও প্রকাশ করেন, যা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, অনেক বিশ্লেষক বলছেন—এর আসল কারণ ছিল অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি। ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ারের মার্ক ম্যাথিউজের মতে, দাম এত দ্রুত বেড়েছিল যে লাভ তুলে নেওয়ার (profit booking) ঢেউ শুরু হতেই পতন তীব্র হয়ে যায়।
সামনে কী হতে পারে?
বাজার ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন, তবে অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন দীর্ঘমেয়াদে সোনা–রুপোর দাম আবার বাড়তে পারে।
জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকদের অনুমান, ২০২৬ সালের শেষের মধ্যে সোনার দাম ৬,৩০০ ডলার প্রতি আউন্সে পৌঁছাতে পারে—বর্তমান দামের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
তাঁদের মতে, ডলার দুর্বল হওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোর সোনা কেনা—এই দুই মূল চালিকা শক্তি এখনও অটুট। তবে আগের মতো খাড়া গতিতে নয়, ধীরে ও স্থিতিশীলভাবেই দাম বাড়তে পারে—যা বাজারের জন্য স্বাস্থ্যকর।
সংক্ষেপে বলা যায়, সোনা–রুপোর দামের এই রোলার-কোস্টার যাত্রা আপাতত থামেনি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো এখনও বিনিয়োগকারীদের ভরসার জায়গা হয়ে রয়েছে।