ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুল্ক কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ট্রাম্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে নীরব থেকেছেন—যেখানে বলা হয়েছে, ভারত নাকি আমেরিকা থেকে অতিরিক্ত পণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ও কৃষিপণ্য। রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনার প্রসঙ্গেও মোদী কোনও মন্তব্য করেননি, যে তেল ট্রাম্পের মতে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ জোগাচ্ছে।
আমেরিকার সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তি হলে তা ভারতের অর্থনীতির পক্ষে নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির খবর। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাব ভারত মোটের ওপর সামলে নিতে পেরেছে। গহনা বা বস্ত্রশিল্পের মতো কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্র বাদ দিলে ভারত আদতে রফতানি-নির্ভর উৎপাদন অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। স্মার্টফোন কিংবা জেনেরিক ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য শুল্কের আওতার বাইরে ছিল।
কিন্তু এই শুল্ক আরোপ ভারতের পক্ষে বিপজ্জনক ছিল অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে। সম্প্রতি মার্কিন বহুজাতিক সংস্থার মধ্যে বেশ কয়েকটি চিন থেকে সরে এসে ভারতে বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ট্রাম্পের শুল্ক হঠাৎ করে সেই সম্ভাবনার ওপর জল ঢেলে দেয়। এইচএসবিসি ব্যাঙ্কের হিসেব অনুযায়ী, মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক ভারতের বার্ষিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার থেকে প্রায় ০.৭ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে দিতে পারত।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকা–ভারত সম্পর্ক বারবার ওঠানামার মধ্যে দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালে তাঁর নির্বাচনী জয়কে ভারতের সরকারি মহল ও জনমত মোটের ওপর ইতিবাচকভাবেই দেখেছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে ট্রাম্প ও মোদী বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সেই আলোচনা এগোয়নি।বরং তার পরই আসে শুল্ক আরোপ।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন ট্রাম্প দাবি করেন, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে সংঘাত হয়েছিল, তার অবসানে তিনি মধ্যস্থতা করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। ভারতীয় পক্ষ থেকে বলা হয় আমেরিকার ভূমিকা ছিল সামান্যই, আর প্রেসিডেন্টের এই কৃতিত্ব দাবি নিয়ে তাঁরা প্রবল ক্ষুব্ধ।
তবে সম্প্রতি সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলতে শুরু করেছে।জানুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিওগোর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই উন্নতি হয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা। ট্রাম্পের হয়তো এটাও আশঙ্কা ছিল যে তিনি পিছিয়ে পড়ছেন। তাঁর এই ঘোষণা এসেছে ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই, যখন ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেদের মধ্যে একটি পৃথক বাণিজ্যচুক্তি প্রকাশ্যে এনেছে।
তবে আমেরিকা–ভারত চুক্তির খুঁটিনাটি এখনও স্পষ্ট নয়,বিশেষ করে রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে ভারতের অবস্থান কী হবে, তা অনিশ্চিত। যদিও ইঙ্গিত মিলছে যে ভারত ধীরে ধীরে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। ভারতীয় বন্দরে রাশিয়ান ট্যাঙ্কারের আসা-যাওয়া কমেছে, আর ভারপ্পাপ্ত মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী গত সপ্তাহে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার মতো দেশ থেকে তেল কেনার দিকে ভারত আরও ঝুঁকতে পারে। তবে ট্রাম্পের আর একটি অবিশ্বাস্য দাবি ভারত নাকি আমেরিকান পণ্যের ওপর শুল্ক ও অশুল্ক বাধা শূন্যে নামিয়ে আনবে, এটি বাস্তবে রূপ নেওয়া কঠিন। কৃষিখাত দীর্ঘদিন ধরেই প্রধান বাধা: ভারতে জিএম ফসলের ওপর কড়াকড়ি রয়েছে, আর আমেরিকার দুগ্ধশিল্পে পশু-উৎপন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা ভারতের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূরণ নয়।।
তবু আপাতত এই খবর স্বস্তিদায়ক। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে উষ্ণতা ফিরলে তা ভারতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে বদল ঘটাবে। গত বছর ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকা বড় অর্থনীতিগুলির মুদ্রার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ছিল— এর আংশিক কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারত থেকে পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছিলেন।
ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের ঘোষণার পর টাকার মান সামান্য চড়েছে,আর গিফট নিফটি—ভারতের বড় কোম্পানিগুলির ফিউচার সূচক—উর্ধ্বমুখী হয়েছে। বাণিজ্যযুদ্ধ ভারত মোটামুটি দক্ষতার সঙ্গেই সামলেছে। তবে এই শান্তির সুযোগ থেকে সে কতটা লাভ তুলতে পারবে, তা নির্ভর করবে এই সাময়িক সমঝোতা শেষ পর্যন্ত কতটা স্থায়ী হয় তার ওপর।