বাংলাস্ফিয়ার: ফুটবল মানেই কি কেবল মাঠের লড়াই আর গোল? গ্যালারির গর্জন আর কোচেদের ট্যাকটিক্সের আড়ালেও এক নেপথ্যের জগৎ আছে। সেই জগতেরই একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী ৫৩ বছর বয়সি ব্রাজিলীয় রাফায়েলা পিমেন্টা। ফুটবল জগতে পিমেন্টা প্রথম মহিলা সুপার এজেন্ট। সম্প্রতি বিবিসি (BBC)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের দীর্ঘ লড়াই এবং ফুটবল বিশ্বের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর অন্দরমল নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এই আলোচনা কেবল ফুটবল অনুরাগীদের জন্যই নয়, তাতে এমন কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে, যা আজও ফুটবলের পরিধিতে পুরুষের আধিক্য থাকার দিকেই ইঙ্গিত করে। ফোর্বসের ২০২৬ সালের ‘ফিফটি ওভার ফিফটি’ তালিকায় ফুটবলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন এই ‘সুপার এজেন্ট’।
পিমেন্টা যে খেলোয়াড়দের এজেন্ট তাঁদের তালিকা দেখলেই ফুটবলপ্রেমীদের পিলে চমকে যাওয়ার জোগাড়। ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড থেকে শুরু করে লিভারপুলের ম্যানেজার আর্নে স্লট, বিশ্ব ফুটবলের এমনই মহারথীরা ভরসা রাখেন তাঁর ওপর। এমনকি ১৭ বছর বয়সী মেক্সিকোর ‘ওয়ান্ডারকিড’ গিলবার্তো মোরাও রয়েছে সেই তালিকায়। তবুও তাঁর পরিচয় কেবলমাত্র এই তারকাদের ছত্রছায়ায় রয়ে গিয়েছে। পিমেন্টার এই অবধি পৌঁছানোর লড়াইটা ততটাও সহজ ছিল না।
বিবিসি-র প্রধান ফুটবল সংবাদদাতা সাইমন স্টোনের সঙ্গে কথা বলার সময় পিমেন্টা বর্তমান ট্রান্সফার সিস্টেম নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমানে ক্লাবগুলোর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে এসেছে। খেলোয়াড়রা এই বৃহৎ শোষণমূলক ব্যবস্থারই শিকার হচ্ছেন। পিমেন্টার ভাষায়, তাঁরা ‘জিম্মি’ বই আর কিছুই নয়। তাঁর অভিজ্ঞতায়, প্রতিটি ট্রান্সফার উইন্ডোর শেষে কোনো না কোনো খেলোয়াড় বিতাড়িত হন। তিনি বলেন, “ক্লাবের সামান্য কিছু দরদাম নিয়ে মন কষাকষির জেরেই, কোনো খেলোয়াড় হয়তো তাঁর কাঙ্ক্ষিত ক্লাবে যেতে পারেন না।” ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আদালতের রায়ের পর ফিফা কিছু অন্তর্বর্তীকালীন নিয়ম আনে। চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ এবং তার সপক্ষে প্রমাণের দায়ভার সুনিশ্চিত করতে ফিফা নতুন নিয়ম চালু করে। তবে পিমেন্টার কথায়, “ফুটবল এখনও যান্ত্রিক। একসময় ক্লাব মালিকদের সঙ্গে খেলোয়াড়দের মানবিক সম্পর্ক ছিল। এখন কেবল খেলোয়াড়রা ব্যালেন্স শিটের এক একটি ‘অ্যাসেট’। এই ব্যবস্থা তাঁদেরকে এক একটি পণ্যে পরিণত করেছে।”
পেশাদার জীবনের বিবর্তন নিয়ে পিমেন্টার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গভীর। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “আজকের দিনে একজন এজেন্টের পক্ষে আর সব কাজ একা করা সম্ভব নয়। একসময় একটি চুক্তি সুনিশ্চিত করতে আমার ১৮ ঘণ্টার বেশি লাগত না। কিন্তু এখন, ট্যাক্স, শ্রম আইন আর স্থানীয় আইনের মারপ্যাঁচে বেশ কয়েক মাস আগে থেকে নথিপত্র তৈরি রাখতে হয়।” তাঁর মতে, খেলোয়াড়রা এখন একেকটি ছোট সংস্থায় পরিণত হয়েছেন। হালান্ডের ইউটিউব চ্যানেলের ১.২৮ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবারই তার প্রমাণ। আগে কোনো খেলোয়াড় মিডিয়া জগতে পা রাখলে তিনি টেনেটুনে কোনোভাবে একটি মাসিক পত্রিকা চালাতে পারতেন। আজ, ডিজিটাল মিডিয়া, স্পনসর, ইনভেস্টর আর স্টার্টআপের এক বিশাল পাহাড় তাঁকে টপকাতে হয়। পিমেন্টা এখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ম্যাথেয়ুস ডে লিট, নুসাইর মাজরাউইয়ের মতো তারকাদের পর্যবেক্ষণ করেন। তবে তাঁকে আজও প্রতিদিন নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। অতীতের সাফল্যের কোনো স্মৃতি ‘ফুটবল মাঠে বা ট্রান্সফার উইন্ডোতে’ চলে না।
সাক্ষাৎকারে, পিমেন্টার সঙ্গে প্রয়াত বিতর্কিত এজেন্ট মিনো রাইওলার সম্পর্ক নিয়েও কিছু ভ্রান্ত ধারণার বিষয় আলোচিত হয়। রাইওলার মৃত্যুর পরই তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন এমনটা নয়। শুরু থেকেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ে কাজ করতেন। রাইওলা ব্রাজিলে একটি চুক্তি করার সময়, দোভাষী হিসেবে কাজ করা পিমেন্টার আইনি দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। পিমেন্টার এই ব্যক্তিত্বই রাইওলার নজর কাড়ে। রাইওলার মতে বাকি সবাই টাকার লোভে নানা অহেতুক প্রজেক্টে কাজ করতে রাজি থাকলেও, পিমেন্টাই একমাত্র যিনি তাঁকে মুখের ওপর ‘না’ বলতে পারতেন। পিমেন্টা বলেন, “আমি ভেবেছিলাম এই আশ্বাস হয়তো ক্ষনিকের। সেই সময় কল্পনাও করতে পারিনি, আমাদের সম্পর্ক দীর্ঘ ৩৫ বছর চলবে।” তবে এই দীর্ঘ সময়ে পিমেন্টাকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। চেলসির মেরিনা গ্রানোভস্কায়ার মতো হাতেগোনা কয়েকজনকে বাদ দিলে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় নারীরা ছিলেন না বললেই চলে। তাঁর কথায়, “ফুটবলের এই ব্যবস্থা খানিকটা একরকম ‘করিডর’-এর মত। দায়িত্ব নিয়ে কঠোর সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মত পদে নারীরা থেকেও, প্রতিটি ক্লাবের শেষ দরজায় সবসময় একজন পুরুষই থাকতেন।” তবে পিমেন্টা আজ তাঁর সেই ফাইনাল ডেস্টিনেশনে পৌঁছেছেন। তবে তাঁর কথায়, এই লড়াই তাঁর একার নয়। প্রতি মুহূর্তে এই যাত্রায় সঙ্গ দিয়েছেন কোনো একজন নারী। যাঁরা পিঠ চাপড়ানোর সাথে সাথে, তাঁকে এগিয়ে যেতে অকুন্ঠ সাহায্য করেছেন।
লিঙ্গবৈষম্যের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে পিমেন্টা জানান, এক স্পোর্টস ডিরেক্টর তাঁকে সামনাসামনি দেখে বলেই বসেছিলেন, তিনি নাকি তাঁকে ব্রাজিলের কোনো যৌনকর্মী ভেবেছিলেন। আজও ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এমন অনেক পুরুষ তাঁকে খাটো করে দেখতে চান। মাত্র দু’বছর আগের এক ঘটনায়, একটি চুক্তির আলোচনার শেষে এক ক্লাব কর্তা পিমেন্টার নিয়োগ করা আইনজীবীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘পিমেন্টা তোমার কাছে ভালো শিখেছে’। ওই ক্লাবকর্তার দাবি, তাঁর এই বক্তব্যে নাকি তিনি পিমেন্টার প্রশংসাই করেছিলেন। এই মানসিকতারই তীব্র নিন্দা করেছেন পিমেন্টা।
২০২৩ সালে স্পেন মহিলা ফুটবল বিশ্বকাপ জেতার সময়, দলের ক্যাপ্টেন জেনি হারমোসোকে, স্পেনের ফুটবল প্রধান লুই রুবিয়ালেস জোরপূর্বক চুম্বন করেছিলেন। সাক্ষাৎকারে সেই প্রসঙ্গেও কথা বলেছেন পিমেন্টা। পিমেন্টার প্রশ্ন, “একইভাবে লিওনেল মেসিকে ট্রফি দেওয়ার সময় কি রুবিয়ালেস তাঁকে চুম্বন করার সাহস দেখাতেন? সেক্ষেত্রে তাঁর সাজাই বা কী হতো?” পিমেন্টার মতে, এটিকে কেবল একটি ঘটনা হিসেবে দেখে, থেমে থাকলে চলবে না। এটি নারীদের সম্পর্কে সমাজের নিকৃষ্ট মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
সাক্ষাৎকারের শেষে, পিমেন্টা ফুটবলের অন্দরে কাজ করতে আসা পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। উয়েফা এজেন্ট কোর্সের শিক্ষক হিসেবে তিনি তরুণীদের শেখান, কোনো ধরনের হেনস্থা যেন তাঁরা মুখ বুজে সহ্য না করেন। ফুটবল জগতে জায়গা করে নিতে নিজেকে ‘যৌন পণ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো প্রয়োজন নেই। নিজের লড়াইয়ের মাধ্যমে তাঁদের জন্য, আগামীর পথটা কিছুটা হলেও মসৃণ করে দিয়ে যেতে চান তিনি।