বাংলাস্ফিয়ার: আজকের দ্রুতগতির জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি কার্যত এক মহামারি। স্ট্রেস, উদ্বেগ আর ক্লান্তি যেন আমাদের ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীবন যাপনে সামান্য বদল আনলেই মিলতে পারে বড়সড় রেহাই। সেই জাদুকরী দাওয়াইয়ের নাম— ‘কৃতজ্ঞতা বোধ’। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে কেবল মন ভালো থাকে না, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি ঘটে। বিজ্ঞানসম্মত ৯টি বিশেষ উপায়ে কীভাবে কৃতজ্ঞতা আপনার মনের জোর বাড়াতে পারে এবং একে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলার রসদ মিলবে এই প্রতিবেদনে।
প্রথমে দেখা যাক, উদ্বেগ বা স্ট্রেস হ্রাসে কৃতজ্ঞতার প্রভাব। কৃতজ্ঞতা বোধ আমাদের মনোযোগকে সমস্যা থেকে সরিয়ে ইতিবাচকতার দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা কমে এবং মন শান্ত হয়। নিয়মিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স সক্রিয় হয়, যা সরাসরি আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
বিজ্ঞান বলছে, কৃতজ্ঞতা নাকি ঘুমের মানও উন্নত করে। ঘুমানোর আগে সারাদিনের না পাওয়াগুলোর বদলে প্রাপ্তিগুলোর কথা ভাবলে মন শান্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা রাতে অন্তত ১৫ মিনিট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বা জার্নাল লেখেন, তাঁরা দ্রুত ঘুমান এবং দীর্ঘক্ষণ গভীর নিদ্রা উপভোগ করেন। অর্থাৎ, বিছানায় যাওয়ার আগে নেতিবাচক স্মৃতিচারণ বন্ধ করাই সুস্থ ঘুমের চাবিকাঠি।
সার্বিকভাবে এতে ইতিবাচক আবেগের বিকাশ ঘটে। কৃতজ্ঞতা মস্তিষ্কের ডোপামিন ও সেরোটোনিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা আমাদের খুশি রাখতে প্রাকৃতিক ওষুধের মতো কাজ করে। এটি কেবল সাময়িক আনন্দ দেয় না, বরং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রশান্তি ও জীবনে গভীর তৃপ্তি আনে।
নিয়মিত কৃতজ্ঞতা বোধের প্রকাশ আপনার সামাজিক সম্পর্কও মজবুত করে। মানুষের ছোট ছোট প্রচেষ্টাকে ধন্যবাদ দিলে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মান বাড়ে। দম্পতিদের মধ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বিবাদ কমায় এবং সম্পর্কের মাধুর্য বৃদ্ধি করে। সামাজিক সমর্থনের এই ভিত্তি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি স্তম্ভ।
মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধিতেও এর জুড়ি মেলা ভার। জীবনের কঠিন সময়েও ভেঙে না পড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দেয় কৃতজ্ঞতা। ট্রমা বা বড় কোনো ধাক্কা সামলে উঠে আশাবাদী হতে শেখায় এই অভ্যাস। এটি প্রতিকূলতাকে কেবল দেওয়াল হিসেবে নয়, বরং নিজেকে চেনার সুযোগ হিসেবে দেখতে সাহায্য করে।
আজকের ‘র্যাট-রেসের’ দৌড়ে মানুষ যখন তীব্র অবসাদ বা ডিপ্রেশনে ভুগছেন, সেই নিরিখে বিজ্ঞান বলছে, নেতিবাচক চিন্তার চক্র ভেঙে আশার আলো দেখায় কৃতজ্ঞতা। বর্তমানে অনেক আধুনিক থেরাপিতে প্রথাগত চিকিৎসার পাশাপাশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস করানো হয়, যা রোগীদের মানসিক ক্ষত সারিয়ে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
নিজের প্রতি বিশ্বাস বা আত্মসম্মান বোধ বৃদ্ধিতেও কৃতজ্ঞতা সহায়ক। অন্যের সাথে নিজের তুলনা করা বন্ধ করে নিজের সামর্থ্যকে শ্রদ্ধা করতে শেখায় এই অভ্যাস। এটি হীনম্মন্যতা কমায় এবং নিজের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে। ফলে সামাজিক চাপ ও নিখুঁত হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে মন শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়।
কৃতজ্ঞ মানুষের জীবনে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা নিজের শরীরের প্রতি অনেক বেশি যত্নশীল হন। নিয়মিত ব্যায়াম করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মতো স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তাঁরা অনায়াসেই গড়ে তোলেন। শরীরের যত্ন নিলে মনও ভালো থাকে, কৃতজ্ঞতা বোধ এই চক্রটিকে সচল রাখে।
পরিশেষে, কৃতজ্ঞতা আমাদের উপস্থিতিবোধ বা মাইন্ডফুলনেস বাড়িয়ে দেয়। এটি আমাদের বর্তমানে মনোযোগ দিতে শেখায়। অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা না করে হাতের কাছে থাকা অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে সাহায্য করে। কৃতজ্ঞতা ও সচেতনতার এই মেলবন্ধন মনকে শান্ত ও একাগ্র রাখে। প্রতিদিন অন্তত তিনটি ছোট বিষয়ের জন্য ধন্যবাদ জানানোর অভ্যাস আপনার মস্তিষ্ককে নতুনভাবে সাজাতে বা ‘রিওয়্যার’ করতে পারে।
কৃতজ্ঞতা কেবল একটি আবেগ নয়, এটি সুস্থ থাকার বিজ্ঞানসম্মত কৌশল। প্রতিদিন অন্তত তিনটি ছোট বিষয়ের জন্য ধন্যবাদ জানানোর অভ্যাস আপনার মস্তিষ্ককে নতুনভাবে সাজাতে (rewire) পারে। আজ থেকেই শুরু করুন, দেখবেন জীবন আরও সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।