Home খবরা খবর রাত যতই দীর্ঘ হোক, সূর্য ওঠেই

রাত যতই দীর্ঘ হোক, সূর্য ওঠেই

0 comments 91 views

বাংলাস্ফিয়ার: আর মাত্র দু’দিন কাটালেই তাঁর বন্দীদশা ৫০০ দিনে পৌঁছে যেত। গাজায় টানা ৪৯৮ দিন বন্দী থাকা মুক্তিপ্রাপ্ত এক ইজরায়েলি বন্দী বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর সেই মৃত্যুসমতুল্য ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। সেইসঙ্গে আরও একটি কথা বলেছেন তিনি, যা স্পষ্ট করে, এক ভুক্তভোগী আরেক ভুক্তভোগীর যন্ত্রনা বুঝতে পারেন।

বছর তিরিশের সাশা ট্রুফানভ সাক্ষাৎকারে বলেন, ” ইজরায়েলের শেষ বন্দীর মরাদেহ দেশে পৌঁছাতেই সকল মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছেন। তাঁরা আবারও নতুন করে জীবন শুরুর কথা ভাবার সাহস পেয়েছেন।”

তাঁর কথায়, সোমবার রান গিভিলির দেহ যখন এসে পৌঁছায়, তখন তিনি বুঝতে পারেন গাজায় আর কোনও ইজরায়লি বন্দী নেই। আবেগ সমেত তিনি বলেন, “এই মুহূর্তের জন্যই দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করেছিলেন সবাই। এই অনুভূতি ভাষায় ব্যক্ত করা অসম্ভব।”

মুক্তি পাওয়ার পরেও তাঁর মনে হচ্ছিল তিনি যেন পুরোপুরি মুক্ত নন। বারংবার বন্দী সহযোদ্ধাদের কথা মনে পড়ছিল তাঁর। সেইকারণে শাসার মনটা হয়তো পড়েছিল গাজার মাটিতেই, তাঁর সাথীদের কাছে। ”

 

পেশায় ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার ইজরায়েলি এই যুবককে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদিরা অপহরণ করেন। এমনকী ওই যুবকের বাগ্‌দত্তা কোহেন’সহ মা দিদিমা কেউ রেহাই পান নি এই জিহাদিদের হাত থেকে। তাঁরা সবাই ৫০ দিনের বেশি সময় গাজায় আটক ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁরা মুক্তি পেলেও, সাশাকে ছাড়েনি দুষ্কৃতীরা। টানা ৪৯৮ দিন বন্দিদশায় থাকতে হয় তাঁকে।

মুক্তির দিনে স্বাভাবিকভাবেই তিনি আনন্দিত ছিলেন। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাসে সেই হাসি তাঁর মুখে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সেদিনই তিনি জানতে পারেন, তাঁর বাবাকে হত্যা করেছে দুষ্কৃতীরা।

ট্রুফানভ এবং কোহেন গাজা পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি গিয়েছিল। গাঁজা সীমান্তের কাছে অবস্থিত কিবুতজ নির ওজ এলাকায় ওদের বাড়ি।
সেইসময় সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের দল তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায়। তাতেই যেন বদলে যায় তাঁদের জীবনের ছন্দ।

 

নিজেকে বাঁচাতে কোহেন কম্বল মুড়ি দিয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু তাঁদের দুজনেরই শেষ রক্ষা হয় না। শাসাকে সজোরে ঘুষি এবং কাঁধে ছুরি দিয়ে আঘাত করে দুষ্কৃতীরা। তবুও পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা ছাড়ে না তাঁরা। আক্রমণকারীরা যখন শাসাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন একবার দৌড়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন শাসা। কিন্তু দৌড় থামাতেই দু’বার তাঁর দু’টি পায়ে গুলি করে দুষ্কৃতীরা। এমনকী রাইফেল দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। মুহূর্তে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শাসা।

 

নৃশংসতার উদহারণ এখানেই শেষ নয়। গাজায় পৌঁছানোর পর স্থানীয়রাও বেধড়ক মারধর করে শাসাকে। তখন তাঁর মনে হত,এই বুঝি শেষ। আজই মারা যাবেন।

তিনি আরও জানান, বন্দিদশায় কোনো চিকিৎসাই পাননি তিনি। শুধু একবার তাঁকে একটি বাড়িতে, আরেকবার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁর ভাঙা পা প্রথমে কাঠের হাতল দিয়ে, পরে লোহার গ্রিল দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। পায়ের অস্ত্রোপচারের পর এখনও তিনি ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটাচলা করেন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর বিয়ে। মনের মানুষের সঙ্গে প্রাণ খুলে নাচতে চান,সর্বসমক্ষে সেই ইচ্ছেও প্রকাশ করেছেন তিনি ।

এই দেড় বছর ধরে তাঁকে সম্পূর্ণ একাকী বন্দি করে রাখা হয়েছিল। মাত্র দু’দিন তিনি আরেকজন বন্দীর মুখ দর্শন করতে পেরেছিলেন।

শুরুতে একটি খাঁচায় ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় আটক ছিলেন। বন্দীদশার পুরো সময় জুড়ে তাঁকে কেবল প্রাণে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম খাবারই দেওয়া হত।

বন্দীদশায় জিহাদিরা তাঁকে যৌন হেনস্তা পর্যন্ত করেছে। সেই অভিজ্ঞতার কথাও সাক্ষাৎকরে বলেছেন শাসা। তাঁর অভিযোগ, জিহাদিদের মধ্যে একজন বারবার ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণে যৌন কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্য উসকানি দিতো। সপ্তাহে মাত্র একদিন স্নান করার অনুমতি থাকতো। সেই সময়েও গোপনে তাঁর স্নানের দৃশ্য ভিডিও করা হতো। বিষয়টি তিনি বুঝতে পেরে এমনভাবে ঘুরে স্নান করতেন যাতে তাঁর প্রাইভেট পার্ট রেকর্ড না হয়।

এরপর গাজার ভূগর্ভস্থ টানেলে আটকে রাখা হয় তাঁকে। সেখানেও একা বন্দী ছিলেন তিনি। সেই জায়গা এতটাই ঘুটঘুটে অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ছিল, যে নিজের হাত পর্যন্ত দেখতে পারতেন না শাসা। মর্মান্তিক এই অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ” মনে হতো আমি জীবন্ত কবর।”

তাঁর মতে, যুদ্ধবিরতির শর্ত গুলি যথেষ্ট না। তাঁর কথায়, “ইজারায়েলের আর ক্ষতি যেন না চায় গাজা। এটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, জিহাদির চোখে ইজরায়ালিদের প্রতি রাগ, ঘৃণা লক্ষ্য করেছিলেন তিনি। শাসা জানান, বন্দীদশায় জিহাদিরা তাঁকে প্রায়ই বলত—‘আমরা আবারও এমন হামলা করব।’

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles