Home বিশেষ প্রবন্ধ মরণের ওপারে, বিজ্ঞানের বিচারে

মরণের ওপারে, বিজ্ঞানের বিচারে

0 comments 255 views

সুমন প্রতিহারঃ সব যুগেই বিভিন্ন দেশের চিন্তাবিদরা চিন্তার মৌলিক উৎস নিয়ে আলোচনা করেছেন। যিশুর জন্মের কয়েকশো বছর আগে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, “আমি চিন্তা করার চেষ্টা করছি, তথ্য দিয়ে গুলিয়ে দিও না।” আঠারো শতকে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট মানুষের ভাবনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। সামনে নিয়ে আসেন ‘লজিক্যাল থিঙ্কিং’-এর তত্ত্ব। বিবরিত করেন কেমন করে চিন্তা করতে হয়। তিনি বলেছিলেন, তথ্য বড় কথা নয়, তথ্যকে সাজানোর ধরণটাই আসল। যদিও বিজ্ঞান মনে করে, প্রাথমিক তথ্য ছাড়া চিন্তার কোনো ভিত্তি নেই। বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ব্রিটিশ চিন্তাবিদ বার্ট্রান্ড রাসেল বলতেন, জটিল চিন্তাকে ভেঙে আগে ছোট ও সরল করতে হবে, যাকে তিনি বলতেন ‘লজিক্যাল অ্যাটোমিজম’। ৯৭ বছরে প্রয়াত এই দার্শনিক একগুঁয়ে, একমুখী চিন্তাকে হেঁচকা টানে থামিয়ে দেন। তাঁর মতে, দর্শনের গোড়ায় গণিতের ভিত থাকা জরুরি। আজগুবি ভাবনাকে আটকাতে দর্শন ও গণিতের এই সমন্বয় বড় প্রয়োজন। ঠিক যেমন ভাষা শেখার পর থেকেই মানুষ ভাবছে, মৃত্যুর পর কী? তবে এতে বিজ্ঞানের তথ্য গুঁজে দিলেই খেয়ালি মনের ডানা ঝাপটানো বন্ধ হয়ে যায়।

মৃত্যুর পর কী, এই ভাবনায় একটু পদার্থবিদ্যা, খানিক গণিত আর জীবনের বিজ্ঞান যোগ করলে কী দাঁড়ায়? বিদগ্ধ গবেষকরা এই বিষয়ে একটি গাণিতিক তত্ত্ব খাড়া করেছেন, ‘সিজারস লাস্ট ব্রেথ’ বা সিজারের শেষ নিঃশ্বাস। তত্ত্বটি বলছে, আমাদের প্রতি নিঃশ্বাসে অন্তত একটি পরমাণু রয়েছে যা একদা জুলিয়াস সিজারের শেষ নিঃশ্বাসের অংশ ছিল। সিজারের সেই নিঃশ্বাসে ছিল ২৫ সেক্সটিলিয়ন (১-এর পিঠে ২১টি শূন্য) পরমাণু। অন্যদিকে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মোট পরমাণুর সংখ্যা ১-এর পিঠে ৪৪টি শূন্য। আমরা প্রতি প্রশ্বাসে যে হাফ লিটার বাতাস নিই, তাতে পরমাণু থাকে ১-এর পিঠে ২২টি শূন্য। হিসাব কষলে দেখা যায়, আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসেই এই সিজারের পরামাণুর হিসেব মিলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা যায়। শুধু সিজার কেন, ডারউইনের পরমাণুও রয়েছে এই গণিতের তালিকায়। জীবিত মানুষের শরীরে প্রায় সাত অক্টিলিয়ন (৭-এর পিঠে ২৭টি শূন্য) পরমাণু থাকে।

মানুষের মৃত্যুতে এই পরমাণুর অন্ত্যেষ্টি হয় না। পরমাণুগুলোর ভবিষ্যৎই আমাদের মৃত্যু পরবর্তী অস্তিত্বের ভবিতব্য। একটি মোমবাতি ফুরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এই অবস্থা বুঝতে সাহায্য করতে পারে। মোমবাতি শেষ হওয়ার আগে ফোটন ছড়িয়ে পড়ে আলো হিসেবে, কিছু শক্তি বাতাসের উষ্ণতা বাড়ায় আর মোমের জমানো কার্বন বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে মিশে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করে। সেই কার্বন ডাই-অক্সাইডই আমাদের প্রশ্বাসের উপকরণ। তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র অনুযায়ী, শক্তির সৃষ্টি বা বিনাশ নেই, আছে শুধু রূপান্তর। তেমনই মোমবাতির প্রতিটি পরমাণু হারিয়ে যায় না, কেবল নিজেদের অন্যগামী করে। এই সূত্র ধরেই বিজ্ঞানীরা মেপে ফেলেছেন জীবিত মানুষের শরীরের শক্তির খতিয়ান। প্রতি মুহূর্তে মানবদেহে মজুত থাকে অন্তত ২৫০ গ্রাম এটিপি (ATP)। কসরত বা দৌড়ঝাঁপ করলে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫০০ গ্রামে। ২৫০ গ্রাম এটিপি দিয়ে অনায়াসেই জ্বলতে পারে চারটে এক ওয়াটের এলইডি। তবে এই যৎসামান্য শক্তিতেই শরীর চলে না। আদতে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় মানবদেহে প্রায় ৪০ থেকে ৭০ কেজি এটিপি তৈরি হয়, যা দিয়ে জ্বালানো সম্ভব ১২০০ ওয়াটের বাতি।

শক্তির এই বিপুল প্রবাহ কখনোই একবারে ঘটে না। কোষের অন্দরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়াতে কেজি কেজি শক্তি উৎপাদিত হয়। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই মাইটোকন্ড্রিয়ার আদিম পূর্বপুরুষ ছিল ২০০ কোটি বছর আগের এক স্বাধীনজীবী সাধারণ ব্যাকটেরিয়া। একদল বিজ্ঞানীর মতে, মাইটোকন্ড্রিয়া ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরলে ঢেউ তুলে আমাদের চেতনায় আলো জ্বালায়। বিষয়টি এতটাই গভীর যে, মাইটোকন্ড্রিয়াকে এখন কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাথেও জুড়ে দেখা হচ্ছে। হিসাব বলছে, মানব শরীরে মোট মাইটোকন্ড্রিয়ার সংখ্যা ১-এর পিঠে ১৭টি শূন্য বসালে যা হয় তত। স্রেফ একটি কোষের সবকটি মাইটোকন্ড্রিয়া মিলে প্রতিদিন ১০০০ কোটি এটিপি তৈরি করে। শরীরে কোষের সংখ্যা ৩৭ ট্রিলিয়ন (১-এর পিঠে ১২টি শূন্য)। এই দুইয়ের গুণফলই আমাদের শরীরের প্রতিদিনের ‘এটিপি ব্যালেন্স শিট’। উৎপন্ন এই শক্তির প্রায় ২০ শতাংশ খরচ হয় মস্তিষ্কের দেখভালে। মস্তিষ্কে একটিমাত্র চিন্তার লালন-পালন করতে ন্যূনতম খরচ হয় ১ কোটি এটিপি। স্নায়ুর মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দিতে সোডিয়াম আয়নকে ঠেলে বাইরে বের করতে হয়, আর সেই পাম্প চালানোর শক্তি জোগায় এই এটিপি-ই। গভীর কোনো চিন্তা মাথায় ঘুরলে মস্তিষ্ক যেন ‘ব্লটিং পেপারের’ মতো সব শক্তি শুষে নেয়। মানব শরীর আসলে প্রবাহমান এটিপির এক আবহমান সিম্ফনি। নিখুঁত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন, প্রতি বছর শরীরের ৯৮ শতাংশ পরমাণু পুনঃস্থাপিত হয়। দশ বছর অন্তর মানব শরীরের প্রায় সমস্ত পরমাণুই বদলে যায় নতুন পরমাণুতে। প্রতি সপ্তাহে বদলে যায় পাকস্থলীর পর্দা, মাত্র পাঁচ দিনে পাল্টে যায় জিভের স্বাদ কোরক। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, আসলে কী দিয়ে তৈরি এই মানুষ?

মানবদেহের উপাদানের রসায়নটা বেশ চমকপ্রদ। ভরের হিসেবে আমাদের শরীরে অক্সিজেন ৬৫%, কার্বন ১৮%, হাইড্রোজেন ১০% এবং নাইট্রোজেন ৩%। বাকি ৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে ২% ক্যালসিয়াম ও ১% ফসফরাস। অবশিষ্ট এক শতাংশে জায়গা করে নিয়েছে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, কপার, আয়োডিন ও আয়রনের মতো উপাদান। গুরুত্বের নিরিখে প্রত্যেকেই অনন্য। আবার পরমাণুর সংখ্যার বিচারে হাইড্রোজেন ৬৩%, অক্সিজেন ২৬% এবং কার্বন ১২%। আমাদের শরীরের মূল কাঠামোটি কার্বনের। এই কার্বন শরীরে ঢোকে খাবারের মাধ্যমে; গাছ যা সংগ্রহ করে বায়ুমণ্ডল থেকে। আর বায়ুমণ্ডলে কার্বনের উৎস? আমাদের নিঃশ্বাস থেকে শুরু করে আগুন, সবই কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ায়। মানুষের মৃত্যুর রহস্য অনুসন্ধানে তাই এই কার্বনের জন্ম-বৃত্তান্ত জানা একান্ত প্রয়োজন।

পরমাণুর জন্মের ইতিহাস জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৪০০ কোটি বছর আগের ‘বিগ ব্যাং’ বা মহা-বিস্ফোরণের লগ্নে। সেই মুহূর্ত, যার আগে বিজ্ঞানও অসহায়। সময় যেখানে শূন্য, সেখানে বিজ্ঞানের কল্পনাও থমকে যায়। গণিতের ঔদ্ধত্য সেখানে এক বিশেষ বিন্দুতে পৌঁছায়, এক সেকেন্ডকে যদি ১-এর পিঠে ৪৩টি শূন্য বসিয়ে ভাগ করা হয়, তবে সেই অতি ক্ষুদ্র সময়ে ফিজিক্সের যাবতীয় সমীকরণ ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব খেই হারিয়ে ফেলে। সেই সন্ধিক্ষণে মহাবিশ্বের চারটি পৃথক বল মিলেমিশে একাকার ছিল। বিজ্ঞানের এই অসহায়তা চলতেই থাকে। সময় শুরুর এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে ঠিক কী ঘটেছিল, তা আজও রহস্য। তবে বিজ্ঞানীরা একে ‘কোয়ার্কস-গ্লুয়ন প্লাজমা’ অবস্থা বলেন। হিগস ফিল্ডের অনুপস্থিতিতে তখন সবকিছুই ছিল ভরহীন।

মহা-বিস্ফোরণের প্রথম এক সেকেন্ডের মধ্যেই তাপমাত্রা অভাবনীয়ভাবে কমতে শুরু করে। এক সেকেন্ড শেষে উষ্ণতা দাঁড়ায় ৫০০ কোটি কেলভিনে। সেই প্রচণ্ড ডামাডোলে ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন থাকলেও অসহ্য গরমে পরমাণু গঠন সম্ভব ছিল না। সৃষ্টির আদিতে মহাবিশ্ব এমন দুঃসময়ও পার করেছে। তিন মিনিট পর জন্ম নিল হিলিয়াম, আর প্রথম পরমাণু হিসেবে আবির্ভূত হলো ‘ডিউটেরিয়াম’। ২০ মিনিট পর আদিম বলযজ্ঞ শান্ত হলে দেখা গেল মহাবিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ হাইড্রোজেন আর বাকিটা হিলিয়াম। ভারী মৌল বলতে ছিল সামান্য লিথিয়াম; নাইট্রোজেন, অক্সিজেন বা কার্বনের তখনও চিহ্ন নেই। বিস্ফোরণের ২০ কোটি বছর পর হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম মেঘ ঘনীভূত হয়ে জন্ম নিল প্রথম নক্ষত্ররা। দানবীয় সেই নক্ষত্রদের হৃদপিণ্ডে ১৫০ লক্ষ ডিগ্রি উষ্ণতায় হাইড্রোজেন মিলে তৈরি হতে শুরু করল হিলিয়াম। হাইড্রোজেন ফুরিয়ে এলে উত্তাপ আরও বাড়ল, আর তিনটি হিলিয়াম অণু জোটবদ্ধ হয়ে জন্ম দিল প্রাণের কারিগর— কার্বনকে। মৃত তারার বুকেই জন্ম নিল মহার্ঘ এই পরমাণু। এরপর এল অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও নিয়ন। মহাজাগতিক সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে তৈরি হলো সোনা, প্ল্যাটিনাম ও ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌল। এই নাক্ষত্রিক অবশেষ থেকেই সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে জন্ম নিল আমাদের সূর্য ও পৃথিবী। আমাদের শরীরের প্রতিটি কণা আসলে সেই প্রাচীন তারারই অংশ।

মানুষের শরীরের পরমাণুগুলো চিরস্থায়ী নয়। প্রতি দশ বছর অন্তর আমাদের দেহের প্রায় সব পরমাণু বদলে যায়; কেবল মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সের কিছু নিউরন অপরিবর্তিত থাকে। আমাদের ছেড়ে যাওয়া পরমাণু হয়তো আজ কোনো গাছ, পাখি বা অন্য কারোর নিঃশ্বাসের অংশ। বিশ্ব চরাচর আসলে কণার সমুদ্র, আর আমাদের অস্তিত্ব সেখানে মুহূর্তের বুদবুদ মাত্র। পদার্থবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী মহাবিশ্বে প্রতিনিয়ত বিশৃঙ্খলা বা ‘এনট্রপি’ বাড়ছে। প্রতিটি প্রাণ আসলে একটি পৃথক সিস্টেম, যা আমৃত্যু লড়াই করে নিজের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে। আমরা খাবার খাই মূলত কম এনট্রপির সুশৃঙ্খল কার্বন সংগ্রহের জন্য। মৃত্যুর সাথে সাথেই বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে এই লড়াই থেমে যায়।

আমাদের দেহের কার্বন বা জলের হাইড্রোজেন-অক্সিজেন একসময় ডাইনোসরের শরীরেও ছিল। আজ যা আমার বা তোমার দেহে, লক্ষ বছর পর তা হয়তো অন্য কোনো প্রাণীর অঙ্গে ঠাঁই নেবে। আমরা এভাবেই অতীতের সাথে নিবিড়ভাবে আর ভবিষ্যতের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। মৃত্যুর পর অক্সিজেনের অভাবে কোশগুলো দ্রুত মারা পড়ে, আর শরীর গঠনের কারিগর এনজাইমগুলোই তখন শরীর ভাঙতে শুরু করে। ব্যাকটেরিয়ার দল শরীরকে কুরে কুরে খায়। কার্বন মেশে বাতাসে, নাইট্রোজেন পাতালে, আর হাইড্রোজেন জলীয় বাষ্প হয়ে আকাশে ওড়ে। মানুষের নিজের বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। জটিল মৌলগুলো ভেঙে সরল হয়, মিশে যায় মাটিতে। কণার এই আবহমান প্রবাহে আমাদের অস্তিত্ব কেবল একটি নিমিত্ত মাত্র। আত্মা যদি এই অবিনশ্বর পরমাণুর মাঝে পরমাত্মাকে খুঁজে পায়, তবে বিজ্ঞানেরও হয়তো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু পরমাণু কি সত্যিই অমর? মহাবিশ্বের যখন বার্ধক্য আসবে (১-এর পিঠে ১৪টি শূন্য বছর পর), সূর্য হবে শ্বেতবামন আর আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বিলীন হয়ে যাবে। ১-এর পিঠে ৩৭টি শূন্য বছর পর টুপটাপ মিলিয়ে যাবে তথাকথিত ‘অমর’ প্রোটনগুলোও। উড়ে যাবে চিরন্তন সব পরমাণু। অবশিষ্ট থাকবে শুধু কিছু ফোটন আর ইলেকট্রন। অনন্ত বিশ্ব তখন এক নিথর, নিস্তব্ধ ও পরম শীতল অন্ধকারে ডুবে যাবে। গবেষণা বলছে, এই চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা বা এনট্রপির সর্বোচ্চ অবস্থাই নাকি মহাবিশ্বের গোপন লক্ষ্য। বিশৃঙ্খলাতেই মহাবিশ্বের মুক্তি আর সেদিন মহাবিশ্ব বিজ্ঞানের কোনো নিয়মই মানবে না।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles