Home সুমন নামা মার্ক টালিঃ আ-নখশির এক ভারত-প্রেমিক

মার্ক টালিঃ আ-নখশির এক ভারত-প্রেমিক

by Suman Chattopadhyay
0 comments 400 views

সুমন চট্টোপাধ্যায়: আটের দশকের মাঝামাঝি আমি যখন নিয়মিত পাঞ্জাবের অশান্তি কভার করতে যেতাম, মার্ক টালির সঙ্গে অবধারিতভাবে দেখা হয়ে যেত। কখনও স্বর্ণ মন্দিরের চাতালে, খালি পা, পকেটের রুমাল মাথায় ফেট্টি করে বাধা, হাতে টেপ-রেকর্ডার, একটা ছোট মাইক, মুখে অনাবিল মিষ্টি হাসি। এত অমলিন, এত মনোমুগ্ধকর, এতো নির্মল হাসিমুখের মানুষ আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি।

মার্কের হাসির স্বচ্ছতা ছিল তাঁর স্ফটিক-সদৃশ অন্তরের বিশ্বস্ত প্রতিবিম্ব। খবর করতে এসে তিনি পারতপক্ষে কাজ নিয়ে কথাই বলতেননা, কলকাতার তত্ত্ব-তালাশ করতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে-ট্রাম চলছে কিনা, মাসে কদ্দিন করে বনধ হচ্ছে, ব্রডওয়ে পানশালায়। সন্ধ্যা নামলে আগের মতো ভিড় হয় কি হয়না, হাতে টানা রিকশওয়ালারা আছে না উঠে গেছে, আই এফ এ শিল্ডে কারা ফেভারিট কিংবা কোন দোকানের মিষ্টি দই এখন সবচেযে সুস্বাদু। দেশ স্বাধীন হওয়ার বারো বছর আগে কলকাতার স্বেতাঙ্গ পাড়ায় মার্ক টালির জন্ম হয়েছিল। ইংরেজ চলে গিয়েছে, বিবিসি ছেড়ে  দিতে বাধ্য হয়েছেন টালি তবু ভারত ছাড়েননি। যে মাটিতে জন্ম। সেখানেই সমাধিস্থ হওয়ার বাসনা সফল হোল এই কিংবদন্তী প্রতিবেদকের।

তিনি এমন একজন মানুষ যাঁর জীবনের সঙ্গে “ভারত” শব্দটি কোনো ভৌগোলিক বা পেশাগত সংযোজন নয়, বরং একটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা নৈতিক আবাস। তিনি এখানে পর্যটক হিসেবে আসেননি, পর্যবেক্ষক হিসেবে থেকেও যাননি, আবার পুরোপুরি আত্মীকরণেও নিজেকে সঁপে দেননি। তাঁর ভারতবাস আসলে এক দীর্ঘ, জটিল, অসমাপ্ত সহাবস্থান যেখানে বোঝাপড়া আছে, ভুল বোঝাবুঝি আছে, হতাশা আছে, ক্ষোভ আছে, আবার গভীর দায়বদ্ধতাও আছে।

মার্ক টালি জন্মসূত্রে ব্রিটিশ। তাঁর ভাষা, উচ্চারণ, আচরণ, সবেতেই ইংরেজ অ্যারিস্টোক্রেসির ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর মনোজগতের ভেতরে যে দেশটি সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে আছে, তা ইংল্যান্ড নয়- ভারত। এই বাস্তবতাটা তিনি নিজে কখনও নাটকীয়ভাবে উচ্চারণ করেননি, কিন্তু তার প্রতিটি লেখা, প্রতিটি রিপোর্ট, প্রতিটি দীর্ঘ নীরব পর্যবেক্ষণ সেই কথাই বলে।

ভারতে তাঁর আগমন কোনও রোমান্টিক সিদ্ধান্ত ছিল না। বিবিসির কাজের সূত্রে তিনি এখানে আসেন, দিল্লিতে থাকেন, সরকারি বিবৃতি শোনেন, রাজনৈতিক সঙ্কট কভার করেন। কিন্তু খুব দ্রুতই তাঁর দৃষ্টি রাজধানীর সীমা ছাড়িয়ে যায়। দিলি তাঁর কাছে কখনও ভারত হয়ে ওঠেনি। তিনি বুঝেছিলেন, ভারতের হৃদস্পন্দন ক্ষমতার করিডোরে নয়, তার গ্রামগুলোতে, ছোট শহরগুলোতে, উপেক্ষিত প্রান্তে।

 

মার্ক টালি জন্মসূত্রে ব্রিটিশ। তাঁর ভাষা, উচ্চারণ, আচরণ, সবেতেই ইংরেজ অ্যারিস্টোক্রেসির ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর মনোজগতের ভেতরে যে দেশটি সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে আছে, তা ইংল্যান্ড নয়- ভারত। এই বাস্তবতাটা তিনি নিজে কখনও নাটকীয়ভাবে উচ্চারণ করেননি, কিন্তু তাঁর প্রতিটি লেখা, প্রতিটি রিপোর্ট, প্রতিটি দীর্ঘ নীরব পর্যবেক্ষণ সেই কথাই বলে।

 

এই উপলব্ধিটাই তাঁকে আলাদা করেছে। তিনি কখনও ভারতকে “একটি গল্প” বানাতে চাননি। বরং ভারতকে তিনি দেখেছেন এক চলমান বাস্তবতা হিসেবে, যার কোনও শেষ নেই, কোনও চূড়ান্ত সংজ্ঞা নেই। এখান থেকেই জন্ম নেয় তাঁর সেই বিখ্যাত উপলব্ধি: ভারতের বাক্যে পূর্ণচ্ছেদ নেই। এখানে ঘটনা শেষ হয় না, সঙ্কট শেষ হয় না, ইতিহাস শেষ হয় না। সবকিছু চলতে থাকে, কখনও বিশৃঙ্খলভাবে, কখনও নিষ্ঠুরভাবে, আবার কখনও বিস্ময়কর সহনশীলতায়।

মার্ক টালির লেখায় ভারত কখনও আদর্শ রাষ্ট্র নয়। এখানে প্রশাসন অকার্যকর, রাজনীতি নোংরা, ক্ষমতা নির্দয়। তিনি এই সত্যগুলো এড়িয়ে যাননি। বরং তিনি এগুলোকে খুব স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন-কোনও চিৎকার ছাড়াই। তাঁর ভাষা কখনও উত্তেজিত নয়, কিন্তু সেই শান্ত স্বরের মধ্যেই রয়েছে গভীর অভিযোগ। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্র প্রায়শই ব্যর্থ হয়, কিন্তু সমাজ তবুও টিকে থাকে।

এই সমাজ-রাষ্ট্র স্বন্দ্বই তাঁর ভারতচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র যখন নিষ্ঠুর হয়, তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের মতো করে নৈতিকতার ক্ষুদ্র পরিসর গড়ে তোলে। এই ক্ষুদ্র পরিসরগুলোই ভারতের আসল শক্তি। কোনও সংবিধানিক অনুচ্ছেদ নয়, কোনও অর্থনৈতিক সূচক নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের নীরব মূল্যবোধ।

মার্ক টালি ধর্মের প্রশ্নে বিশেষভাবে সংবেদনশীল ছিলেন। তিনি ধর্মকে কখনও উপহাস করেননি, আবার ধর্মীয় রাজনীতিকে কখনও প্রশ্রয়ও দেননি। তাঁর চোখে ভারতের ধর্মীয় ঐতিহ্য মানে বহুত্ব, অস্পষ্টতা, পরস্পরবিরোধী বিশ্বাসের সহাবস্থান। এই বহুত্বকে একক পরিচয়ে রূপান্তর করার রাজনৈতিক প্রয়াস তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করেছে। তিনি বারবার দেখিয়েছেন, কীভাবে ধর্ম যখন ক্ষমতার হাতিয়ার হয়, তখন তা সমাজকে ভেঙে দেয়।

তাঁর লেখায় অযোধ্যা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, রাজনৈতিক উন্মাদনা-এসব এসেছে খুর ঠান্ডা মাথায়। তিনি কখনও স্লোগান লেখেননি, কখনও পক্ষ নিয়ে চেঁচাননি। কিন্তু তাঁর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে -ভারতের সবচেয়ে বড় বিপদ তার বহুত্ব হারানোর ঝুঁকি। তিনি মনে করতেন, ভারত যদি পরিচ্ছন্ন, একরৈখিক, “শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে ওঠে, তাহলে সে আর ভারত থাকবে না।

মার্ক টালির ভারতপ্রেম কোনও আবেগঘন দেশাত্মবোধ নয়। তিনি ভারতের প্রতি দায়বন্ধ ছিলেন বলেই এত কঠোরভাবে লিখেছেন। তিনি কখনও বালননি ভারত মহান, বরং বলেছেন ভারত জটিল। এই জটিলতাই তাঁর কাছে ভারতের সত্য। তিনি দেখেছেন, এই দেশ বারবার নিজেকেই ব্যর্থ করে আবার নিজেকেই নতুন করে গড়ে তোলে।

তিনি গ্রাম নিয়ে লিখেছেন, শহর নিয়ে লিখেছেন, রাজনীতি নিয়ে। লিখেছেন, কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে রেখেছেন মানুষকে সংখ্যা হিসেবে নয়, বিমূর্ত শ্রেণি হিসেবে নয়, বরং নৈতিক সত্তা হিসেবে। তার লেখায় দারিদ্রা কখনও কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; তা মর্যাদার প্রশ্ন। ক্ষমতা কখনও কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়, তা নৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র।

 

ভারতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও সহজ ছিল না। তাঁকে কখনও সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে, কখনও অতিরিক্ত প্রশংসায় অস্বস্তিতে ফেলা হয়েছে। কিন্তু তিনি নিজে কখনও পরিচয়ের নিরাপত্তা চাননি। তিনি জানতেন, এই দেশে সত্যিকারের অবস্থান মানে সবসময়ই অস্বস্তিকর অবস্থান।

বিবিসি থেকে অবসর নেওয়ার পরেও তাঁর ভারতচিন্তা থামেনি। বরং তখন তাঁর লেখায় এক ধরনের বিষণ্ণতা বাড়ে। তিনি দেখেন, ভারত দ্রুত বদলাচ্ছে-কিন্তু সেই বদল সবসময় মুক্তির দিকে নয়। তাঁর আশঙ্কা ছিল, দ্রুততার মোহে ভারত নিজের ধীর নৈতিক বোধ হারাতে পারে। তবু তিনি হতাশায় ডুবে যাননি। কারণ তিনি জানতেন, ভারত কখনও একরৈখিক পথে চলে না।

মার্ক টালির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এই যে তিনি ভারতকে উদ্ধার করতে চাননি। তিনি উপদেশ দিতে আসেননি। তিনি শুধু দেখেছেন, বুঝেছেন, লিখেছেন। এই সংযম, এই বিনয়ই তাঁকে আলাদা করেছে। তিনি জানতেন, এই দেশ তাকে সম্পূর্ণ নিজের করবে না, আর তিনিও এই দেশকে নিজের মতো করে বানাতে পারবেন না।

এই সম্পর্কের মধ্যেই আছে তাঁর জীবনের মর্মস্পর্শিতা। একজন মানুষ, যিনি জন্মসূত্রে অন্য দেশের, কিন্তু মানসিকভাবে এক বহুমাত্রিক সভ্যতার সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলেছেন, কোনও নিশ্চয়তা ছাড়া, কোনও পুরষ্কারের প্রত্যাশা ছাড়া। তাঁর ভালোবাসা দাবি করে না, তাঁর সমালোচনা অপমান করে না।

মার্ক টালি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব সাক্ষী। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, একটি দেশকে ভালোবাসা মানে তার ত্রুটি অস্বীকার করা নয়; বরং সেই ত্রুটির দিকেই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা। তাঁর ভারতচিন্তা তাই কোনও স্মৃতিমেদুর আবেগ নয়, বরং এক দীর্ঘ নৈতিক সাধনা।

এই সাধনাই তাঁকে মর্মস্পর্শী করে তোলে। কারণ তিনি জানতেন, ভারত কখনও সম্পূর্ণ হবে না। আর সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই তার সবচেয়ে গভীর মানবিক সত্য লুকিয়ে আছে।

বৌদ্ধিক স্তরে নিজেকে উন্নীত করে মার্ক বইপত্র লেখা পুরোদমে শুরু করেন বিবিসি ছাড়ার পরে। তার আগে টানা তিরিশ বছর তিনি বিবিসির প্রতিবেদক হয়ে এদেশে লম্বা ইনিংস খোলছেন। বলতে ভুল হোল, নিজের সময় মার্ক টালি ছিলেন ভয়েস অব ইন্ডিয়া’ গোটা দেশ বিনা  বাক্যব্যয়ে তাঁর খবরকে বেদজ্ঞানে বিশ্বাস করত।

 

কার খবর? বিবিসির।

কে দিয়েছে? মার্ক টালি।

তার মানে অভ্রান্ত হতেই হবে। (সাংবাদিক টালির স্মৃতিচারণ অন‍‍্য রিপোর্টে)

journalist mark tully

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles