ভোটার তালিকার ‘Special Intensive Revision’ প্রক্রিয়ার আওতায় পাঠানো স্বল্প সময়সীমার নোটিস বেঙ্গালুরুতে কর্মরত পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার শ্রমিককে হঠাৎ গ্রামে ফিরতে বাধ্য করেছে। কাজ, মজুরি ও নাগরিক পরিচয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর অনিশ্চয়তা।

ভোটার লিস্টে নাম তুলতে পারলে ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই উদ্বেগ ও আতঙ্ক আজ গোটা রাজ্য জুড়ে। সেই আতঙ্কের সংক্রমন এবার প্রবাসী পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যেও দ্রুতহারে ছড়িয়ে পড়ছে। যেমন এই জানুয়ারি মাসেই এক বাঙ্গালোর থেকে সেখানে কর্মরত ৯৪০০ বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসেছেন। সাংবাদিকদের এই তথ্য দিয়েছেন কর্নাটক বেঙ্গলি কল্যাণ সমিতি।
এমন অবিশ্বাস্য তাড়াহুড়োর কারণ পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছে হাজিরার যে নোটিশ পাঠানো হয়েছে তাতে বরাদ্দ সময়টা নেহাতই কম। ফলে কাজ থেকে অকস্মাৎ ছুটি নিতে বাধ্য হয়ে, উপার্জনে ছেদ পড়ার অনাকাঙ্খিত দুর্যোগ বলে মেনে নিয়ে এঁদের লক্ষ্যই মুহূর্তে একটাই- রেল স্টেশনে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গগামী যে কোনও ট্রেনে একটি টিকিট কেটে উঠে পরা।

প্রশ্ন হোল এঁরা কী স্বস্থানে থেকে অনলাইনে ফর্ম ফিল আপ করতে পারতেননা? কাগজে কলমে হয়তো পারতেন যদি তাঁদের সেই যোগ্যতা থাকত। তাছাড়া ফর্মের ভাষা এঁদের কাছে চরম দুর্বোধ্য পারতেননা? কাগজে কলমে হয়তো পারতেন যদি তাঁদের সেই যোগ্যতা থাকত। তাছাড়া ফর্মের ভাষা এঁদের কাছে চরম দুর্বোধ্য ঠেকছে। ফলে সাবধানের মার নেই মনে করে তাঁরা ঝুঁকি নেওয়ার বদলে ভিটেমাটিতে ফিরে নিশ্চিন্তে কাজটা সেরে ফেলা মনস্থ করছেন।
এই শ্রমিকদের বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা। কেউ ক্ষৌরকর্ম করেন, কেউ রাঁধুনি, কেউ গ্যারাজ মালিক, কেউ গৃহকর্মী, গত কয়েক বছর ধরে বেঙ্গালুরুতে নিয়মিত কাজ করে পরিবার চালাচ্ছেন। এমন শান্তির জীবনে অশান্তির সূত্রপাত ১৪ জানুয়ারি যেদিন থেকে তাঁদের কাছে একের পর এক এসআইআর নোটিস পৌঁছতে শুরু করে। নোটিসে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ নিজ জেলার ভোটার যাচাই কেন্দ্রে হাজির না হলে তাঁদের নাম ‘অমীমাংসিত’ হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং সংশোধনী পর্ব শেষে খসড়া ভোটার তালিকায় সেই নাম আদৌ থাকবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এই সতর্কবার্তাই গোটা পরিস্থিতিকে আতঙ্কের দিকে ঠেলে দেয়। বেঙ্গালুরুতে থাকা শ্রমিকদের বলা হয়, যদি তাঁরা ফিরে গিয়ে হাজিরা না দেন তবে তাঁদের ভোটার পরিচয় ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও নির্মম। অধিকাংশ শ্রমিক দৈনিক মজুরিভিত্তিক বা স্বল্প বেতনের কাজ করেন। হঠাৎ করে বিমানের টিকিট, ট্রেনভাড়া, পরিবারের খরচ, এত কিছুর ব্যবস্থা কয়েক দিনের মধ্যে করা কার্যত অসম্ভব। বহু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিয়োগকর্তার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিতে হয়েছে। এর অর্থ, শুধু ভ্রমণের খরচই নয়, কাজ ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার ফলে যে মজুরি হারাচ্ছেন, তার দায়ও তাঁদের কাঁধেই এসে পড়ছে।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হল, নোটিস দেওয়া হয়েছে মূলত পুরুষদের -পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যদের। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা সকলেই বেঙ্গালুরুতে থাকলেও প্রশাসনিক সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন শুধু কর্মক্ষম বয়সের পুরুষ। নোটিসে যেসব অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ঠিকানার ধারাবাহিকতা, পুরনো ভোটার তালিকায় নামের অনুপস্থিতি বা পারিবারিক নথিতে সংযোগের ঘাটতি। পরিযায়ী শ্রমিকদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন রাজ্যের বাইরে থাকার কারণেই তাঁদের নথিতে এই ফাঁকফোকর’ তৈরি হয়েছে, যা প্রশাসনিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলেও, অল্প সময়ের মধ্যে তা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব।
এই পরিস্থিতিতে কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহায়তার ঘটনাও সামনে এসেছে। বেঙ্গালুরুতে গৃহকর্মীর কাজ করা রেশমা বানু জানান, পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি বিধানসভা এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা নোটিসপ্রাপ্ত শ্রমিকদের জন্য বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাঁর নিজের ক্ষেত্রেও স্থানীয় এক নেতার সহায়তায় তিনি বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতা পর্যন্ত বিমানে ফেরেন তারপর ট্রেনে নদিয়ায় পৌঁছন। এই সহযোগিতা না পেল অল্প সময়সীমার মাধ্য যাচাই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া বড় শ্রমিকের পক্ষেই সম্ভব হত না।
কথা বলতে বলতে রেশমা বানু ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশাধনী আইন ও এনআরসি-বিরোধী আন্দোলনের সমায়র সাঙ্গ বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টানেন। সে সময় বহু পরিযায়ী শ্রমিক গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন, কিন্তু তখন তা ছিল রাজীনতিত আতঙ্ক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রতিক্রিয়া। এবারে, তার কথায়, আতঙ্কোর উৎস সরাসরি প্রশাসনিক ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা, যা ভবিষ্যতে নাগরিক পরিচয়ের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে।
নদিয়ার বাসিন্দা সাহেব আলি শেখের অভিজ্ঞতা এই প্রক্রিয়ার মানবিক মূল্য আরও স্পষ্ট করে তোলে। বেঙ্গালুরুর কুন্দালাহল্লিতে রাঁধুনির কাজ করা সাহেব জানান, নয় জনের পরিবার শহরে থাকলেও নোটিস এসেছে শুধু তাঁর ও তাঁর ভাইয়ের নামে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত কাজ করা সত্ত্বেও তাঁকে ২৬ জানুয়ারির মধ্যে হাজিরা দিতে বলা হয়। অল্প সময়, অর্থাভাব, সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ২৫ জানুয়ারি নদিয়ায় পৌঁছন, নিয়োগকর্তার কাছ থেকে নেওয়া অগ্রিম টাকায় বিমানে কলকাতা, তারপর সড়কপথে গ্রাম।
আরও জটিল অভিজ্ঞতার কথা বলেন বালাগেরেতে গ্যারাজ চালানো সাহরিফ উল শেখ। তিনি সমস্ত নথি এমনকি পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পরও জানতে পারেন, তাঁর নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে পারিবারিক রেকর্ডের সামঞ্জস্যের ওপর। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবার নাম নেই, যদিও দাদুর নাম রয়েছে। ফলে তাঁর ক্ষেত্রে ‘ম্যাপিং’ করাটা মোটেই কঠিন কাজ ছিলনা। এই একটি তথ্যই তাঁর নাগরিক পরিচয়কে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বেঙ্গালুরু থেকে হাওড়া হয়ে নদিয়া পৌঁছতে তাঁর ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু শারীরিক ক্লান্তির নয় ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগেরও প্রতীক।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছে-পরিযায়ী শ্রমিকদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ফাঁক কোথায়? কাজের সন্ধানে রাজ্যের বাইরে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা কি শেষ পর্যন্ত তাঁদের নাগরিক অধিকারকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে? বেঙ্গালুরু থেকে নদিয়া-মুর্শিদাবাদে এই হঠাৎ প্রত্যাবর্তন শুধু কয়েক হাজার মানুষের যাত্রা নয়, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের সঙ্গে ভোটাধিকার ও নাগরিক নথির সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর, অস্বস্তিকর প্রশ্নচিহ্ন।