বাংলাস্ফিয়ার: “প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই যখন নতুন নতুন হুমকির খবরে, তখন সমাধানের কথা ভাবা মোটেও সহজ নয়।”
১৪ জানুয়ারি ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কেরাসমুসেনের এই সংক্ষিপ্ত অথচ গম্ভীর মন্তব্যই পরিস্থিতির সারমর্ম বুঝে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।। তার কিছুক্ষণ আগেই ওয়াশিংটনে তিনি ও তাঁর এক সহকর্মী একটি অস্বস্তিকর, উত্তপ্ত বৈঠক সেরে এসেছেন, আমেরিকার পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্সের সঙ্গে।

Lars Lokke Rasmussen
৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে আমেরিকা গোপনে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের উসকে দিয়েছেন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর পুরনো বাসনা যাকে রাসমুসেন স্পষ্ট ভাষায় “দখল” বলেই উল্লেখ করেন। বৈঠকের আগেই ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, দ্বীপটি যদি “পুরোপুরি আমেরিকার হাতে না আসে তবে তা আমাদের কাছে গ্রহনযোগ্য হবেনা।” হবে অন্যথায় গ্রিনল্যান্ড নাকি শেষ পর্যন্ত রাশিয়া বা চিনের কবলে গিয়ে পড়বে।
দু’পক্ষ শেষ পর্যন্ত “মতানৈক্যে একমত” হয়েছে, এই শব্দবন্ধেই বৈঠকের সার তুলে ধরেন রাসমুসেন। গ্রিনল্যান্ডের মর্যাদা নিয়ে তাঁর সরকার যে একচুলও নড়বে না, তেমন কোনও ইঙ্গিত তিনি দেননি। ডেনমার্কের অংশ হলেও গ্রিনল্যান্ড একটি স্বশাসিত অঞ্চল। আপাতত তাৎক্ষণিক কোনো সঙ্কট চোখে না পড়লেও, ন্যাটোর এক সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ গোটা ইউরোপে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতলবটা কী তা বুঝতে পারাটা ভগবানের পক্ষেও অসম্ভব। তিনি কি গ্রিনল্যান্ডবাসীদের ডেনমার্ক থেকে থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান?নাকি দ্বীপটি কিনে নেওয়ার পথ খুঁজছেন? না কি সরাসরি সামরিক দখলের কথাই তাঁর মাথায় ঘুরছে? ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ মরিয়া হয়ে কৌশল সাজাচ্ছেন। তাদের সামনে মূলত তিনটি রাস্তা—চাপ কমানো, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানো। এই মুহূর্তে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে ট্রাম্পের তৈরি করা নিরাপত্তা-উদ্বেগকে প্রশমিত করার চেষ্টা। এই যুক্তি তুলে ধরে যে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই এসব প্রশ্নের মীমাংসা সম্ভব। রাসমুসেন জানিয়েছেন, আর্কটিক নিরাপত্তা নিয়ে একটি “উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্স” গঠন করা হবে। ন্যাটোর অন্দরেই ব্রিটেন ও জার্মানি প্রস্তাব দিয়েছে “আর্কটিক সেন্ট্রি” নামে একটি নৌ-নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ট্রাম্প-তুষ্টির চেনা কৌশল, এই স্বীকারোক্তির মধ্যে দিয়ে যে উত্তর মেরু অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়।
“ উনি যা বলেন তার মধ্যে সর্বদা একটু হলেও সত্য লুকিয়ে থাকে,” মন্তব্য করেন রাসমুসেন।
কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্নে সেই যুক্তি খাটে না। ১৯৫১ সালে ডেনমার্কের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এক চুক্তি অনুযায়ী, আমেরিকা দ্বীপটিতে যত ইচ্ছে সেনা মোতায়েন করতে পারে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সেখানে ছিল বড়সড় সামরিক উপস্থিতি, পরে তা সঙ্কুচিত হয়ে এখন নেমে এসেছে দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি মাত্র ঘাঁটিতে। সেখানে এখন ২০০ জনেরও কম সেনা রয়েছে, মূলত মহাকাশ নজরদারি ও আগাম সতর্কতা রাডারের দায়িত্বে। গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই পড়ে।
মার্কিন প্রশাসনের তরফে বৃহত্তর নিরাপদ বলে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে সেটিও অতিরঞ্জিত। য “গ্রিনল্যান্ডের জলসীমায় ন্যাটোর সামরিক অভিযানের প্রকৃত কোনো নিরাপত্তাগত প্রয়োজন নেই,” বলছেন অসলোস্থিত ফ্রিডটিয়ফ ন্যানসেন ইনস্টিটিউটের আর্কটিক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ওস্তহাগেন। দ্বীপের চারপাশের সমুদ্র “রুশ ও চিনা জাহাজে ছেয়ে গেছে”,ট্রাম্পের এমনতরো কুযুক্তিরও বাস্স্তব কোনও ভিত্তি
নেই।। ডেনমার্ক এর আগে গ্রিনল্যান্ডে চিনা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছিল, এখন তা স্তিমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্কটিক অঞ্চলের প্রকৃত গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যা রয়েছে অন্যত্র—আলাস্কা সহ আরও কিছু এলাকায়। আর যে বিরল খনিজ ও অন্যান্য সম্পদের দিকে ট্রাম্পের লোভ, সেগুলি উত্তোলনের খরচ এতটাই বেশি যে তা প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। খননের অধিকার পেতে মার্কিন সংস্থাগুলির
ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব বদলের কোনো প্রয়োজনই নেই, তাদের আগ্রহও বিশেষ দেখা যাচ্ছে না।
তবু এসব যুক্তিতে প্রেসিডেন্টের মন গলছে না। তাই “মালিকানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”, তাঁর মুখ নিঃসৃত এই প্রচ্ছন্নহুমকিকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া শ্রেয়। এক প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিকের মতে, গ্রিনল্যান্ড দখলের বাসনা ট্রাম্পের “উত্তরাধিকার-আসক্তির” অংশ। সেক্ষেত্রে ইউরোপকে ভাবতে হবে দ্বিতীয় দ্বিতীয় বিকল্পের কথা—ট্রাম্পের সম্ভাব্য দখলদারির চেষ্টাকে কীভাবে প্রতিহত করা যায়। ব্রাসেলসসহ বিভিন্ন জায়গায় নানা কড়া কথা শোনা যাচ্ছে। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকার সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তির কিছু অংশ মুলতুবি রাখা কিংবা মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে চাপে ফেলা। শোনা যাচ্ছে প্রত্যাঘাতের আরও উপায়ের কথা। ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সব বন্ধ করে দেওয়া হবে বা মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে দেওয়া।
কিন্তু এইসব প্রস্তাবের পক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড় করা কঠিন, বলছেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স-এর ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা পরিচালক জেরেমি শ্যাপিরো। এর বেশির ভাগই আসলে প্রতিশোধ, প্রতিরোধ নয়।
তাঁর মতে, বরং এমন পদক্ষেপ ভাবা উচিত যা হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্তগ্রহণের হিসেবটাই বদলে দিতে পারে। যেমন গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় সেনার পর্যায়ক্রমিক উপস্থিতি, স্থানীয়দের সম্মতি ছাড়া খনিজ উত্তোলন করলে মার্কিন সংস্থার উপর আগাম নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা, কিংবা প্রভাবশালী রিপাবলিকানদের সঙ্গে লবিং।
ওয়াশিংটনের বৈঠক শুরু হওয়ার ঠিক আগে ডেনমার্ক ঘোষণা করে, তারা গ্রিনল্যান্ডে নৌ, আকাশ ও স্থল উপস্থিতি বাড়াবে। ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইডেনসহ কয়েকটি মিত্র দেশও সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। প্রতীকী দিক থেকেও এই ঘোষণা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলির কি আরও এগোনোর মানসিক জোর আছে? ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তুলনামূলকভাবে কড়া অবস্থানে। ১৪ জানুয়ারি তিনি তাঁর মন্ত্রিসভাকে বলেন, ট্রাম্প “অভূতপূর্ব পরিণতির দিকে এগোচ্ছেন।” ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে
ফ্রেদেরিকসেন আগে সতর্কতার পক্ষপাতী ছিলেন, এখন তিনি সতর্ক করছেন, গ্রিনল্যান্ডে আক্রমণ হলে ন্যাটো ভেঙে পড়বে। ড্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে কর্মরত, জার্মানির প্রাক্তন ভাইস-চ্যান্সেলর রবার্ট হাবেকের মতে, গ্রিনল্যান্ডে আমেরিকার পদক্ষেপ রাশিয়াকে উত্তর ইউরোপে আরও আগ্রাসী হতে উৎসাহিত করতে
পারে।“সব বিকল্পই টেবিলে থাকা উচিত।”
অন্যদিকে অনেকে আশঙ্কা করছেন, পাল্টা চাপ বাড়ালে ট্রাম্পের দখল-আকাঙ্ক্ষাই উল্টে উদগ্র হয়ে উঠতে পারে। ইউক্রেনও একটি বড় উদ্বেগের জায়গা। হোয়াইট হাউসকে চটালে যুদ্ধবিরতির পর ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার যে সামান্য আগ্রহ আমেরিকা দেখাচ্ছে, তা ভেস্তে যেতে পারে। আপাতত বেশির ভাগ ইউরোপীয় রাজনীতিকই দড়িতে টান দিতে চাইছেন না। জার্মানির শাসক ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটদের পররাষ্ট্রনীতি মুখপাত্র ইয়ুর্গেন হার্ড্ট বলেন, “গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ হিসেবে বর্তমান চুক্তির মধ্যেই আমাদের সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব। আমি নিশ্চিত, এই যুক্তি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝানো সম্ভব।”
আর যদি তা না হয়, তবে শেষ ভরসা একটাই—ট্রাম্প হয়তো অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ সরিয়ে নেবেন।এছাড়া আমেরিকার সামনে আর একটি বিকল্প রাস্তাও আছে।।তা হোল গোপনে দখলের চেষ্টা। ধরা যাক, গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিকে উসকে দিয়ে অনেক পরে আমেরিকা তার সঙ্গে সংযুক্তিকরণ সম্ভব করতে পারে।তবেএর দীর্ঘ পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক প্রয়াস দরকার, যা ট্রাম্পের মতো অধৈর্য মানুষের বোধগম্যই হবেনা। সামরিক দখল তুলনায় সহজ, কিন্তু তা সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও কংগ্রেসের অনেকের কাছেই চরম
অস্বস্তিকর বিষয়। মাত্র ৪ শতাংশ মার্কিন ভোটার বলপ্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের পক্ষে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন থেকে শুরু করে ইরানের সঙ্কট—ট্রাম্পের মাথায় শীরঃপীড়ার অভাব নেই, তাঁর সমস্যা হোল, যেটা সবচেয়ে সহজ রাস্তা তিনি সেই দিকেই ঝুঁকে পড়েন।
ভেনেজুয়েলার উত্তেজনার ‘মিষ্টি রেশ’ কেটে গেলে হয়তো তাঁর মন অন্য কোথাও ঘুরে যাবে। সম্ভবত গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এই সংযুক্তির হুমকি ডেনমার্ককে নিরাপত্তা বা খননের প্রশ্নে কিছু ছাড় আদায় করার কৌশল মাত্র। অন্তত ইউরোপ সেই আশাতেই বুক বাঁধছে।