বাংলাস্ফিয়ার: বছর তিনেক আগে মানুষের হাতে এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসে পৌঁছেছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-এর শেষলগ্ন পর্যন্ত বিশ্বের চাকুরিজীবী জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ মাসে অন্তত একবার জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করেছেন। তবে এআইয়ের এমত প্রসার সব দেশে সমান নয়। বিভিন্ন দেশের এআই ব্যবহারের প্রবণতাকে বিবেচনা করে, গত ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি রিপোর্ট থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। মজার বিষয় হল, আমেরিকা ও চিন এআই তৈরিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিলেও, এর ব্যবহার আর উন্নতিতে তারা অনেকটাই পিছিয়ে।
বিশ্বজুড়ে এআইয়ের বিস্তার পরিমাপ করাটা তেমন সোজাসাপ্টা কাজ নয়। তবে মাইক্রোসফটের গবেষকেরা বর্তমানে এক নতুন পদ্ধতিতে সে কাজে এগিয়েছন। তারা দেখছেন, এক মাসে কতজন মাইক্রোসফট ডেস্কটপ দিয়ে চ্যাটজিপিটি (Chatgpt), ক্লড (Claude), ডিপসিক (DeepSeek) বা জেমিনি (Gemini)-র মতো এআই টুলগুলির ব্যবহার করেছেন। সেই তথ্যের সঙ্গে মাইক্রোসফটের বাজারদর ও মোবাইল ফোনের ব্যবহার মিলিয়ে তারা ১৪৭টি দেশের চাকুরিজীবি জনসংখ্যার সার্বিক এআই ব্যবহারের একটা তালিকা তৈরি করেছেন। এই হিসেব পুরোপুরি নিখুঁত না হলেও, দেশগুলির মধ্যে প্রাথমিক তুলনার জন্য এটি বেশ কার্যকর। (তথ্য দ্রষ্টব্য)
এই গবেষণা অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE), সিঙ্গাপুর, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড ও ফ্রান্স এই তালিকার শীর্ষাস্থানে রয়েছে। আরব আমিরশাহী ও সিঙ্গাপুরে প্রথম ১০ জন চাকুরীজীবির মধ্যে ৬ জনই এই প্রযুক্তির নিয়মিত গ্রাহক। ঘটনাক্রমে এই দেশেগুলির সরকার এই প্রযুক্তি বিস্তারে যথেষ্ট তৎপর। আন্দাজ করা যায়, বিশ্বের উন্নত দেশগুলির চেয়ে তুলনামূলক ছোটো দেশগুলির সরকার, নতুন প্রযুক্তির আহ্বানে বেশ উৎসাহী। অন্যদিকে আবার দক্ষিণ কোরিয়ার এআই বাজার লাফিয়ে বেড়েছে। সেখানে গতবছরের প্রথমার্ধের তুলনায় দ্বিতীয় ভাগে, দেশের চাকুরিজীবিদের মধ্যে এআই ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৮.৫ শতাংশ বেড়েছে । দেখা যাচ্ছে, জাপানি অ্যানিমে স্টাইলে ছবি তৈরির ভাইরাল ট্রেন্ড ও এআইয়ের কোরিয়ান ভাষা বোঝার দক্ষতা বৃদ্ধিতেই তারা বেশি মনোযোগী।
সাধারণত ভাবা হয়, বিশ্বের পিছিয়ে পড়া দেশগুলির তুলনায় ধনী দেশগুলিই এআই চ্যাটবট ব্যবহারে বেশি অভ্যস্ত হবে । তবে কোনো দেশের জিডিপি (GDP) বা মাথাপিছু আয় দেখে সবসয় এআই ব্যবহারের গতি বোঝা যায় না। উন্নয়নের মাপকাঠিতে আমেরিকা, চেক প্রজাতন্ত্র বা পোল্যান্ডের থেকে এগিয়ে থাকলেও, এআই ব্যবহারে তারা সমকক্ষ। আবার, ভারতের এআই ব্যবহারের পরিমাপ তার বাস্তবিক অর্থনৈতিক রূপরেখাকে ছাড়িয়ে গেছে। ওদিকে, চিন তার আয়ের তুলনায় খানিকটা পিছিয়ে। কিন্তু, জর্ডান ও ভিয়েতনামের মতো দেশের বাসিন্দারা তাদের জিডিপির তুলনায়, এই লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেল (LLM) ব্যবহারে অনেক বেশি আগ্রহী।
মাইক্রোসফটের এই নতুন গবেষণায় প্রথমবার ডিপসিক-এর বিশ্বব্যাপী বিস্তারের চিত্রটা উঠে এসেছে। এটি চিনের তৈরি একটি ফ্রি ও ওপেন সোর্স মডেল। গত বছর আমেরিকার সেরা এআই মডেলগুলির সমান দক্ষতা দেখিয়ে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিল ডিপসিক। আফ্রিকায় ডিপসিক অত্যন্ত জনপ্রিয়। অন্যান্য অঞ্চলগুলির তুলনায় আফ্রিকায় ডিপসিক ব্যবহারের হার প্রায় দ্বিগুণ থেকে চারগুণ। এছাড়া যে দেশগুলিতে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেখানে ডিপসিকই এআই-এর বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, চিনে এর ব্যবহারের হার ৮৯%, বেলারুশে ৫৬%, কিউবায় ৪৯%, রাশিয়ায় ৪৩% ও ইরানে ২৫%। ডিপসিক মূলত তার ওপেন সোর্সের গুণগত কারণে প্রশংসিত হলেও, এর মধ্যে চিনা সেন্সরশিপ বা কড়াকড়ি যথেষ্টই। দেখা যায়, ১৯৮৯ সালের তিয়েনানমেন হত্যাকান্ডের মতো বিষয়ে বিতর্কিত প্রশ্ন করলে ডিপসিক বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। মনিবকে চটিয়ে কোনও বিতর্কে জড়াতে সে রাজি নয়।