বাংলাস্ফিয়ার: গত সপ্তাহে কলকাতায় আই-প্যাক (I-PAC)-এর দপ্তরে চালানো তল্লাশি অভিযানে বাধা দেওয়ার অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই)-এর মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা আবেদনে ইডি জানিয়েছে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন এক ধারাবাহিক আচরণের অংশ, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর অধীনস্থ আধিকারিকরা তদন্তকারী সংস্থাগুলির আইনসিদ্ধ কর্তব্য পালনে বেআইনি হস্তক্ষেপ করে আসছেন।
ইডির আবেদনে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিকে “চমকে দেওয়ার মতো আইনশৃঙ্খলার অবস্থা” বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সংস্থার দাবি, এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে আইন রক্ষাকারীরাই—অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার—নিজেরাই গুরুতর, আমলযোগ্য অপরাধে যুক্ত। এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের ২০১৪ সালের ঐতিহাসিক রায় ললিতা কুমারী বনাম উত্তরপ্রদেশ সরকার মামলার নির্দেশ অনুযায়ী অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করা বাধ্যতামূলক।
ইডির বক্তব্য অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্দিষ্ট ধারা তৈরি করেছেন—যেখানে কোনও তদন্ত তাঁর পছন্দসই না হলে, অথবা যেখানে তাঁর, তাঁর মন্ত্রীদের, দলের কর্মীদের কিংবা তাঁদের সঙ্গে যোগসাজশে থাকা কিছু সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে আপত্তিকর তথ্য উঠে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়, সেখানেই তিনি রাজ্য পুলিশকে ব্যবহার করে আইন নিজের হাতে তুলে নেন।
আই-প্যাক দপ্তরে তল্লাশির সময় কী ঘটেছিল, তা বিশদভাবে তুলে ধরে ইডি জানিয়েছে—সংস্থাটি একটি বহু-রাজ্যব্যাপী অর্থ পাচারের মামলার তদন্ত করছে, যেখানে বেআইনি কয়লা খনন থেকে প্রায় ২,৭৪২.৩২ কোটি টাকার অপরাধলব্ধ অর্থ তৈরি হয়েছে এবং তা জনগণের কোষাগারের ক্ষতির বিনিময়ে পাচার করা হয়েছে।
এই তদন্তের সূত্রে আই-প্যাকের প্রতিষ্ঠাতা প্রীতিক জৈনের আবাসিক ভবনে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। ইডির দাবি, তাদের কাছে এমন তথ্যপ্রমাণ ছিল যা দেখাচ্ছিল, ২০ কোটি টাকারও বেশি অপরাধলব্ধ অর্থ সেখানে পৌঁছেছিল।
কিন্তু ইডি কর্মকর্তাদের ভাষায়, “অত্যন্ত বিস্ময়কর ও মর্মান্তিকভাবে”, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নিজে, রাজ্যের মুখ্যসচিব, ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ এবং আরও কয়েকজন পুলিশ আধিকারিক ওই বাড়িতে জোর করে প্রবেশ করেন।
সংস্থার অভিযোগ, তাঁরা শুধু ইডি অফিসারদের ভয় দেখানো ও হুমকি দেওয়াতেই থেমে থাকেননি; বরং তল্লাশির সময় জব্দ করা নথি ও ইলেকট্রনিক প্রমাণ—যার মধ্যে গুরুতর অপরাধমূলক তথ্য ছিল—তাও ছিনিয়ে নেন। এই সমস্ত নথি ও তথ্য প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট-এর অধীনে তদন্তের অংশ হিসেবে আইনসম্মতভাবে জব্দ করা হয়েছিল।
ইডির দাবি, এরপর তাদের অফিসারদের আর কোনও তল্লাশি চালাতে দেওয়া হয়নি এবং তাঁদের প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়।
সংস্থাটি স্পষ্ট করে বলেছে, তারা যে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছিল, তার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপের কোনও সম্পর্ক ছিল না; তা পুরোপুরি অর্থ পাচারের মামলার তদন্তসংক্রান্ত। কিন্তু যখন সেই তথ্যপ্রমাণ মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের শীর্ষ পুলিশকর্তা এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারের হাতে ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং গোটা বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের সামনে এক ধরনের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়, তখন আসলে অপমানিত হয় ভারতের সংবিধান ও আইনের শাসন। এতে সাংবিধানিক মূল্যবোধের এমন ক্ষতি হয়েছে, যা আর পূরণ করা সম্ভব নয়—যে মূল্যবোধকে এই মহামান্য আদালত বরাবর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রক্ষা করে এসেছে।
ইডির আরও বক্তব্য, যেহেতু মুখ্যমন্ত্রী নিজেই রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বে রয়েছেন এবং ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, ডেপুটি কমিশনারসহ একাধিক পুলিশ আধিকারিক নিজেরাই এই গুরুতর অপরাধে যুক্ত, তাই স্থানীয় থানায় গিয়ে এফআইআর দায়ের করা সম্পূর্ণ অর্থহীন। বরং তাতে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার এবং মুখ্যমন্ত্রী ও শীর্ষ পুলিশকর্তাদের রক্ষা করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল তদন্ত চালানোর আশঙ্কা প্রবল।
কলকাতা হাই কোর্টে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার কথাও আবেদনে উল্লেখ করেছে ইডি। সংস্থার দাবি, মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দলের এমন প্রভাব এবং বেআইনি কৌশল রয়েছে যে, তাঁরা আদালতের কার্যক্রমই ভেস্তে দিতে উদ্যত। আদালত চত্বরে এমন হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, হাই কোর্টকে নিজেই বিচারিক আদেশে জানাতে হয়—শুনানির জন্য পরিবেশ অনুকূল নয়। পরে মামলার শুনানি মুলতবি রাখতে হয়।
ইডির দাবি, এই হট্টগোল যে মুখ্যমন্ত্রীর সমর্থকদের দ্বারাই সংগঠিত, তার প্রমাণ রয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দলের সদস্যদের পাঠানো বার্তায়, যেখানে বিপুল সংখ্যায় আদালতে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যদের কাজকর্ম একাধিক আমলযোগ্য অপরাধের মধ্যে পড়ে—যার মধ্যে রয়েছে বসতবাড়িতে চুরি, সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা দেওয়া ও হামলা—যা ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ৩০৫, ৩০৭, ৩০৯, ৩১০, ৩৩১, ৩৩২ সহ একাধিক ধারায় শাস্তিযোগ্য।
আগের ঘটনাগুলির প্রসঙ্গ টেনে ইডি বলেছে, এটি একটি পুনরাবৃত্ত ধারা—যেখানে অপরাধ করার পর মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর নির্দেশে রাজ্য পুলিশ কেন্দ্রীয় সংস্থা ও তাদের অফিসারদের বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর দায়ের করে।
এই এফআইআরগুলির পিছনে একাধিক অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করে—প্রথমত, অফিসারদের ভয় দেখিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের তদন্ত থেকে বিরত রাখা।
আই-প্যাক মামলার ক্ষেত্রেও, ইডির অভিযোগ—এফআইআরের অজুহাতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সেই সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ে যায়, যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর বেআইনি কার্যকলাপ ধরা ছিল। এটি তদন্তের নাম করে প্রমাণ নষ্ট করার অপরাধ। একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রান্ত ও কুৎসিত প্রচার চালানো হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
সবশেষে ইডি বলেছে, যে ধারা ও ধারাবাহিক আইন অমান্যের চিত্র সামনে আসছে, তাতে এটি বিরলতম মামলাগুলির একটি—যেখানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সাংবিধানিক হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন। আদালতের উচিত আইনসম্মত কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনও রাজনৈতিক নেতা—যে দলেরই হোন না কেন—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস না পান, প্রকাশ্যে অপরাধ করে তা নিয়ে নাটক না সাজাতে পারেন, এবং আইনসিদ্ধ কর্তব্যে নিযুক্ত সংস্থার কাছ থেকে জব্দ করা প্রমাণ চুরি করে পার পাওয়ার ধারণা না জন্মায়।