বাংলাস্ফিয়ার: বিয়ে ভাঙে কেন? বড় ধরনের দাম্পত্য কলহ অথবা বিশ্বাসঘাতকতার কারণে?
প্রচলিত ধারনা এই রকমই। কিন্তু সম্পর্কের ধরণ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত করছে একেবারে অন্য রকম। দেখা গিয়েছে, বিবাহিত সম্পর্কে স্বামী যখন বলেন, “আমি আর পারছি না,” তার মানে হোল তিনি এই সিদ্ধান্ত বহু মাস আগেই নিয়েছেন এবং মনে মনে অনেক আগে থেকেই তা লালন করছেন।। তার মানে বিয়ে অথবা দীর্ঘ সম্পর্ক ভাঙে পুরুষের কারণে যতটা মেয়েদের কারণে আদৌ ততটা নয়।
অস্যার্থ, এরপর যদি শোনেন অমুকের গিন্নি দজ্জাল ছিলেন বলে পতি দেবতা তাঁকে অর্ধচন্দ্র দিয়েছেন, প্রথম চোটে কিছুতেই বিশ্বাস করবেননা। কেননা যা চকচক করে তা যেমন সর্বদা সোনা হয়না তেমনি যা রটে সেটাই ঘটনা নাও হতে পারে?
যেমন ধরুন, আপনি কী জানতেন দাম্পত্য সম্পর্ক অটুট রাখার এক অনিবার্য পূর্বশর্ত স্ত্রীর শরীর-স্বাস্থ্য? স্ত্রী সুস্থ থাকলে ঝামেলা নেই, উল্টোটা হলেই বিচ্ছেদের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে? এমন আরও কিছু বিচিত্র অজানা সত্য উঠে এসেছে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ‘জার্নাল অব ম্যারেজ ফ্যামিলি’-তে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্রে।
ইতালির কয়েকজন গবেষক ১৮ বছর ধরে ২৭টি ইউরোপীয় দেশে ২৫,০০০-এর বেশি দম্পতিকে নিয়ে এই সমীক্ষা চালিয়েছিলেন। পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁরা কেউ নবদম্পতি ছিলেন না। সবাই ৫০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ, যাঁরা বহু দশক একসঙ্গে কাটিয়ে দিয়েছেন একে অপরের সঙ্গে। গবেষকরা তাঁদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁদের শারীরিক অবস্থা কেমন, হতাশা আছে কিনা, দৈনন্দিন কাজ করতে কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না, আর তাঁরা এখনও বিবাহিত আছেন কি না।
৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সি দম্পতিদের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, স্ত্রী অসুস্থ কিন্তু স্বামী সুস্থ, এমন বিয়ে ভাঙার সম্ভাবনা বেশি। স্ত্রী যদি দৈনন্দিন কাজকর্ম একা করতে না পারেন, কিন্তু স্বামী পারেন, তাহলেও বিয়ে ভাঙার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। আবার স্ত্রী যখন বিষন্নতায় ভুগছিলেন কিন্তু স্বামী তা নয়, তখনও চিত্র এক। অথচ স্বামী অসুস্থ কিন্তু স্ত্রী সুস্থ রয়েছেন, এমন ক্ষেত্রে ডিভোর্সের হার বাড়েনি। দেখা গিয়েছে স্বামী দৈনন্দিন কাজকর্ম সামলাতে পারছেন না কিন্তু স্ত্রী সক্ষম, সে ক্ষেত্রেও বিয়ে টিকে গিয়েছে। স্বামী অবসাদে ভুগছেন কিন্তু স্ত্রী সুস্থ, এমন পরিস্থিতিতে ডিভোর্সের ঝুঁকি কিছুটা বাড়লেও, তা খুব বেশি নয়। আবার ৬৫ বছরের বেশি বয়সী দম্পতিদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে অবসাদই হয়ে উঠেছে সম্পর্ক ভাঙার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
একথা ঠিক গবেষণায় এ ধরণের ফলাফলে তেমন অভিনবত্ব নেই। আগেও অনেক গবেষক এমন দম্পতিদের নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁদের অনুসন্ধানে জানা গিয়েছিল, স্ত্রী অসুস্থ হলে ২১ শতাংশ ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। কিন্তু স্বামী অসুস্থ হলে বিচ্ছেদ হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, স্ত্রী রোগী হলে বিয়ে ভাঙার হার স্বামীর তুলনায় সাত গুণ বেশি। গবেষকদের মতে, এর একটি কারণ হতে পারে, সাধারণত স্ত্রীই পরিবারে কেয়ার গিভারের ভূমিকাটি পালন করেন, তাতেই স্বামী অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে যখন তাঁরই যত্নের প্রয়োজন হয়, তখন পুরো পারিবারিক ভারসাম্যটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। আরও একটি সম্ভাব্য কারণ হোল, অনেক ক্ষেত্রে মহিলারা আর্থিকভাবে স্বয়ম্ভর হননা, তাই সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া তাঁদের পক্ষে তুলনায় কঠিন হয়ে পড়ে, এমনকি তাঁরা চাইলেও পারেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক পুরুষই বিয়ে করেন বাকি জীবনটা গিন্নির যত্ন-আত্তিতে কেটে যাবে এই প্রত্যাশা নিয়ে। টেবিলে খাবার থাকবে, আলমারিতে পরিষ্কার জামাকাপড় থাকবে, আর ভাগ্য-বিড়ম্বিত দিনগুলিতে তাঁর কথা শোনার মতো একজন মানুষ থাকবে। কিন্তু যখন এই বিষয়টি উল্টো হয়ে যায় অর্থাৎ যখন তাঁরা নিজেরাই হয়ে যান দেখভালের দায়িত্বে থাকা মানুষ, তখন তৈরী হয় সমস্যা। সকলে না হলেও কেউ কেউ তখন বিবাহ বিচ্ছেদের পথ বেছে নেন।
অন্যদিকে একই পরিসংখ্যান বলছে, স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হলেও ৭৯ শতাংশ দাম্পত্য সম্পর্ক টিকে থাকে। বেশিরভাগ পুরুষই থেকে যান। বেশিরভাগ পুরুষই দায়িত্ব নেন। যখন স্ত্রী তাদের অসুস্থ স্বামীর দেখভাল করেন, তখন কেউ তা নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন না, বলেন না কেউ, যে তারা কত মহান। সেটাকে আলাদা করে প্রশংসার বিষয় ধরা হয় না। ধরে নেওয়া হয়, এটাই স্ত্রীর কাজ। এটাই একজন ‘ভালো স্ত্রী’ হওয়ার ন্যূনতম শর্ত। কিন্তু যখন স্বামীকে একই ভূমিকায় নামতে হয়, তখন হঠাৎ করে আমরা হাততালি দিতে শুরু করি। হঠাৎ করেই তারা নায়ক হয়ে যান কেবল গৃহকর্ম করার জন্য, যেগুলো তাদের স্ত্রীরা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সারা জীবন ধরে করে থাকেন। করতেন। ইতালির ওই গবেষণায় কেবল সংখ্যাগুলোই দেখা হয়েছে, কাউকে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোই অনেক কিছু বলে দেয়।
দাম্পত্য ভাঙার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্পর্ককে লেনদেন অথবা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির নিরিখে বিচার করার মানসিকতা। দ্য গডফাদার সিনেমার একটি দৃশ্য আছে, যেখানে ডন কর্লিওনে বলছেন,“একদিন আসবে, যখন আমি তোমার কাছে একটা সেবা চাইব। সেই সময় নাও আসতে পারে।”তিনি আসলে বলতে চাইছেন উপকার, দেনা-পাওনা, হিসাব রাখার কথা। সবকিছু যখন লেনদেন হয়ে যায়, তখন ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে তার কথা। অনেক বিবাহ পরবর্তীতে লেনদেনে পরিণত হয়েছে, হিসেব কষায় পর্যবসিত হয়েছে।“আমি এটা করেছি, তাই তোমাকে ওটা করতে হবে”এই ধরণের মানসিকতা তৈরি হয়েছে। সবকিছু সমান হতে হবে। সবকিছু ন্যায্য হতে হবে। কিন্তু যদি তা না হয়?
২০১৯ সালে কাউন্সিল অন কনটেম্পোরারি ফ্যামিলিজ-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দম্পতি গৃহস্থালির কাজকে লেনদেনের চোখে দেখে, অর্থাৎ কে কতটা কাজ করছে তার হিসেব রাখে, তাঁদের সংসার মোটেই আনন্দের হয়না। যেসব দম্পতি সবচেয়ে সুখী, তাঁরা হিসেব রাখেন না। তাঁরা শুধু যা দরকার, সেটাই করেন। কিন্তু পুরুষ যখন এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে যায় অনেক ক্ষেত্রে তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, বলা হয় তারা যথেষ্ট করছে না। বলা হয় মহিলারাই নাকি কেবল “মানসিক ভার” বহন করেন, অতএব পুরুষকে আরও দায়িত্ব নিতে হবে।
আবার অনেক সময় দেখা যায় পুরুষ সত্যিই তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে না।তারা বুঝতেই চায়না অনেক সময় সত্যিই তাদের আরও এগিয়ে আসা দরকার। কখনও কখনও পুরুষ তার সবটুকুই দেয়। চাকরি করে, বাড়ি ফিরে বাচ্চাদের দেখাশোনায় সাহায্য করে, অন্যান্য গৃহকর্মও করে। তবু সেটা যথেষ্ট হয় না। একজন পুরুষ যখন বুঝতে পারেন কোনও কিছু যথেষ্ট হবে না, তাঁর সঙ্গী সবসময়ই খুঁত খুঁজে পাবেন তখনই সে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করে।
গটম্যান ইনস্টিটিউট ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিয়ে নিয়ে গবেষণা করছে। তাঁরা ৯০ শতাংশ নির্ভুলভাবে বলতে পারেন কোন দম্পতির বিচ্ছেদ হবে বা হবেনা। তাঁরা অনুসন্ধান করেন দম্পতির মধ্যে বচসার বিষয় কী কী। তাঁরাই দাম্পত্য ভাঙার একটি গুরুতর বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। পরস্পরকে অবজ্ঞা করা। যখন একজন সঙ্গী অন্যজনকে অবজ্ঞার চোখে দেখে, তখন সেই বিয়ে প্রায় শেষ হয়ে যায়। আর এই অবজ্ঞা খুব বেশি দেখা যায় লেনদেনভিত্তিক বিবাহে। কারণ তাঁরা সবসময় একে অপরের হিসেব রাখে, সবসময় বিচার করে সবকিছু ন্যায্য হচ্ছে কি না। তাঁরা একে অপরকে ছোট করে দেখতে শুরু করে। অযোগ্য মনে করতে শুরু করে।
একাকীত্ব সামলাতে পুরুষদের কখনও শেখানো হয়নি ১৯৩৯ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় একটি গবেষণা শুরু করেছিল। তারা জানতে চেয়েছিল, কী পেলে মানুষ আসলে সুখী হয়। তাঁরা ৭২৪ জন পুরুষকে ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অনুসরণ করে। তাঁদের জীবন, কেরিয়ার, সম্পর্ক সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করে। সেই গবেষণার ফলে দেখা গেল, সুখ আর সুস্থতার সবচেয়ে বড় পূর্বাভাস টাকা নয়, সাফল্য নয়, খ্যাতিও নয়। আসলে বিষয়টা সম্পর্ক। যেসব পুরুষের ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরশীল সম্পর্ক ছিল, তাঁরা বেশি দিন বেঁচেছেন এবং বেশি সুখী ছিলেন। আর যেসব পুরুষ একা, তাঁরা তুলনামূলক কম বয়সে মারা গেছেন, বেশি হতাশায় ভুগেছেন এবং নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় পড়েছেন। এই গবেষণাটি আজও চলছে। এর নাম হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট। এটি মানুষের সুখ-স্বাছন্দ নিয়ে করা সবচেয়ে দীর্ঘ গবেষণাগুলোর একটি। এই গবেষণা পুরুষের জীবন ও বিয়ে সম্পর্কে যা জানায়, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যায়, অনেক পুরুষের জীবনে মাত্র একটিই গভীর ও আবেগী সম্পর্ক থাকে, সেটা তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে, ব্যস। এর বাইরে আর কেউ নেই। তাঁদের এমন কোনও ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব থাকে না, যেখানে তাঁরা জীবনের সত্যিকারের কথা খুলে বলতে পারে। থাকে হয়তো অফিসের সহকর্মী,কিছু বন্ধু, যাঁদের সঙ্গে ফুটবল দেখে। কিন্তু গভীর আবেগী সংযোগ স্ত্রীর সঙ্গেই। ফলে যখন সেই সম্পর্কটা ভাঙতে শুরু করে তখন সে একা হয়ে পড়ে। পুরোপুরি, নিঃসঙ্গ। কারণ সমাজ তাঁকে কখনো শেখায়নি, কীভাবে সেই একাকিত্ব সামলাতে হয়। তাঁকে কেবল শেখানো হয়েছে, শক্ত হতে, নিজে নিজে সব সামলাতে, কারও প্রয়োজন না অনুভব করতে। তাই তখন সে চেষ্টা করে। স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার, আবার কাছাকাছি আসার। ২০২১ সালে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহিত পুরুষ সাধারণত অবিবাহিত পুরুষের তুলনায় বেশি সন্তুষ্ট এবং কম একাকিত্ব অনুভব করেন। কিন্তু যখন সম্পর্কে সমস্যা দেখা দেয়, তখন বিবাহিত পুরুষও অবিবাহিতের তুলনায় বেশি একাকিত্ব অনুভব করেন।