Home খবরা খবর নিকোলাস মাদুরো কে?

নিকোলাস মাদুরো কে?

who is nicolas maduro

0 comments 1.7K views

বাংলাস্ফিয়ার: নিকোলাস মাদুরোকে বুঝতে গেলে প্রথমেই একটা ভুল ভাঙতে হবে। তিনি কেবলমাত্র একটি নাম নন, কেবল একজন রাষ্ট্রপতিও নন। তিনি এক ধরনের সময়, এক ধরনের দুর্ঘটনা, এক ধরনের উত্তরাধিকার—যা ছিল তাঁর শারীরিক ওজনের চেয়ে অনেক ভারী। মাদুরোকে নিয়ে যত হাসি, যত বিদ্রুপ, যত নাটকীয় উক্তি আর যত ভয়ঙ্কর প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, তার সবটা মিলিয়ে যদি কেউ ভাবে, এই মানুষটি নিশ্চয় জন্মসূত্রেই ক্ষমতার জন্য তৈরি ছিলেন, তাহলে তিনি মস্ত ভুল করবেন। কারণ মাদুরোর জীবনের শুরু কোনও প্রাসাদে নয়, কোনও সামরিক একাডেমিতে নয়, কোনও রাজবংশের অন্দরমহলেও নয়। তাঁর শুরু কারাকাসের রাস্তায়, বাসের স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে।

কারাকাস শহর এমনিতেই এক অদ্ভুত শহর। পাহাড় আর বস্তির মাঝে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা এক নগরী, যেখানে ধনী আর দরিদ্রের দূরত্ব কখনো কয়েক কিলোমিটার নয় কয়েক মিটার। সেই শহরের রাস্তায় তরুণ নিকোলাস মাদুরো বাস চালাতেন। সকালবেলা বাস ছাড়ত, দুপুরে ভিড়, বিকেলে ক্লান্তি, রাতে বাড়ি ফেরা। এই দৈনন্দিনতার মধ্যেই তাঁর রাজনীতির জন্ম। লাতিন আমেরিকায় বাসচালক মানে শুধু একজন পরিবহণকর্মী নয়, সে এক ধরনের সামাজিক চরিত্র। বাসচালকের সঙ্গে যাত্রীর কথা হয়, ঝগড়া হয়, হাসি হয়, খবর আদানপ্রদান হয়। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, দ্রব্যমূল্য, পুলিশের ঘুষ—সব আলোচনাই বাসের ভেতর হয়। মাদুরো এই কথাগুলো শুনতেন, মনে রাখতেন, আর ধীরে ধীরে সেগুলোকে ভাষা দিতে শিখতেন।

ইউনিয়ন রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ভেনেজুয়েলার শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং রক্তাক্ত। বাসচালকদের ইউনিয়ন ছিল শক্তিশালী, সংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন। মাদুরো সেখানে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। তাঁর ভাষা ছিল বইপত্রঘেঁষা নয়, বরং রাস্তাঘাটের। তিনি বলতেন এমনভাবে, যেন তিনি নিজেই সেই কথার ভুক্তভোগী। মানুষ সেটা চিনতে পারত। তারা বুঝত, এই লোকটা আমাদের মতোই।

এই সময়েই ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন এক বিস্ফোরক চরিত্র—হুগো চাভেজ। সামরিক অভ্যুত্থান, কারাবাস, তারপর নির্বাচনী রাজনীতি—চাভেজ নিজেই এক চলমান নাটক। মাদুরোর সঙ্গে চাভেজের সম্পর্ককে অনেকেই গুরু-শিষ্য বলেন, কিন্তু সেটা পুরো সত্য নয়। চাভেজ ছিলেন ক্যারিশমার আগ্নেয়গিরি, আর মাদুরো ছিলেন ধীরস্থির সংগঠক। চাভেজ কথা বলতেন যেন মঞ্চ কাঁপছে, মাদুরো কথা বলতেন যেন তিনি ব্যাখ্যা করছেন। এই পার্থক্যই তাঁদের একে অপরের কাছে অপরিহার্য করে তুলেছিল।

Captured Maduro

Captured Maduro

চাভেজ যখন ক্ষমতায় এলেন, তখন ভেনেজুয়েলা তেলের টাকায় ভাসছে। রাষ্ট্রের হাতে বিপুল সম্পদ, আর সেই সম্পদ দিয়ে সমাজ বদলানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা। মাদুরো ধীরে ধীরে চাভেজের আস্থাভাজন হয়ে উঠলেন। সংসদ সদস্য হলেন, পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁকে দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় কথা বলতে, কিউবা ও অন্যান্য বামপন্থী সরকারের সঙ্গে বন্ধন দৃঢ় করতে। রাষ্ট্রপুঞ্জে দাঁড়িয়ে দাঁ তিনি যখন বললেন, “এই হলঘরে শয়তানের গন্ধ পাচ্ছি,” তখন পশ্চিমি মিডিয়া হেসে উঠেছিল, কিন্তু লাতিন আমেরিকার বহু মানুষ মনে মনে বলল—এই ভাষাটাই তো আমরা শুনতে চাই।

চাভেজের অসুস্থতা ভেনেজুয়েলার রাজনীতিকে এক অদ্ভুত স্থবিরতার মধ্যে ফেলেছিল। সবাই জানত, কিছু একটা আসছে, কিন্তু কী আসছে, কেউ জানত না। মৃত্যুর ঠিক আগে চাভেজ প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন—আমার উত্তরাধিকারী মাদুরো। এই ঘোষণার মুহূর্তে মাদুরোর কাঁধে এমন এক ভার পড়ল, যা তাঁর ব্যক্তিত্বের চেয়েও বড়। কারণ চাভেজ কোনও সাধারণ রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক ধরনের বিশ্বাস।সেই বিশ্বাস আর যাই হোক, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যায় না।

চাভেজের মৃত্যুর পর দেশ শোকে ভেসে গেল। লাল পতাকা, চোখের জল, আবেগের ঢেউ। সেই আবেগের ওপর ভর করেই মাদুরো ক্ষমতায় এলেন। নির্বাচন জিতলেন, কিন্তু ব্যবধান এতটাই কম যে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। বিরোধীরা বলল—ভোটে কারচুপি। সমর্থকেরা বলল—বিপ্লবের জয়। মাদুরো তখনও বুঝে উঠতে পারেননি, তিনি আসলে কোন ভূমিকা নিতে চলেছেন। তিনি চাভেজের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে চাইলেন। বক্তৃতায় চাভেজ, প্রতীকে চাভেজ, এমনকি মৃত চাভেজের সঙ্গে কথোপকথনের গল্পও এল তাঁর মুখে।

এই জায়গাতেই মাদুরো একটি আন্তর্জাতিক হাস্যরসের চরিত্র হয়ে উঠলেন। একবার তিনি বললেন, চাভেজের আত্মা একটি পাখির শরীরে এসে তাঁকে আশীর্বাদ করেছে। পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম এই বক্তব্য নিয়ে মজা করল, কার্টুন আঁকল। কিন্তু ভেনেজুয়েলার একাংশের কাছে এটি ছিল নিছক রসিকতা নয়, বরং প্রতীক—চাভেজ এখনও আমাদের সঙ্গে আছেন। মাদুরোর রাজনীতিতে এই প্রতীকের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানতেন, বাস্তবতায় তিনি চাভেজ নন, তাই তাঁকে চাভেজের আত্মা দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখতে হবে।

এর মধ্যেই শুরু হল অর্থনৈতিক পতন। ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় অভিশাপ—তেল। তেলের দাম হু হু করে পড়ল। রাষ্ট্রের আয় কমে গেল, কিন্তু ব্যয় কমল না। ভর্তুকি, সামাজিক প্রকল্প, সরকারি নিয়োগ—সব চলতেই থাকল। মুদ্রাস্ফীতি এমন জায়গায় পৌঁছাল যে টাকা কার্যত কাগজে পরিণত হল। মানুষ টাকা গুনত না, ওজন করত। দোকানের তাক খালি। এক ভেনেজুয়েলান সাংবাদিক লিখেছিলেন, “আমাদের দেশে ক্ষুধা আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে অপমান।”

মাদুরো সরকার বলল, এই সবের জন্য দায়ী বিদেশি নিষেধাজ্ঞা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের। এতে আংশিক সত্য আছে। নিষেধাজ্ঞা অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ভাঙন পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। তেলের সংস্থা PDVSA একসময় ছিল জাতীয় গর্ব, এখন তা হয়ে উঠল দুর্নীতির প্রতীক।

এই সময় রাজপথে নেমে এল বিরোধিতা। বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, টিয়ার গ্যাস, গ্রেপ্তার। বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করলেন। বহু পশ্চিমি দেশ তাঁকে স্বীকৃতি দিল। আন্তর্জাতিক মঞ্চে মাদুরো একঘরে হয়ে পড়লেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দেশের ভেতরে তাঁর ক্ষমতা টিকে রইল। সেনাবাহিনী তাঁর পাশে থাকল। রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁর হাতেই থাকল। মাদুরো স্পষ্ট বললেন—আমি ক্ষমতা ছাড়ব না।

এই দৃঢ়তার মধ্যে এক ধরনের ভয়ও ছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ তুলল—বেআইনি আটক, নির্যাতন, দমন। সরকার বলল—এটা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা। সত্য সম্ভবত দুইয়ের মাঝামাঝি, কিন্তু সেই মাঝামাঝি জায়গাটাই সবচেয়ে অন্ধকার।

মাদুরোর বক্তৃতা এই সময় আরও নাটকীয় হয়ে উঠল। তিনি বললেন, “আমরা খ্রিস্টীয় সমাজতন্ত্রী।” তিনি যিশু খ্রিস্টের নাম নিলেন, বিপ্লবের ভাষায় ধর্ম ঢুকিয়ে দিলেন। সমর্থকেরা আবেগে ভেসে গেল, সমালোচকেরা বলল, এটা ভণ্ডামি। কিন্তু মাদুরো জানতেন, ভাষা কখনও কখনও বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তিনি নতুন বন্ধু খুঁজে নিলেন। কিউবা তো ছিলই, তার সঙ্গে যোগ হল রাশিয়া, ইরান, চীন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত ক্রমশ প্রতীকী হয়ে উঠল। একদিকে সার্বভৌমত্বের ভাষা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিঃসঙ্গতা। ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ এই সংঘাতের দাম দিল জীবন দিয়ে, অভিবাসন দিয়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশ ছাড়ল।

এই সব কিছুর মাঝেও মাদুরো মাঝেমধ্যে এমন কথা বলতেন, যা শুনে হাসি পেত। একবার তিনি বললেন, “আমাদের দেশে মানুষ কম খাচ্ছে না, তারা নতুন খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হচ্ছে।” এই বাক্যে একদিকে রাষ্ট্রীয় অস্বীকার, অন্যদিকে করুণ বাস্তবতা,দুটোই ধরা পড়ে।

ব্যক্তিগত জীবনে মাদুরো পরিবারকেন্দ্রিক। তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস রাজনীতিতে প্রভাবশালী। ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁর কথাবার্তায় বারবার ফিরে আসে। তিনি নিজেকে বিপ্লবের সৈনিক ভাবেন, আবার ঈশ্বরের দূত বলেও মনে করেন। এই দ্বৈততা তাঁকে আরও জটিল করে তোলে।

আজ নিকোলাস মাদুরো ইতিহাসের এক অস্বস্তিকর চরিত্র। তিনি একনায়ক কি না,এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আপনি কোন দিক থেকে দেখছেন তার ওপর। তিনি বিপ্লবের বিশ্বাসঘাতক কি না, সেটাও তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা যায় না—তিনি কোনও কার্টুন চরিত্র নন। তিনি রক্ত-মাংসে গড়া এক মানুষ, যিনি বাস্তব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার বাস্তব ফল ভোগ করেছে একটি গোটা দেশ।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles