Home খবরা খবর ইরানে হচ্ছেটা কী?

ইরানে হচ্ছেটা কী?

Iran

by Suman Chattopadhyay
0 comments 645 views

বাংলাস্ফিয়ার: ২০২৫ সালের শেষ রাতগুলোতে ইরান যেন নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠছিল। রাস্তায় নেমে আসা মানুষ যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর ছিল বাতাসে জমে থাকা নীরবতা। এক বছরের যুদ্ধ, এক বছরের অর্থনৈতিক পতন, এক বছরের বিদ্যুৎহীন অন্ধকার আর জলহীন অস্তিত্ব – এই সব মিলিয়ে দেশের আম-জনতা এতটাই ক্লিষ্ট বোধ করছিল যে আর চুপ করে বসে থাকা সম্ভব হচ্ছিলনা। সরকার তখন আর শাসন করছিল না; সরকার কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করছিল। নেতৃত্ব ছিল দুর্বল, বিভ্রান্ত, আদর্শের ভারে জমে যাওয়া-কখনও কখনও তিনটিই একসঙ্গে। প্রশ্নটা তখন আর ছিল না বিদ্রোহ হবে কি না। প্রশ্নটা ছিল-কোন ছোট্ট ঘটনার আঘাতে এই জমে থাকা বারুদ বিস্ফোরিত হবে।

সেই বিস্ফোরণ এল কোথা থেকে? রাজনীতি থেকে নয়, ধর্ম থেকে নয়-এল দোকানের কাউন্টার থেকে।

২৮ ডিসেম্বর, তেহরানের ইলেকট্রনিক্স বাজার হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। টিভি, মোবাইল, ল্যাপটপ সবই আমদানিকৃত। আর যখন রিয়াল প্রতিদিন নিজেরই কবর আরও গভীর করছে, তখন ব্যবসা মানে ক্ষতি। এই ছিল প্রথম স্ফুলিঙ্গ। কিন্তু ইরানে আগুন কখনও একা জ্বলে না। খুব দ্রুত অন্য দোকান, অন্য বাজার, অন্য পেশা-সবাই আগুনে হাত দিল। তারপর এল সেই মুহূর্ত, যা শাসকরা সবসময় ভয় পায় গ্র্যান্ড বাজার বন্ধ হয়ে গেল। শতাব্দীপ্রাচীন এই বাজার শুধু বাণিজ্যের জায়গা নয়; এটা ইরানের রাজনৈতিক থার্মোমিটার। বাজার বন্ধ মানে রাষ্ট্র জ্বরে ভুগছে।

এরপর রাস্তায় নামল মানুষ। প্রথমে তেহরান। তারপর যেন ডমিনোর মতো ইসফাহান, শিরাজ, আরও শহর। স্লোগান বদলাতে সময় লাগল না। প্রথমে দাম, পরে দায়।

“স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক”-এই আওয়াজ কোনও মুদ্রানীতির দাবি নয়। এই আওয়াজ সরাসরি ক্ষমতার দিকে ছোঁড়া পাথর। দক্ষিণের এক শহরে মানুষ পৌর ভবনের দিকে দৌড়াল-রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম প্রতীকটাকেও আর সহ্য হচ্ছিল না।

৩১ ডিসেম্বর সরকার ঘোষণা করল-২১টি প্রদেশে স্কুল, অফিস সব বন্ধ। অজুহাত: ঠান্ডা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়। কিন্তু ইরানিরা জানে, রাষ্ট্র যখন ‘ছুটি’ দেয়, তখন আসলে সে রাস্তাকে খালি করতে চায়। দরজা বন্ধ করো, জানালা বন্ধ করো-বিদ্রোহ ঘরের ভেতরেই আটকে থাকুক।

এই আন্দোলন এখনও লাখে পৌঁছয়নি। ২০০৯ নয়। কিন্তু ২০২২-এর পর এটাই সবচেয়ে বড় ঢেউ। সেই ২০২২-যখন এক তরুণী, চুল ঢাকা না থাকার অপরাধে গ্রেপ্তার হয়ে পুলিশের হাতে মারা গিয়েছিল, আর ইরান জ্বলে উঠেছিল। এবারও সরকার ছোট শহরে লাঠি নামিয়েছে, গুলি চালিয়েছে, কিন্তু বড় শহরে আপাতত সাবধান। তবু লাশ পড়েছে। শতাধিক গ্রেপ্তার। রাষ্ট্র জানে-রক্ত দিলে ভয় জন্মায়, কিন্তু অতিরিক্ত রক্ত দিলে ইতিহাস বদলায়।

কেন এত রাগ? কারণ পরিসংখ্যান নিজেই বিদ্রোহী। জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে রিয়াল তার মূল্যের ৪০ শতাংশ হারিয়েছে। গত মাসে এক ডলারের দাম পৌঁছেছে প্রায় ১৪ লক্ষ রিয়ালে-একটা জাতীয় অপমান। ন্যূনতম মজুরি দ্বিগুণ হয়েছে, ঠিকই কিন্তু দিনে দুই ডলারেরও কম। মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ নেই, জল নেই। মাসের পর মাস ব্ল্যাকআউট। এমনকি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজেই বলছেন-জল না থাকলে তেহরানের কিছু অংশ খালি করতে হতে পারে। রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার কথা যখন শাসক বলেন, তখন রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না-তখন সে বিপদসংকেত।

এই গল্প নতুন নয়। ২০১৭, ২০১৯-একই ক্ষোভ, একই শব্দ, একই পরিণতি। তাই ইরানকে আলাদা আলাদা আন্দোলনের দেশ ভাবলে ভুল হবে। এটা একটা স্থায়ী উত্তাপের রাষ্ট্র-যেখানে বড় বিস্ফোরণ আসে কয়েক বছর অন্তর, আর মাঝখানে ছোট ছোট বিদ্রোহ আগুন জ্বালিয়ে রাখে।

২০২৪ সালে ক্ষমতায় এসে পেজেশকিয়ান সংস্কারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু সংস্কার কীভাবে হবে, যখন সব কিছুর মাথায় বসে আছেন ৮৬ বছরের এক মানুষ আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই যিনি পরিবর্তনকে সন্দেহের চোখে দেখেন? পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র-এই সব নিয়ে যদি ছাড় না আসে, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিও আসবে না, নিষেধাজ্ঞাও উঠবে না। অর্থনীতি তখন দমবন্ধ করেই মরবে।

যুদ্ধ কি মানুষকে এক করবে-এই ভরসা করেছিল সরকার। হিজাবের কড়াকড়ি ঢিলে দিল। ইসলাম-পূর্ব ইরানি বীরদের ছবি দিয়ে শহর ভরিয়ে দিল। ধর্মের বদলে জাতীয়তাবাদ। কিন্তু পেট খালি থাকলে পোস্টার কাজ করে না। ইরানিরা এখন একটাই প্রশ্ন করছে-আমরা আরও কতটা গরিব হব?

২৯ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বদল হল। নতুন নাম-আবদোলনাসের হেম্মাতি। অর্থনীতিবিদ। কিন্তু বিদ্রূপটা নির্মম-এই মানুষটিকেই কয়েক মাস আগে মূল্যস্ফীতির জন্য দোষী সাব্যস্ত করে সরানো হয়েছিল। ইরানিরা বলছে-এটা টাইটানিক ডুবে যাওয়ার সময় ডেকচেয়ার সরানোর মতো।

শাসক যেমন দিশেহারা, বিরোধীর অবস্থাও তেমন। আন্দোলনের কোনও মুখ নেই, কোনও নেতা নেই, কোনও অভ্যন্তরীণ ফাটল নেই। অধিকাংশ মানুষ এখনও ঘরেই থাকে। ফলে ইতিহাস বলে-এই ঢেউ হয় ধীরে মরে যাবে, নয়তো লাঠিতে ভেঙে পড়বে। কিন্তু এবার দু’টি অনিশ্চিত ছায়া রয়েছে।

একজন হলেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যিনি আবার ইরানে আঘাত হানতে চাইতে পারেন। জুনের ক্ষতির পর ইরান ক্ষেপণাস্ত্র মেরামত করছে-এটা তাঁর মাথাব্যথা।আরেকজন হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

২ জানুয়ারি ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিলেন-বিক্ষোভকারীদের মারলে আমেরিকা চুপ থাকবে না। “আমরা প্রস্তুত। আমরা সশস্ত্র।”

ট্রাম্পের কথায় সবসময়ই নাটক থাকে। কিন্তু ইরান জানে-এই মানুষ কথা বলেই থেমে থাকেন না। তিনি একসময় জেনারেল মেরেছেন, আবার পারমাণবিক ঘাঁটিতে বোমাও ফেলেছেন।

ইরান ইতিমধ্যেই মানুষ মেরেছে। আন্দোলন বাড়লে আরও মারবে। প্রশ্নটা এখন শুধু একটাই- এই রক্তপাত কি আরেকটি দমনের গল্প হবে, নাকি এমন একটি মুহূর্ত, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না?

ইরান দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেই কিনারায়।

এক পা সামনে পড়লে ইতিহাস বদলাতে পারে।

এক পা পেছনে গেলে সব আগের মতোই থাকবে।

কিন্তু বাতাস বলছে-এবার ভারসাম্য রাখা কঠিন।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles