ধূমকেতু 3I/ATLAS কে ঘিরে বিশ্বজুড়ে চলা নানা জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটালেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সব্যসাচী পালের নেতৃত্বে দুই বাঙালি বিজ্ঞানী। কিছুদিন ধরেই জল্পনা চলছিল ধূমকেতুটি ভিনগ্রহীদের মহাকাশযান কিনা। বিজ্ঞানীরা সক্ষম হলেন বেতার তরঙ্গে ধূমকেতুটির প্রথম ছবি তুলতে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হলো অন্যান্য ধূমকেতুর মতই 3I/ATLAS সৃষ্টির পেছনে কোনও ভিনগ্রহীদের হাত নেই, প্রাকৃতিক কারণেই সৃষ্টি হয়েছে ধূমকেতুটি।
ধূমকেতু নিয়ে রহস্য সেই সুদূর অতীত থেকে আজ পর্যন্ত রয়ে গেছে। মহাবিশ্বের জন্মলগ্নে তৈরি এই বরফ ধূলির মহাজাগতিক অতিথিরা আজও বিজ্ঞানীদের সামনে খুলে দিচ্ছে সৃষ্টি, জল আর জীবনের উৎসের অজানা অধ্যায়। ধূমকেতু (comet) হল সৌরজগতের প্রাচীনতম বস্তুগুলির একটি। বিজ্ঞানীদের মতে, ধূমকেতুগুলি তৈরি হয়েছিল প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে, যখন সূর্য ও গ্রহগুলির জন্ম হচ্ছিল। সে কারণেই ধূমকেতুকে বলা হয় “মহাকাশের জীবাশ্ম” কারণ এরা সৌরজগতের জন্মলগ্নের তথ্য আজও বহন করে চলেছে। একটি ধূমকেতুর মূল অংশকে বলা হয় নিউক্লিয়াস। এটি মূলত তৈরি বরফ (জল, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড), ধূলিকণা, এবং নানা ধরনের জৈব অণু (মিথানল, হাইড্রোজেন সায়ানাইড) দিয়ে। এই কারণে ধূমকেতুকে অনেক সময় বলা হয় “নোংরা বরফের গোলা” (dirty snowball)। যখন ধূমকেতু সূর্যের কাছে আসে, তখন তাপের প্রভাবে বরফ গলে গ্যাসে পরিণত হয় এবং ধূলিকণাগুলি ছিটকে বেরিয়ে আসে। তখনই তৈরি হয় ধূমকেতুর উজ্জ্বল কোমা ও দীর্ঘ লেজ, যা লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
অন্যান্য ধূমকেতু থেকে 3I/ATLAS অনেকটাই আলাদা। অন্যান্য ধূমকেতুগুলি যেখানে সৌরজগতেরই অংশ, 3I/ATLAS সৌরজগতের বাইরে থেকে এসেছে। অর্থাৎ, এটি অন্য কোনও নক্ষত্রের চারপাশে তৈরি হয়ে কোটি কোটি বছর ভ্রমণ করে আমাদের সৌরজগতে ঢুকেছে। এই ধরনের ধূমকেতু থেকে জানা যায় আমাদের সৌরজগৎ থেকে অনেক দূরে যেখানে এই ধূমকেতুটি সৃষ্টি হয়েছে সেখানে ধূলি ও বরফের গঠন কেমন এবং জীবন সৃষ্টির উপযোগী জৈব অণু সেখানে আছে কি না। ধূমকেতু 3I/ATLAS আবিষ্কারের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। কারণ এটি একটি ইন্টারস্টেলার অবজেক্ট অর্থাৎ সূর্যজগতের বাইরে থেকে আসা একটি প্রাকৃতিক বস্তু। এর আগে ‘ওউমুয়ামুয়া’ ও 2I/Borisov এর মতো মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি এমন বস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। তাই 3I/ATLAS এর প্রতিটি বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধূমকেতুকে ঘিরে প্রথম দিকে কিছু বৈজ্ঞানিক মহলে দাবি উঠেছিল যে এটি কোনও ‘এলিয়েন স্পেসশিপ’ বা কৃত্রিম বস্তু হতে পারে। এই ধারণার মূল কারণ ছিল এর অস্বাভাবিক কক্ষপথ, সূর্যজগতের বাইরের উৎস এবং সূর্যের কাছে আসার সময় কিছু ভিন্নধর্মী আচরণ। তবে এই ধরনের বক্তব্য প্রমাণভিত্তিক নয় এবং বৈজ্ঞানিক সমাজে তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। এই কারণেই 3I/ATLAS এর মতো ধূমকেতুর রেডিও পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধূমকেতু 3I/ATLAS কে ঘিরে বিশ্বজুড়ে চলা নানা জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটালেন তিন ভারতীয় বাঙালি বিজ্ঞানী। ভারতের পুনেতে অবস্থিত উন্নতমানের রেডিও দূরবীক্ষণ যন্ত্র আপগ্রেডেড জায়ান্ট মিটারওয়েভ রেডিও টেলিস্কোপ (uGMRT) ব্যবহার করে ধূমকেতু 3I/ATLAS এর রেডিও তরঙ্গ পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ড. সব্যসাচী পাল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু ন্যাশনাল সেন্টার ফর বেসিক সাইন্স এর বৈজ্ঞানিক অরিজিৎ মান্না ও ড. তাপস বাগ। এই গুরুত্বওপূর্ণ গবেষণাটি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেলিগ্রাম এ প্রকাশিত হয়েছে।
ড. সব্যসাচী পাল বলেন “এই গবেষণা শুধু 3I/ATLAS কে নিয়ে চলমান ভুল ধারণা ভাঙতেই সাহায্য করেনা, বরং ভবিষ্যতে সূর্যজগতের বাইরে থেকে আসা বস্তুগুলিকে বোঝার ক্ষেত্রে এটি এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ধূমকেতুদের নিয়ে এই গবেষণা আসলে আমাদের নিজের উৎস খোঁজা। পৃথিবী, জল এবং জীবনের শুরু কোথা থেকে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এই লেজওয়ালা মহাজাগতিক অতিথিদের মধ্যেই।”
২০২৫ সালের ১৭, ১৯ ও ২১ ডিসেম্বর এই তিন দিনে uGMRT এর ব্যান্ড ৫ ব্যবহার করে ধূমকেতুটির রেডিও পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই সময়কালটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ছিল পৃথিবীর সঙ্গে ধূমকেতু 3I/ATLAS এর নিকটতম অবস্থান। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭ ও ১৯ ডিসেম্বর ধূমকেতুটি শক্তিশালী রেডিও সংকেত নির্গত করলেও, ২১ ডিসেম্বর আর কোনও উল্লেখযোগ্য রেডিও বিকিরণ ধরা পড়েনি। ১২৩৯ মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে করা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১৭ ডিসেম্বর ধূমকেতুটি সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল যার ফ্লাক্স ঘনত্ব ছিল প্রায় ৪.৫ মিলিজ্যানস্কি। নিকটতম অবস্থানে অর্থাৎ ১৯ ডিসেম্বর, সেই উজ্জ্বলতা অনেকটাই কমে প্রায় ০.৯ মিলিজ্যানস্কি তে নেমে আসে। আর পৃথিবীর কাছ দিয়ে চলে যাওয়ার দু’দিন পরে, ২১ ডিসেম্বর, ধূমকেতুটি আর ধরা পড়েনি; কেবলমাত্র একটি ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীর কাছাকাছি আসার আগেই ধূমকেতু 3I/ATLAS সবচেয়ে সক্রিয় ছিল এবং পরে তার রেডিও বিকিরণ দ্রুত কমে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই রেডিও সংকেত সম্ভবত ধূমকেতুর ধূলিকণা বা সূর্য থেকে আসা সৌর বায়ুর সঙ্গে ধূমকেতুর পারিপার্শ্বিক পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে। যদি কোনও বস্তু কৃত্রিম হয় বা প্রযুক্তিগত উৎস থেকে আসে, তবে তার রেডিও বিকিরণে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন, সংকেত বা অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য থাকার কথা। uGMRT দিয়ে করা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, 3I/ATLAS এর রেডিও বিকিরণ সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক ধূমকেতু সুলভ আচরণ প্রদর্শন করছে। এর বিকিরণ ধূলিকণা, আয়নিত গ্যাস এবং সূর্য থেকে আসা সৌর বায়ুর সঙ্গে সংঘর্ষজনিত প্লাজমা প্রক্রিয়ার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ধূমকেতুটি পৃথিবীর কাছে আসার আগেই সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিল এবং পরে দ্রুত ম্লান হয়ে যায় যা ধূমকেতুর ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্য। কোনও কৃত্রিম বা নিয়ন্ত্রিত বস্তুর ক্ষেত্রে এমন স্বাভাবিক ক্ষয়প্রাপ্ত বিকিরণ দেখা যাওয়ার কথা নয়। এই গবেষণা মিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ধূমকেতুর রেডিও বিকিরণ বোঝার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বর্তমানে আরও বিশদ তথ্য বিশ্লেষণ চলছে যার মধ্যে রয়েছে চিত্রায়ণ, সময়ভিত্তিক পরিবর্তন এবং ১৪২০ মেগাহার্টজে হাইড্রোজেন বিকিরণ অনুসন্ধান। এই সব বিশ্লেষণ ধূমকেতুর কোমা অঞ্চলের ভৌত অবস্থা ও গঠন সম্পর্কে নতুন ধারণা দেবে। অতএব, এই রেডিও পর্যবেক্ষণগুলি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে 3I/ATLAS একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু, কোনও এলিয়েন স্পেসশিপ নয়।